নেপালের ভয়াবহ বন্যায় একটি পুরো জেলা দেশের অন্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিজের শৈশবের গ্রাম সোল বাজার ও আশপাশের জনপদকে বন্যার পানিতে নিশ্চিহ্ন হতে দেখেছেন এক সাংবাদিক। ফোনে আসা ভিডিও, স্বজনদের আর্তনাদ আর একের পর এক বিচ্ছিন্ন ফোনকলের মধ্য দিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন সেই ধ্বংসযজ্ঞ।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে কাঠমান্ডুতে অফিসে যাওয়ার পথে স্ত্রী ফোন করে বললেন, ত্রিশূলী নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। সোল বাজার ও বেত্রাবতীতে নাকি আর কিছুই নেই। মানুষ রাস্তায় উঠে এসেছে, আতঙ্কে ছোটাছুটি করছে।
প্রথমে কথাটি বিশ্বাস করতে পারিনি। সোল আমার গ্রাম। এই গ্রামের অলিগলিতে খেলেছি, মাঠে কাজ করেছি, বছরের পর বছর প্রতিদিন এই পথ ধরে স্কুলে গিয়েছি। এমন ভয়াবহ কিছু ঘটতে পারে—তা যেন ভাবতেই পারছিলাম না। নদী থেকে অনেক উঁচুতে আমাদের গ্রাম। এর আগে কখনো বন্যার পানি সেখানে পৌঁছায়নি।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর খবরের ওয়েবসাইটে চোখ পড়তেই বুকটা কেঁপে উঠল—ত্রিশূলীতে ভয়াবহ বন্যা।
আমি বন্ধু ও সাংবাদিক নিরঞ্জনকে ফোন করলাম। তার পরিবার সোল বাজারে থাকে। ফোন ধরেই তিনি বললেন, “কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। মা-বাবা, চাচা-চাচি—কারও ফোনই বাজছে না।”
অফিসে যাওয়ার পুরো পথ আমরা একের পর এক ফোন করতে থাকলাম। কোনো ফোন সংযোগ হচ্ছিল না। অবশেষে এক আত্মীয়ের বাড়িতে যোগাযোগ করা গেল। ফোনের ওপাশ থেকে তাঁর স্ত্রী শুধু বললেন, “গ্রামে আর কিছুই নেই। বেশির ভাগ মানুষ চলে গেছে।”
আমি তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
সোল ও টুপছে নদীর তলদেশ থেকে প্রায় ১০০ মিটার উঁচুতে। আমার ৪৪ বছরের জীবনে কখনো দেখিনি নদীর পানি সেখানে উঠতে। যত দূর মনে পড়ে, গ্রামের প্রবীণদের কাছ থেকেও এমন বন্যার কথা শুনিনি।
কিন্তু একের পর এক ভিডিও ও ছবি ফোনে আসতে শুরু করল। সেগুলো যা দেখাল, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
আমার বড় খালা পানিতে ভেসে গেছেন। তাঁর ছেলে মধু দাই ও তার স্ত্রীও মারা গেছেন। আরেক খালাও নেই। তাঁর নাতি সিজান ও তাঁর স্ত্রীও পানির স্রোতে হারিয়ে গেছেন। সিজানের ছেলে ও পুত্রবধূর কোনো খোঁজ নেই। আমার মামা সেদিন সকালে গরুর জন্য ঘাস কাটতে বের হয়েছিলেন। আর বাড়ি ফেরেননি।
আমি স্থানীয় ওয়ার্ড চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপালের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি তখন পৌরসভা কার্যালয়ে আটকে ছিলেন। বললেন, “গ্রামে আর কিছুই নেই। বাকিটা আপনি নিজেই বুঝতে পারছেন।”
কেউ কেউ খাড়া পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। স্থানীয় এক শিক্ষক জানালেন, তিনি নিজেও তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পাচ্ছেন না। বেত্রাবতীর প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়ি ভেসে গেছে। একটি স্কুল ভ্যানও পানিতে তলিয়ে গেছে। আহতদের মধ্যে কারও পা ভেঙেছে, কারও চোখে গুরুতর আঘাত লেগেছে। তিনি ফোনে অনুরোধ করছিলেন, “হেলিকপ্টার পাঠাতে পারলে পাঠান।”
এরপর নিরঞ্জনের চাচা ফোন করলেন। জানালেন, নিরঞ্জনের বাবা, মা, চাচা, চাচি ও ছোট বোন হিমানি—সবাই পানিতে ভেসে গেছেন। “আমরা শেষ, অর্জুন,” বলেই তিনি ফোন কেটে দেন।
বেত্রাবতী শুধু একটি বাজার ছিল না। এটি ছিল মানুষের জীবনের কেন্দ্র। সেখানে ছিল রাম ও কৃষ্ণের মন্দির। রামনবমী, কৃষ্ণাষ্টমী ও গাইযাত্রায় সেখানে মানুষের ভিড় জমত। মাঘসংক্রান্তির ষাঁড়ের লড়াই দেখতে কাঠমান্ডু থেকেও মানুষ আসত।
