প্রতিষ্ঠান যখন কর্মী ছাঁটাই করে, তখন সেটা নাকি বিজনেস ডিসিশন। আর কর্মী যখন বেটার অফার পেয়ে চাকরি ছাড়ে, তখন সেটা হয়ে যায় বিশ্বাসঘাতকতা। কথাটা একপ্রকার প্রতিষ্ঠিত সত্য।
কর্পোরেট দুনিয়ার এই অদ্ভুত প্রেমের ব্যাকরণ বুঝতে হলে আপনাকে চাকরি করতে হবে। কারণ এখানে কোম্পানির সব সিদ্ধান্তই ব্যবসায়িক, আর কর্মীর সব সিদ্ধান্তই ব্যক্তিগত!
ধরুন, আপনি পাঁচ বছর ধরে একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। সকাল নয়টায় অফিসে ঢোকেন, বের হন রাত আটটায়। ছুটির দিনেও ফোন ধরেন, অসুস্থ শরীরেও মিটিং করেন। বসের জন্মদিনে কেক কাটেন, কোম্পানির টার্গেট পূরণ করতে নিজের জীবনের টার্গেট পিছিয়ে দেন। এমনকি অফিসের ল্যাপটপের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক এতটাই গভীর যে, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলেও মনে হয়, কোনো একটা ইমেইলের রিপ্লাই দেওয়া বাকি!
তারপর একদিন কোম্পানি ঘোষণা দিল, বাজার খারাপ। তেলের দাম বেড়েছে। খরচ কমাতে হবে। তারা বলে দিল, আপনাকে আর প্রয়োজন নেই। এইচআর অত্যন্ত মিষ্টি গলায় বলবে, আপনার অবদান আমরা সব সময় মনে রাখব। কিন্তু এটা একটা বিজনেস ডিসিশন।
আবার যখন আপনি যখন নতুন একটা চাকরি পেলেন, যেখানে বেতন একটু বেশি, কাজের পরিবেশ ভালো, আর ভবিষ্যৎটা কিছুটা নিরাপদ, তখনই পুরোনো প্রতিষ্ঠানের ঘুম হারাম!
তখন বস আপনাকে ডেকে বলবেন, আমরা কি তোমার জন্য কিছু করিনি?
আপনি মনে মনে ভাববেন, স্যার, আপনারা আমার জন্য কী করেছেন জানি না, তবে গত তিন বছরে আমার চুলের রং কালো থেকে সাদা হয়েছে, চুলও হারিয়েছি আর ঘুমের সময়সূচি বদলে দিয়েছেন।
বস আবার বলবেন, টাকার জন্যই কি সব? আমাদের সঙ্গে তোমার কোনো ইমোশনাল কানেকশন নেই?
আশ্চর্য! পাঁচ বছর চাকরি করার সময় আপনার বেতন বাড়ানোর আবেদনটা যখন তিনবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল, তখন সেই ইমোশনাল কানেকশন কোথায় ছিল? আপনি যখন দায়িত্বে তিনজনের কাজ করছিলেন, তখন আপনার আবেগের ওভারটাইম বিল কে পরিশোধ করেছিল?
কোম্পানি তখন বলেছিল, এই মুহূর্তে বাজেট নেই। আগামী বছর দেখব। সেই আগামী বছরটা সম্ভবত বাংলা ক্যালেন্ডারের কোনো হারিয়ে যাওয়া মাস। আসে না, আসবেও না।
অথচ আপনি যখন রিজাইন লেটার দিলেন, তখন হঠাৎ করেই কোম্পানির বাজেটে আবেগের বরাদ্দ বেড়ে গেল। বসের কণ্ঠে মায়া, এইচআরের চোখে বিস্ময়, সহকর্মীদের মুখে দীর্ঘশ্বাস।
তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে? এত দিনের সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই?
