‘বসনিয়ার কসাই’ নামে পরিচিত সাবেক বসনীয় সার্ব জেনারেল ৮৪ বছর বয়সে নেদারল্যান্ডসের জাতিসংঘের কারাগার হাসপাতালে মারা গেছেন। গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে তিনি আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন।
সাবেক বসনীয় সার্ব জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ মারা গেছেন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার যুদ্ধে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ম্লাদিচ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে জাতিসংঘের কারাগার হাসপাতালে মারা যান। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক অবশিষ্ট ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা (আইআরএমসিটি)।
আইআরএমসিটি জানিয়েছে, ম্লাদিচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যুর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বিচারক গ্রাসিয়েলা গাত্তি সান্তানা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

ম্লাদিচ ২০১৭ সালে দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত হন। তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসায় অন্তত ৮ হাজার বসনিয়াক মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে হত্যার ঘটনায় গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নিরাপদ এলাকা’ স্রেব্রেনিৎসায় সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ম্লাদিচের বাহিনী বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোসহ বিভিন্ন শহর ও গ্রামে দীর্ঘদিন হামলা চালায়। গোলাবর্ষণ, বন্দিশিবির স্থাপন এবং বেসামরিক মানুষ ও যুদ্ধবন্দীদের হত্যার ঘটনায় তার বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। সারায়েভো অবরোধ ও গোলাবর্ষণে প্রায় ১০ হাজার মানুষ নিহত হন।
১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে স্রেব্রেনিৎসায় হত্যাকাণ্ডের পর নিহতদের মরদেহ গণকবর দেওয়া হয়। পরে হত্যার প্রমাণ গোপন করতে কিছু মরদেহ গণকবর থেকে তুলে দূরবর্তী এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
দ্য হেগের ট্রাইব্যুনাল ম্লাদিচের কর্মকাণ্ডকে বসনিয়া থেকে বসনিয়াক, ক্রোয়াট ও অন্যান্য অ-সার্ব জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বিতাড়নের বৃহত্তর ‘জাতিগত নির্মূল’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে। তৎকালীন সার্ব প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোশেভিচ এবং বসনীয় সার্ব নেতা রাদোভান কারাদজিচের সঙ্গেও তাঁর এই পরিকল্পনায় সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে ট্রাইব্যুনাল রায় দেয়।
২০১৭ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার সময়ও ম্লাদিচ আদালতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি রায়কে মিথ্যা বলে দাবি করেছিলেন এবং আদালতের কর্তৃত্বও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
তবে ম্লাদিচকে ঘিরে বসনিয়ার সার্ব সমাজে আজও মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ তাকে সার্ব জনগোষ্ঠীর রক্ষক হিসেবে দেখেন। বসনীয় সার্ব নেতা মিলোরাদ দোদিক তার মৃত্যুকে ‘হত্যাকাণ্ড’ বলে মন্তব্য করে ম্লাদিচের প্রশংসা করেন।
অন্যদিকে স্রেব্রেনিৎসা স্মৃতিসৌধের প্রধান রেমির সুলজাগিচ বলেন, ম্লাদিচের মৃত্যুর পরও তার ভুক্তভোগীদের কথা স্মরণ করা জরুরি। তার ভাষায়, ম্লাদিচের মৃত্যু নিহতদের ফিরিয়ে আনবে না, গণকবর মুছে দেবে না এবং আদালতের রায়ও পরিবর্তন করবে না।

স্রেব্রেনিৎসার হত্যাকাণ্ডে স্বামী ও ছেলেকে হারানো কাদা হোতিচ বলেন, ম্লাদিচ কারাগারেই মারা যাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। তার মতে, এত মানুষ হত্যার দায়ে ম্লাদিচকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কারাগারে রাখার মধ্য দিয়েই বিচার সম্পন্ন হয়েছে।
১৯৯২-৯৫ সালের বসনিয়া যুদ্ধে এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হন এবং ২০ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি হারান। ম্লাদিচের মৃত্যু হলেও সেই যুদ্ধের গণহত্যা ও নৃশংসতার স্মৃতি এবং এর বিচার নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