এই এলাকার সঙ্গে নেপাল-তিব্বতের পুরোনো ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। যুদ্ধের পর এখানেই দুই পক্ষ শান্তিচুক্তি করেছিল। উতর গঙ্গা ধামও ছিল গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সেখানে যেতেন পূর্বপুরুষদের স্মরণ করতে।
এখন এসবের কিছুই নেই। মন্দির, ঐতিহাসিক স্থান ও তীর্থস্থান—সবই ধ্বংসস্তূপ।
বন্যা শুধু ঘরবাড়ি নেয়নি। নিয়ে গেছে রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থাও। ফোনের নেটওয়ার্ক নেই, ইন্টারনেট নেই। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির প্রবেশপথও বন্যায় ধ্বংস হয়েছে। পরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একসময় সারা দেশে বিদ্যুৎ-সংকট চললেও আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ থাকত। অথচ এখন পুরো জেলা অন্ধকারে।

বন্যার পানিতে ত্রিশূলীর ওপর পুরোনো ও নতুন—দুই সেতুই ধ্বংস হয়েছে। ভাইনসে সেতুসহ নদীর ওপর থাকা প্রায় সব ঝুলন্ত সেতুও ভেসে গেছে। ফলে জেলা সদর বিদুরে যাওয়ার পথও বন্ধ।
রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় রাশুয়া জেলার বহু গ্রাম কার্যত দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ভৈরামকোট, সামারি, টক্সার, দেউরালি, কিসপাং, কাউলে, ভালছে, সালমে এবং সীমান্তের ওপারের ধাদিংয়ের থারপুসহ বহু এলাকায় পৌঁছানো যাচ্ছে না।
জেলা হাসপাতালও এখন অনেকের নাগালের বাইরে। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার জন্য সদর শহরে এসে আটকা পড়েছেন। বাড়ি ফিরতে পারছেন না। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বললেন, “এখন কেউ অসুস্থ হলে হয়তো বাড়িতেই মারা যেতে হবে। হাসপাতালে নেওয়ার রাস্তা নেই, সেতু নেই, গাড়ি চলার উপায় নেই।”
মানুষ লবণ পর্যন্ত কিনতে পারছে না। অনেকে ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়হীন। অনেক মানুষ এখনো নিখোঁজ।
আমার বড় খালার এক ছেলে কাঠমান্ডুতে। দূরে বসে কিছুই করতে পারছেন না। আরেক ছেলে বিদেশ থেকে কাজ শেষে মাত্র দেশে ফিরেছিলেন। কিন্তু বন্যার আগেই তিনি গ্রামে পৌঁছাতে পারেননি।
গ্রামে যারা বেঁচে গেছে, তাদের উদ্ধার করাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। স্বজন হারানোর শোক করার সময়ও তারা পাচ্ছে না। কারণ এখনো অনেক মানুষ পানির মধ্যে আটকে আছে।
এই বন্যা শুধু একটি গ্রামকে ধ্বংস করেনি। এটি পুরো একটি অঞ্চলের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। যে বাজার মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাত, সেটি নেই। ফসলের মাঠ নেই। বাড়িতে জমিয়ে রাখা শস্য আছে, কিন্তু সেগুলো চাল বা আটা করার কলও ভেসে গেছে।
আমি প্রায় দেড় দিন ধরে গ্রামের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু জেলা সদর বিদুরেই আটকে আছি। সামনে যাওয়ার কোনো পথ নেই।
বারবার একটি প্রশ্ন মনে আসছে—আমার গ্রাম আবার কবে আগের মতো হবে?
কেউ জানে না।
আমাদের কেউ কখনো এমন বন্যা দেখিনি। যে গ্রাম ছিল সবুজ, প্রাণবন্ত ও মানুষের কোলাহলে ভরা, কয়েক মিনিটের মধ্যে সেটিই পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে।
গ্রামের প্রবীণরা বারবার একই প্রশ্ন করছেন—এই জায়গা কি আর কখনো আগের মতো হবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো কারও জানা নেই।
উল্লেখ, এখন পর্যন্ত নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে। বুধবারের আকস্মিক দুর্যোগের পর বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত দেশের আটটি জেলা থেকে নতুন করে বেশ কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ১ হাজার মানুষ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