সম্পর্কের মূল্য আছে, স্যার। তবে সমস্যা হলো, সম্পর্কটা এত দিন একতরফা কিস্তিতে চলছিল। কোম্পানি নিচ্ছিল আপনার সময়, শ্রম, মেধা আর আনুগত্য; আর আপনি পাচ্ছিলেন মাস শেষে বেতন এবং বছরে একবার ‘এক্সিলেন্ট টিম প্লেয়ার’ সার্টিফিকেট।
সেই সার্টিফিকেট দিয়ে বাড়িভাড়া দিতে গেলে বাড়িওয়ালা আপনাকে ‘এক্সিলেন্ট’ বলেই বাড়ি থেকে বের করে দেবে!
আসলে কর্পোরেট জগতে আনুগত্যের সংজ্ঞাটা বেশ চমৎকার। আপনি যত দিন কম বেতনে বেশি কাজ করবেন, তত দিন আপনি বিশ্বস্ত। যত দিন নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন পূরণ করবেন, তত দিন আপনি পরিবারের সদস্য। কিন্তু যেদিন নিজের উন্নতির জন্য একটা সিদ্ধান্ত নেবেন, সেদিন আপনি হয়ে যাবেন সুযোগসন্ধানী।
অর্থাৎ, কোম্পানি নিজের স্বার্থ দেখলে সেটা স্ট্র্যাটেজি, আর কর্মী নিজের স্বার্থ দেখলে সেটা চরিত্রের সমস্যা!
কোম্পানি লোকসান কমাতে কর্মী ছাঁটাই করলে সেটা কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। কর্মী নিজের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে চাকরি ছাড়লে সেটা নাকি নৈতিক অবক্ষয়।
অবশ্য সব প্রতিষ্ঠান এমন নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীর অবদানকে সম্মান করে, ভালো কাজের মূল্য দেয় এবং কর্মীর উন্নতিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে। কিন্তু যেখানে কর্মীকে সম্পদ না ভেবে খরচের খাত হিসেবে দেখা হয়, সেখানে আনুগত্যের বক্তৃতা সাধারণত সবচেয়ে বেশি শোনা যায় ঠিক তখনই, যখন সেই আনুগত্যের বিনিময়ে ন্যায্য মূল্য দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে।
তাই চাকরি ছাড়ার আগে সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখুন, দায়িত্ব বুঝিয়ে দিন, পেশাদার আচরণ বজায় রাখুন। কিন্তু শুধু কেউ আপনাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলবে বলে নিজের উন্নতির দরজা বন্ধ করে রাখবেন না।
কারণ চাকরি কোনো বিয়ে নয়, আর কোম্পানি আপনার শ্বশুরবাড়িও নয়। এখানে চুক্তি আছে, বেতন আছে, দায়িত্ব আছে। ভালো সম্পর্ক থাকতে পারে, ভালোবাসাও তৈরি হতে পারে, কিন্তু সবকিছুর ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান।
শেষ কথা হলো, কোম্পানি যখন আপনাকে ছাঁটাই করে, তখন তারা তাদের ভবিষ্যৎ বাঁচায়। আর আপনি যখন ভালো সুযোগে চাকরি ছাড়েন, তখন আপনি নিজের ভবিষ্যৎ বাঁচান। দুটোই সিদ্ধান্ত। দুটোই বাস্তবতা। পার্থক্য শুধু একটাই, প্রথম সিদ্ধান্তটা নেয় কোম্পানি, আর দ্বিতীয়টা নিলে আপনার বসের মনে হয়, পৃথিবীটা বড্ড স্বার্থপর হয়ে গেছে!
কর্পোরেট দুনিয়ায় তাই একটা কথাই মনে রাখবেন: কোম্পানির কাছে আপনি যত দিন সম্পদ, তত দিন আপনি ট্যালেন্ট। যেদিন আপনি নিজের মূল্য বুঝে অন্য কোথাও চলে যাবেন, সেদিনই আপনি তাদের গল্পের ভিলেন!


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









