ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল আলোচিত বৈঠকের আগে একটি প্রশ্ন ঘুরছে ব্যবসায়ী মহলে—দুই নেতার সঙ্গে একই টেবিলে কারা বসবেন?
বিশেষ করে চীনের দিকটি এখনো অনেকটাই অস্পষ্ট। শির যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তার সঙ্গে কোন কোন চীনা ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী থাকবেন, সে বিষয়ে বেইজিং এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অতিথি তালিকা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের নৈশভোজে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্থনীতি ও শিল্পক্ষেত্রের সবচেয়ে পরিচিত কিছু নাম থাকার কথা।
ট্রাম্প–শি জিনপিং নৈশভোজটি বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত ৮টা ১০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টা ১০ মিনিটে) ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে অনুষ্ঠিত হবে। এই নৈশভোজে থাকছেন এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, গুগলের সুন্দর পিচাই, টেসলা ও স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক, অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস, অ্যাপলের টিম কুক এবং ডেল টেকনোলজিসের মাইকেল ডেল। সিটিগ্রুপের জেন ফ্রেজারও তালিকায় রয়েছেন। মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেল্লার উপস্থিতির কথাও নিশ্চিত হয়েছে।
তালিকায় পরে যুক্ত হয়েছেন মেটার মার্ক জাকারবার্গ, কোয়ালকমের ক্রিস্টিয়ানো আমন এবং ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান। ফলে এটি কেবল রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ নয়; প্রযুক্তি বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও এক জায়গায় এনে দিচ্ছে অনুষ্ঠানটি।
চীনের ক্ষেত্রে ছবিটি আলাদা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য অতিথি হিসেবে উঠে এসেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডি, স্মার্টফোন নির্মাতা শাওমি, ব্যাটারি কোম্পানি সিএটিএল ও গোশনের নাম। এর সঙ্গে রয়েছে কনজিউমার ইলেকট্রনিকস প্রতিষ্ঠান হাইসেন্স, গাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাতা ওয়ানশিয়াং, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক অব চায়না এবং কৃষি-খাদ্যগোষ্ঠী সিওএফসিও। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি নিশ্চিত নয়। এমনকি গোশন জানিয়েছে, তাদের অংশগ্রহণের বিষয়ে তারা এখনো কোনো সরকারি নিশ্চিতকরণ পায়নি।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বিওয়াইডির সম্ভাব্য উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজি রিস্কসের প্রধান আইজ্যাক স্টোন ফিশের মতে, বিওয়াইডি নৈশভোজে থাকছে কি না, সেটি চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক বাজারে এই খাতকে শি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন—দুটিরই একটি সংকেত হতে পারে।
তবে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের উপস্থিতি হলে সেটি আরও জটিল বার্তা বহন করতে পারে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই চীনা সরকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফিশের মতে, ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে তখন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল ও সরকারি প্রতিনিধি দলের সীমারেখা আরও অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে সতর্কতা রয়েছে।
এই অতিথি তালিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখানে প্রযুক্তি খাতের উপস্থিতি এত বেশি যে নৈশভোজটি দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি অনানুষ্ঠানিক মঞ্চে পরিণত হতে পারে। শি ও ট্রাম্পের আলোচনার অন্যতম বিষয় এআই হওয়ার কথা, আর একই সময়ে ওয়াশিংটনে এআইয়ের গতি, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিতর্ক চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে আরও জটিল হয়েছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, চিপ, বিনিয়োগ ও জাতীয় নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশ একে অপরের প্রতিষ্ঠানের ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ ও কালো তালিকা আরোপ করেছে।
এই পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসের একটি নৈশভোজে একই টেবিলে বসবেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকজন প্রধান নির্বাহী। টেবিলটি তাই শুধু খাবারের জন্য নয়। সেখানে উপস্থিত প্রত্যেক নামই বহন করবে কোনো না কোনো বাজার, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ বা কৌশলগত স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব।
শি জিনপিংয়ের সফর শেষ হওয়ার পর হয়তো জানা যাবে, সেই টেবিলে আসলে কী আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু অতিথিদের তালিকা দেখেই একটি বিষয় স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক এখন আর শুধু দুই সরকারের সম্পর্ক নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বের প্রযুক্তি কোম্পানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিপ এবং ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক বাজারের দিকনির্দেশও।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









