নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৩৪৪ জনে দাঁড়িয়েছে। শনিবার দেশটির আটটি ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় আরও মরদেহ উদ্ধারের পর এই সংখ্যা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এখনো প্রায় ৫ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক। এদিকে দুর্যোগের পর ১৩ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস থেকে এই বন্যার সৃষ্টি হয়। ভুটেকোশি নদীর পানির স্রোত পরে নিচের দিকে নেমে উত্তর ও মধ্য নেপালের বিভিন্ন শহর ও গ্রাম প্লাবিত করে। পানির তোড়ে ঘরবাড়ি, যানবাহন, সড়ক ও সেতু ভেসে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও।
চীনা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিব্বতেও এই দুর্যোগে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন এবং ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
১০ দিন পর জীবিত উদ্ধার নারী
উদ্ধার তৎপরতার মধ্যেই শনিবার নুওয়াকোট জেলার বিদুর শহর থেকে ৬০ বছর বয়সী চণ্ডিকা শ্রেষ্ঠাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। চারতলা একটি বাড়ির ওপরের তলায় প্রায় ১০ দিন ধরে কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকা ছিলেন তিনি।
সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর একটি দল তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য নেপালি সেনাবাহিনীর ত্রিশুলির মৈথিলি ব্যারাকে নেওয়া হয়।
মরদেহ শনাক্তে বড় চ্যালেঞ্জ
নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ১ হাজার ৩৪৪টি মরদেহের মধ্যে ৭৫৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৮৫ জন শিশু। আরও ৫০১টি মরদেহ বা দেহাংশ অসম্পূর্ণ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকা এবং কাদা ও ধ্বংসস্তূপের চাপে মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে মুখ, পোশাক বা ব্যক্তিগত সামগ্রী দেখে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে চিতওয়ান জেলা থেকে—৩৬০টি। এরপর নওয়ালপরাসি পশ্চিমে ২৩০টি এবং নওয়ালপরাসি পূর্বে ২২২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া নুওয়াকোট, রাসুয়া, গোরখা, ধাদিং ও তানাহুন জেলা থেকেও মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া, সহ ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর ১ হাজার ৩০টি মরদেহ অস্থায়ীভাবে দাফন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়ার পর মাত্র ৯৬টি মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে।
পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মরদেহের অবস্থা খারাপ হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষা এখন পরিচয় শনাক্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবে এই প্রক্রিয়ায় সময় লাগে। মরদেহের নমুনার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের জৈবিক নমুনা মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
পরিস্থিতি অনুকূল হলে আঙুলের ছাপ ও দাঁতের রেকর্ডও পরিচয় শনাক্তে কাজে লাগানো হচ্ছে।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযান
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গে শত শত মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব এলাকায় উদ্ধার অভিযানও জোরদার করা হয়েছে। নেপালের উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে ভারত ও চীনের দলও কাজ করছে।
শুক্রবার ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে দুই নেপালি নাগরিককে উদ্ধার করা হয়। শনিবার আপার ত্রিশুলি-১ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে এক চীনা নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে নেপালি সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করা ভারতের একটি সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী দল রাসুয়া জেলার ছিলিমে সুড়ঙ্গের ভেতরে অস্থায়ী সড়ক তৈরি করেছে। এর ফলে ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম দুর্গত এলাকায় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১১তম দিনেও চলছে উদ্ধার অভিযান
বন্যার পর শনিবার ছিল উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতার ১১তম দিন। কোশি, নারায়ণী, বাগমতী, কর্ণালী, মহাকালীসহ বিভিন্ন নদীর পানির স্তরও পর্যবেক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ।
মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকা, প্রায় ৫ হাজার মানুষের নিখোঁজ থাকা এবং বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার অভিযান চলায় নেপালের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিখোঁজদের সন্ধান, মরদেহ শনাক্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









