নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে উঠবে দেশের বক্তব্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টা (বাংলাদেশের সময় ২৫ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৩টা)’র দিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ফলে একই সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যেমন দেশের বক্তব্য তুলে ধরবেন, তেমনি সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনেও থাকছে বাংলাদেশের প্রতিনিধি।
তারেক রহমানের ভাষণের সম্ভাব্য বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে রোহিঙ্গা সংকট। নিউইয়র্কে এরই মধ্যে তিনি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার এবং মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব আলোচনায় নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। দেশটিতে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নেওয়ায় এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ঢাকার কূটনীতির একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে আছে।
ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহির বিষয়ও আসতে পারে। জাতিসংঘে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তার বক্তব্যে দেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারের পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নও গুরুত্ব পেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনও থাকবে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন এবং উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম নিচু ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজনের প্রশ্ন ঢাকার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের এবারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু-সহনশীলতার বিষয়কে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ও যুক্ত হতে পারে। জাতিসংঘের এবারের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের কেন্দ্রে রয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার গতি বাড়ানো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং উন্নয়ন অর্থায়ন। বাংলাদেশের বক্তব্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ন্যায্য অর্থনৈতিক সুযোগ, প্রযুক্তি ও অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হতে পারে।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনও সম্ভাব্য আলোচ্য। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিতর্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বৈষম্য এবং নতুন প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর-সংক্রান্ত ব্রিফিংয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহারের বিষয়টি সম্ভাব্য বক্তব্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নও বাদ যাবে না। জাতিসংঘের এবারের সাধারণ বিতর্কে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ফিলিস্তিন পরিস্থিতি, সুদানসহ একাধিক সংকট আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের জন্য এর সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কার্যকর থাকবে। এবারের সাধারণ পরিষদের মূল প্রতিপাদ্যই আস্থা পুনর্গঠন এবং পরিবর্তনকে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে জাতিসংঘ সবার জন্য কার্যকর থাকে। ফলে বাংলাদেশের বক্তব্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ, আন্তর্জাতিক আইন এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা জায়গা পেতে পারে।
নারী ও শিশুস্বাস্থ্যও প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক কর্মসূচিতে রয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি মাতৃ ও নবজাতকের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি অন্তর্ভুক্তির ওপর একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা। ফলে স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়ও বৃহত্তর উন্নয়ন-বার্তার অংশ হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আজকের ভাষণটি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্জনের বিবরণ হওয়ার সম্ভাবনা কম। এর ভেতর দিয়ে ঢাকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কয়েকটি পরস্পর-সংযুক্ত বার্তা দিতে পারে—রোহিঙ্গা সংকটে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান, জলবায়ু ঝুঁকিতে ন্যায্য সহায়তা, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, প্রযুক্তির সমান সুযোগ, বৈশ্বিক শান্তি এবং কার্যকর বহুপক্ষীয় সহযোগিতা।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো যখন নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে, বাংলাদেশের বক্তব্যের মূল পরীক্ষা হবে অন্য জায়গায়—একটি উন্নয়নশীল, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এবং দীর্ঘ রোহিঙ্গা সংকট বহনকারী দেশ বিশ্বব্যবস্থার কাছে তার অগ্রাধিকারগুলো কতটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে। আজকের ১৫ মিনিট সেই বার্তার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখ, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার পর তাদের ছেলে তারেক রহমান জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দেবেন। তার এই ভাষণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









