পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দাবি করেছেন, দুই দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তির রূপরেখা ও চূড়ান্ত খসড়া ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাত নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির প্রাক্কালে একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত প্রকাশ করেছে ইরানের আলোচক দলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র।
গত শনিবার ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত ১৪ দফা সমঝোতা খসড়ার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়। সূত্রটির দাবি অনুযায়ী, খসড়ায় যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
খসড়া প্রস্তাবের মূল বিষয়সমূহ
প্রকাশিত খসড়া অনুযায়ী—
১. লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাপ্তি ঘটানো হবে। ২. যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার এবং দেশটির সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অঙ্গীকার করবে। ৩. ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে। ৪. ইরানের আশপাশের অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি থাকবে। ৫. ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা হবে এবং এর ব্যবস্থাপনা থাকবে ইরানের অধীনে। ৬. তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হবে এবং ইরান তার আর্থিক সম্পদে পূর্ণ প্রবেশাধিকার পাবে। ৭. যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। ৮. পারমাণবিক ইস্যু, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের লক্ষ্যে ৬০ দিনের চূড়ান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। ৯. ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি)-এর আওতায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবে। ১০. আলোচনার পুরো সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো সেনা মোতায়েন বা নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। ১১. ৬০ দিনের আলোচনার সময় ইরানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত তহবিল মুক্ত করা হবে, যার অর্ধেক আলোচনা শুরুর আগেই ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ১২. চুক্তির বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি তদারকির জন্য একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গঠন করা হবে। ১৩. চূড়ান্ত চুক্তিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হবে। ১৪. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন হবে চূড়ান্ত আলোচনার একমাত্র বিষয়। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয় আলোচনার বাইরে থাকবে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই খসড়া এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে এটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত কোনো নথি নয়।
এদিকে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেছেন, কয়েক মাস ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি শান্তি চুক্তির রূপরেখায় সম্মত হয়েছে। শেহবাজ শরিফের ভাষায়, “আমরা একটি শান্তি চুক্তির ইতিহাসের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছি।” তিনি জানান, সম্ভাব্য চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর (ই-স্বাক্ষর) অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। এরপর আগামী সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আলোচনা চলাকালীন ধারাবাহিক অঙ্গীকার বজায় রাখার জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে এই অঞ্চলের ভাইদের প্রতিও আমরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।” তিনি আরো বলেন, “আমরা আত্মবিশ্বাসী যে এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।”
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, খসড়ায় উল্লেখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল, জব্দকৃত সম্পদ মুক্তি, হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন সমঝোতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এখনো পর্যন্ত ওয়াশিংটন বা তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ১৪ দফা খসড়া কিংবা সম্ভাব্য চূড়ান্ত চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। ফলে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক অগ্রগতি পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









