জাতিসংঘে মানবাধিকার ও ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মধ্যে বিরল কূটনৈতিক উত্তেজনা প্রকাশ্যে এসেছে। মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের হাইকমিশনার ভলকার টুর্কের পুনর্নিয়োগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া মতবিরোধ দ্রুতই দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রের মধ্যে প্রকাশ্য বাকযুদ্ধে রূপ নেয়।
সোমবার (২৭ জুলাই) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বক্তব্য দিতে উঠলে প্রতিবাদস্বরূপ বৈঠক কক্ষ ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল। ওয়াশিংটনের দাবি, ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘অবমাননাকর ও অসম্মানজনক’ মন্তব্য করেছে এবং এ ধরনের বক্তব্য বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রতিবাদ চালিয়ে যাবে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সোমবারের ওই বৈঠকটি ছিল রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসন নিয়ে। বৈঠকে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জেরোম বোনাফোঁ বক্তব্য শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল ওয়াকআউট করে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান নেগ্রিয়া জানান, ফ্রান্স তাদের প্রতি যে ‘উপদেশমূলক ও অসম্মানজনক ভাষা’ ব্যবহার করেছে, তার প্রতিবাদেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ফ্রান্স তাদের অবস্থান থেকে সরে না আসা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবে।
এই কূটনৈতিক বিরোধের সূত্রপাত হয় গত সপ্তাহে, যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্কের দ্বিতীয় মেয়াদ অনুমোদনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই ভোটে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া টুর্কের পুনর্নিয়োগের বিপক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে ১৪৪টি সদস্যরাষ্ট্র তার পক্ষে ভোট দেয়, বিপক্ষে ছিল ১০টি দেশ এবং ১৩টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
ভোটের পর ফ্রান্সের জাতিসংঘ মিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে। তারা লিখেছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্র একসময় মানবাধিকারের আলোকবর্তিকা ছিল। এখন আর নয়।’ একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ভোটের মিল থাকার বিষয়টিও তুলে ধরে।
এর জবাবে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ অভিযোগ করেন, ভলকার টুর্ক গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সমালোচনা করলেও বিশ্বের ‘সবচেয়ে ভয়াবহ নিপীড়ক শাসকদের’ প্রতি নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন। যদিও তিনি এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট উদাহরণ দেননি।
উল্লেখ্য, ভলকার টুর্ক আগেও রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসন এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছেন।
টুর্কের পুনর্নিয়োগ নিয়ে বিরোধ জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েনকেও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইতোমধ্যে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় অর্থায়ন কমিয়েছে এবং সংস্থাটির অধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করেছে।
শুক্রবার জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেফ বার্টোস টুর্কের পুনর্নিয়োগের কড়া সমালোচনা করে বলেন, জাতিসংঘের যে সাধারণ পরিষদ ‘প্রক্রিয়াগত সীমালঙ্ঘন, পর্দার আড়ালের সমঝোতা এবং গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর অপব্যবহারকে’ সহ্য করছে, তাদের এ সিদ্ধান্তের পরিণতি ভোগ করতে হবে। তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে জাতিসংঘের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা, অংশগ্রহণ এবং অর্থায়ন পুনর্মূল্যায়ন করবে।
অন্যদিকে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জেরোম বোনাফোঁ ভলকার টুর্ককে ‘বিবেকের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রথম মেয়াদে টুর্ক নিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এদিকে জাতিসংঘের উপমুখপাত্র ফারহান হক যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠক বর্জনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, জাতিসংঘ আশা করে, সব সদস্যরাষ্ট্র সাধারণ পরিষদের গৃহীত সিদ্ধান্তকে সম্মান করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









