শ্রমজীবী মানুষকে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি উল্লেখ করে তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সম্মেলন ও সাধারণ সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘মর্যাদা, অধিকার, ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতে এগিয়ে যাবার প্রত্যয়’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
মাহদী আমিন বলেন, শ্রমিক শুধু শ্রম দেন না, তারাই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত করা মানে দেশের মর্যাদা নিশ্চিত করা। ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি শ্রমিকের ন্যায্য প্রাপ্য। একই সঙ্গে নিরাপদ কর্মপরিবেশ প্রতিটি শ্রমিকের মৌলিক অধিকার।
তিনি বলেন, একজন শ্রমিকের কল্যাণের সঙ্গে একটি পরিবারের নিরাপত্তা জড়িত। দক্ষ শ্রমিক দেশের অন্যতম বড় উৎপাদনশীল সম্পদ। শ্রমিকের দক্ষতা বাড়লে শিল্পের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতার শক্তিও বাড়বে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকদের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
আগামী প্রজন্মের শ্রমশক্তিকে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বিনিয়োগের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র।
শিল্পখাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সুসম্পর্ক ও অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, শিল্পের উন্নয়নে মালিক ও শ্রমিককে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। সরকারের ‘ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ ব্যবস্থা’র (ট্রাইপারটাইট কনসালটেশন) মাধ্যমেই শিল্পখাতকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, মালিক-শ্রমিকের সম্পর্ক শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক আস্থা, নির্ভরতা ও দায়িত্বশীলতার। নিয়মিত কার্যকর যোগাযোগ ও বিশ্বাসের মাধ্যমে একটি টেকসই শিল্পব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে আস্থা তৈরি হয় এবং আস্থা উৎপাদন বাড়ায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হলে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়বে। কর্মসংস্থানের সংখ্যা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কাজের মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মাহদী আমিন বলেন, শ্রমিকের সন্তান যেন আরও ভালো শিক্ষা পায় এবং বড় স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায়, সেটিও শ্রমিক কল্যাণের অংশ। আজকের শ্রমশক্তিকে আগামী দিনের পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করাই হবে অন্যতম বড় বিনিয়োগ।
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে হবে। এতে শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার শক্তিও বাড়বে।
আগামী প্রজন্মের জন্য নতুন শিল্প ও মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে এখন থেকেই আধুনিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের পরিমাণের পাশাপাশি ‘ডিসেন্ট জব’ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।
দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অর্জনে শ্রমজীবী মানুষের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষ বারবার রাজপথে নেমে এসেছেন। দেশের কল্যাণ, জনগণের অধিকার এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তাদের অবস্থান জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
নতুন শিল্প ও আধুনিক কর্মসংস্থানের উপযোগী করে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি জনশক্তির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে দেশের শ্রমবাজারের কার্যকর সংযোগ তৈরি করা গেলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় শ্রমজীবী মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিল্পখাতের বাস্তবতার আলোকে টেকসই সমাধান খুঁজতে হবে। এমন একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শ্রমিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং শিল্পের উন্নয়ন একই ধারায় এগিয়ে যাবে।
একটি প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দেশের বিপুলসংখ্যক নারী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যার দিকে তাকালে হবে না। কাজের গুণগত মান, ন্যায্য মজুরি এবং শ্রমের যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
শ্রমিকের শ্রমশক্তি, শিল্পের সক্ষমতা ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার সমন্বয়ের মাধ্যমে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বিলসের তিন দশকের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে মাহদী আমিন বলেন, শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকদের স্বাধীনতা ও সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। এ কাজে দেশের শীর্ষস্থানীয় শ্রম অধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরাও ভূমিকা রেখে চলেছেন।
শ্রমখাতের টেকসই উন্নয়নে সরকার, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার, সিভিল সোসাইটি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো একযোগে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
শ্রমজীবী পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তার প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইতোমধ্যে শ্রমজীবী নারীদের মাঝেও পৌঁছাতে শুরু করেছে। প্রতিটি মা ও বোনের সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও কৃষিবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিলসের মহাসচিব নজরুল ইসলাম খান, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন, জাপান ইন্টারন্যাশনাল লেবার ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসুনোবু আইহারা, বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি অ্যাম্বাসেডর জ্যানা ভ্যান ডার লিনডেন, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মোহাম্মদ জাকারিয়া, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রহমান তরফদার এবং বিলসের চেয়ারম্যান মো. মজিবুর রহমান ভূঁইয়াসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









