কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে আরেকটি প্রশ্ন—এই প্রযুক্তির ঝুঁকি সামলাবে কে? একেকটি দেশ একেকভাবে এগোলে কি যথেষ্ট হবে, নাকি প্রয়োজন হবে আন্তর্জাতিক সমন্বয়?
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে সেই দ্বিতীয় পথের পক্ষেই কথা বলেছেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই। তাদের বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল, এআইয়ের সম্ভাবনা যেমন বিশাল, এর ঝুঁকিও তেমনি কোনো একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা সামলানো সম্ভব নয়।
অল্টম্যান বলেন, ইতিহাসে এমন সময় এসেছে যখন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী, এমনকি একে অপরকে খুব একটা পছন্দ করে না—এমন দেশও কোনো নতুন শক্তিশালী প্রযুক্তির ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিন্ন স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করেছে। তার মতে, এআইয়ের ক্ষেত্রেও এখন তেমন একটি সময় এসেছে।
এই বক্তব্য এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এআইয়ের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করার মাত্র এক দিন পর। ২২ সেপ্টেম্বরের ভাষণে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগকে ‘গ্লোবালিস্ট স্কিম’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করবে না যা এআইয়ের বিকাশকে থামিয়ে দেয়। বরং তাঁর প্রশাসন প্রযুক্তিটির অগ্রগতিকে উৎসাহিত করবে।
এই অবস্থানের বিপরীতে অল্টম্যান ও আমোদেইয়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা।
বিশেষ করে আমোদেই সাম্প্রতিক সময়ে এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা কমানোর পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। তার প্রস্তাব ছিল, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং এমনভাবে গতি নির্ধারণ করা, যাতে নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার সময় পাওয়া যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্বও অক্ষুণ্ন থাকে।
অল্টম্যানও তার প্রতিদ্বন্দ্বীর এই অবস্থানের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। বুধবার তিনি বলেন, শুধু প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো কারণ নেই। ওপেনএআই অতীতেও একতরফাভাবে কিছু ক্ষেত্রে গতি কমিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে তা করবে।
দুই প্রতিষ্ঠানের ওপরই অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে এআই নিরাপত্তা নিয়ে চাপ বেড়েছে। অ্যানথ্রপিকের গবেষকেরা এআইয়ের সম্ভাব্য ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের কিছু মডেল নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে ইন্টারনেটে প্রবেশ এবং একটি ডেভেলপার প্ল্যাটফর্মে অননুমোদিতভাবে প্রবেশের ঘটনায় প্রযুক্তি মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়। এসব ঘটনার পর এআই মডেল তৈরি ও প্রকাশের গতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আমোদেইয়ের প্রস্তাবে তিন ধাপের একটি পরিকল্পনা ছিল। লক্ষ্য ছিল উন্নয়নের গতি এমনভাবে সামলানো, যাতে নিরাপত্তার সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্য রাখা যায়। এর সবচেয়ে কঠিন অংশগুলোর একটি হলো বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয়—এমনকি গণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর মধ্যেও।
জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে আমোদেই সেই অবস্থানই আবার তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এআইকে ঘিরে বিশ্বের সামনে যেমন একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক ঝুঁকিও। সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে এক পাশে রেখে দেশগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।
তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট ছিল: এআই নিয়ন্ত্রণ কেবল প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
অল্টম্যানও একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআই যদি সত্যিই মানুষের জন্য কাজ করে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কেবল সানফ্রান্সিসকোর কয়েকটি প্রযুক্তি গবেষণাগারে নেওয়া যেতে পারে না। এসব সিদ্ধান্তে সরকার ও জনগণের জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা থাকতে হবে।
দুই নির্বাহীই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে এআই-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা বা নিরাপত্তা ঘটনার দ্রুত ও নির্ভুল প্রতিবেদন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদান এবং নতুন এআই মডেল পরীক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড।
আমোদেই আরও কিছু নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে এআই ব্যবহার করে জৈব অস্ত্র তৈরির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নতুন এআই মডেল পরীক্ষার জন্য বৈশ্বিক নিরাপত্তা মানদণ্ড।
তবে এখানে একটি বড় বাস্তবতা রয়েছে। একই সময়ে এআই শিল্পে প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক—দুই প্রতিষ্ঠানই প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি দুটির সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে প্রবেশ নিয়েও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ফলে নিরাপত্তার কথা বলার পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও তাঁদের সামনে রয়েছে।
এই দ্বন্দ্বই হয়তো আগামী দিনের এআই নীতির সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে উঠবে: প্রযুক্তির গতি কতটা কমানো যায়, কে সেই সীমা নির্ধারণ করবে, এবং প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকা দেশ ও কোম্পানিগুলো কতটা সত্যিই নিজেদের কর্মকাণ্ডে সীমা টানতে প্রস্তুত?
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অল্টম্যান ও আমোদেইয়ের বক্তব্য অন্তত একটি বিষয়ে একমত—এআইয়ের ভবিষ্যৎ কোনো একক কোম্পানি, কোনো একক সরকার কিংবা কোনো একক দেশের হাতে ছেড়ে দেওয়ার মতো বিষয় নয়। অল্টম্যানের ভাষায়, প্রতিযোগিতা চললেও এই প্রযুক্তির ঝুঁকি সামলানোর দায়িত্ব একসঙ্গে নিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









