কোনো এক সকালে, খ্রিষ্টীয় চতুর্থ বছরে—যদিও ‘সকাল’ কথাটি নিয়ে ইতিহাসবিদেরা অকারণে তর্ক করতে পারেন, কারণ প্রাচীন দলিলে সূর্যের অবস্থান লেখা থাকে না—চাংআনের একদল ছাত্র হুয়াই গাছের নিচে জড়ো হয়েছিল।
তাদের হাতে বই। এটুকু তথ্য নিশ্চিত।
কিন্তু বইগুলো কেমন ছিল? বাঁশের ফলকে লেখা? রেশমে? হাতে নকল করা? কে জানে। তখনও মুদ্রণযন্ত্র পৃথিবীকে শেখায়নি যে একই শব্দ হাজারবার একই রকম দেখতে হতে পারে। একটি বই ছিল একটি শ্রম। একজন কপিকারীর আঙুল, চোখ, ঘাম এবং ভুলের সমষ্টি। একটি অক্ষর ভুল হলে অর্থ বদলে যেতে পারত; একটি পৃষ্ঠা হারিয়ে গেলে হারিয়ে যেতে পারত একটি সম্পূর্ণ চিন্তা।
তবু সেই সকালেই, হুয়াই গাছের ছায়ায়, বইকে একটি পণ্য হিসেবে দেখা হয়েছিল।
গল্পটি এখানেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
কারণ বই সাধারণত বাজারে আসে না। বই আসে স্মৃতি থেকে, চিন্তা থেকে, কোনো মৃত মানুষের মাথার ভেতর থেকে। তারপর একদিন সেটি কাগজে, বাঁশে বা রেশমে আটকে যায় এবং অদ্ভুতভাবে নিজের লেখকের কাছ থেকে স্বাধীন হয়ে যায়। লেখক মারা যান; বই বেঁচে থাকে। সাম্রাজ্য বদলায়; বইয়ের মালিক বদলায়। কখনো বই পুড়ে যায়, কখনো লুকিয়ে থাকে, কখনো আবার এমন একজনের হাতে পৌঁছে যায়, যে বইটির লেখকের জন্মেরও বহু পরে পৃথিবীতে এসেছে।
হুয়াই শি ছিল এমনই এক জায়গা।
চীনের পশ্চিম হান যুগে (২০২ বিসিই-২২০সিই), চাংআনের তাইশুর কাছে হুয়াই গাছের নিচে গড়ে উঠেছিল এই বইয়ের বাজার। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা মাসের নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে মিলিত হতো। কেউ বই নিয়ে আসত, কেউ অন্য পণ্য। বই কেনাবেচা হতো, বিনিময় হতো। আর বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে চলাচল করত ধারণা।
এখানে ‘বাজার’ শব্দটির প্রতি একটু সাবধান হওয়া দরকার।
আমরা বাজার বললে সাধারণত কল্পনা করি মাছ, চাল, কাপড়, মসলা, দরদাম, হাঁকডাক। কিন্তু হুয়াই শিতে বিক্রি হচ্ছিল এমন একটি জিনিস, যার ওজন মাপা যায় না—জ্ঞান।
ধরা যাক, একজন ছাত্রের কাছে কনফুসীয় কোনো গ্রন্থের একটি অনুলিপি আছে। অন্যজনের কাছে ইতিহাসের একটি বিরল বই। প্রথমজন ইতিহাস জানতে চায়, দ্বিতীয়জন নীতিশাস্ত্র। এখন প্রশ্ন: কোন বইয়ের দাম বেশি?
উত্তরটি নির্ভর করছে কে প্রশ্নটি করছে তার ওপর। এখানেই বইয়ের অর্থনীতির সঙ্গে মানুষের কৌতূহলের দেখা হয়।
সম্ভবত একজন ছাত্র তার বহুদিনের প্রিয় বইটি অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছে। বিনিময়ে সে পাচ্ছে এমন একটি গ্রন্থ, যার নাম সে আগে কখনো শোনেনি। সে বাড়ি ফিরে বইটি খুলবে। প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা হয়তো বিরক্তিকর লাগবে। তারপর কোনো একটি বাক্যে এসে সে থেমে যাবে। তারপর সেই বাক্যটি তার মনে থাকবে। কয়েক বছর পরে সে হয়তো নিজেই শিক্ষক হবে এবং সেই বাক্যের কথা তার ছাত্রদের বলবে।
অর্থাৎ হুয়াই শিতে বই শুধু হাত বদল হচ্ছিল না। একজন মানুষের চিন্তা আরেকজন মানুষের ভবিষ্যৎ বদলাচ্ছিল।
এ কারণেই প্রাচীন চীনের বইয়ের বাজারের ইতিহাসকে শুধু ব্যবসার ইতিহাস হিসেবে পড়লে ভুল হবে। এটি শিক্ষার ইতিহাস, সামাজিক যোগাযোগের ইতিহাস, এমনকি চিন্তার স্বাধীন গতিপথ তৈরির ইতিহাসও।
তবে আমাদের গল্পের এই জায়গায় একটু থামা যাক। কারণ ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে।
হুয়াই শির কোনো পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র নেই। আমরা জানি না, কোন দোকান কোথায় ছিল। জানি না কোন ছাত্র কোন বই কিনেছিল। জানি না কোনো দরিদ্র ছাত্র কখনো এমন একটি বই পেয়েছিল কি না, যার জন্য তার কাছে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না।
কিন্তু আমরা জানি, বইয়ের বাজার ছিল। আর কখনো কখনো ইতিহাসের জন্য এটুকুই যথেষ্ট।
চীনা সভ্যতায় বইয়ের গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে—মুদ্রণযন্ত্র তখনো মানুষের জীবনকে বদলে দেয়নি। একটি বই তৈরি করতে হতো হাতে। তাই বই ছিল বিরল। বিরল জিনিস সাধারণত ক্ষমতার কাছাকাছি থাকে।
রাজদরবারে বই ছিল। পণ্ডিতের ঘরে বই ছিল। সরকারি সংগ্রহে বই ছিল। কিন্তু হুয়াই শির মতো জায়গায় বই যোগাযোগ করত। এই ‘যোগাযোগ’ শব্দটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি স্থির বই মৃত বইয়ের মতো। যতক্ষণ না কেউ তাকে খুলছে, সে শুধু বস্তু। কিন্তু একবার পাঠকের হাতে গেলে তার দ্বিতীয় জীবন শুরু হয়।
এই দ্বিতীয় জীবনই সম্ভবত চীনের বইয়ের বাজারকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল।
পরবর্তী যুগে বই বিক্রির জন্য ‘শু সি’, ‘শু ফাং’, ‘শু পু’ ইত্যাদি নামে দোকান গড়ে ওঠে। পূর্ব হান যুগের লুওয়াংয়ের বইয়ের দোকানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওয়াং ছংয়ের গল্প। তিনি দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। নিজের বই কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই দোকানে গিয়ে বই পড়তেন। পড়তেন এবং মনে রাখতেন।
একদিন হয়তো দোকানের মালিক তাকে দেখেছিলেন—এক তরুণ, যে বই কিনছে না, কিন্তু বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
ব্যবসায়ীর চোখে সে ছিল হয়তো ‘ক্রেতা নয়’। ইতিহাসের চোখে? সম্ভবত ভবিষ্যতের একজন চিন্তাবিদ। ওয়াং ছং পরে লুনহেং রচনা করেন এবং চীনা চিন্তার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে ওঠেন। এখানে একটি মজার ব্যাপার আছে। একটি বইয়ের দোকান কখনো জানে না তার প্রকৃত ক্রেতা কে।
যে মানুষটি আজ একটি বই কিনছে, সে হয়তো শুধু একজন পাঠক। আবার সে এমন একটি ধারণা বহন করে নিয়ে যেতে পারে, যা বিশ বছর পরে কোনো সমাজের চিন্তাকে বদলে দেবে।
এই কারণেই বইয়ের দোকানকে কেবল দোকান বলা বিপজ্জনক সরলীকরণ।
শতাব্দী পেরিয়ে চীনে মুদ্রণপ্রযুক্তি এল। বই তৈরি সহজ হলো। সুং যুগে মুদ্রণশিল্পের বিস্তার ঘটল। ফুজিয়ানের জিয়ানইয়াং বই ছাপার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠল। ধর্ম, ইতিহাস, সাহিত্য, চিকিৎসা, কৃষি—বিভিন্ন বিষয়ের বই পাঠকের কাছে পৌঁছাতে লাগল।
বই তখন আর কেবল পণ্ডিতের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। একটি সভ্যতা যেন নিজের স্মৃতির বহু কপি তৈরি করতে শুরু করল।
এখানে একটি প্রশ্ন করা যায়—কেন মানুষ এত বই তৈরি করেছিল?
উত্তরটি সম্ভবত শুধু ‘জ্ঞান ছড়ানোর জন্য’ নয়। মানুষ বই ছাপে কারণ মানুষ ভয় পায়—ভুলে যাওয়ার ভয়।
একটি রাজবংশ চলে যাবে। একজন সম্রাট মারা যাবেন। একটি যুদ্ধ হবে। একটি শহর ধ্বংস হবে। কিন্তু কেউ যদি ঘটনাটি লিখে রাখে, তবে তা পুরোপুরি অদৃশ্য হবে না। এই অর্থে বই হলো সভ্যতার স্মৃতির পাত্র।
আর বইয়ের দোকান? স্মৃতির বাজার। হুয়াই গাছগুলো আজ নেই। অথবা থাকলেও তারা জানে না, তাদের ছায়ার নিচে একদিন ছাত্রেরা বই বিনিময় করত। গাছের তো ইতিহাসবোধ নেই। মানুষই গাছের নিচে ইতিহাস রেখে যায়।
কিন্তু কল্পনা করা যাক—সেই পুরোনো বাজারের এক কোণে একজন তরুণ দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি বই। সে বইটি বিক্রি করতে চায় না। বইটি তার প্রিয়। কিন্তু অন্য একটি বই পাওয়ার জন্য তাকে এটি ছাড়তে হবে।
সে কিছুক্ষণ দ্বিধা করে। তারপর বইটি এগিয়ে দেয়। অন্যজন বইটি নেয়। এই ছোট্ট মুহূর্তটি কোনো রাজদরবারের দলিলে লেখা হয়নি। কোনো সম্রাট তা দেখেননি। কোনো ইতিহাসবিদ তার নাম জানেন না।
তবু সেই মুহূর্তেই চীনের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ নদী প্রবাহিত হয়েছে। কারণ বইয়ের সবচেয়ে আশ্চর্য ক্ষমতা হলো—সে নিজের মালিককে চিরকাল ধরে রাখে না। সে চলে যায়। এক হাত থেকে অন্য হাতে। এক শহর থেকে অন্য শহরে এক যুগ থেকে আরেক যুগে। আর কখনো কখনো, দুই হাজার বছর পেরিয়ে, একটি পুরোনো হুয়াই গাছের ছায়া থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে যেন বলে—
‘তোমরা ভাবছ বই তোমাদের হাতে আছে? ভুল করছ। আসলে তোমরাই বইয়ের হাতে।’
কারণ আমরা বই পড়ি ঠিকই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বই-ই আমাদের মনে পড়ে থাকে। আর হয়তো সেই কারণেই হুয়াই শির গল্প এখনো শেষ হয়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









