শুক্রবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। শ্রেণিকক্ষের পরিস্থিতি ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ নিয়ে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ক্রমেই সহিংস হচ্ছে। তা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার। স্ট্রাসবুর্গে কাঁদানে গ্যাসে ঢেকে যায় রাস্তা, মার্সেইয়ে পুলিশের সারিতে আতশবাজি ছোড়া হয় এবং রেনে শহরে আবর্জনার ড্রামে আগুন ধরানো হয়।
প্যারিসেও খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেছিল, যাতে লেখা ছিল, “আমাদের গড়তে হবে ভবিষ্যৎ, সহ্য করতে নয়।”

অসন্তোষের পটভূমি
আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ছয় মাস আগে জনমত জরিপে ম্যাক্রোঁ ও তার মধ্য-ডানঘেঁষা সরকারের তীব্র অজনপ্রিয়তা বারবার ধরা পড়ছে। শিক্ষা খাতের অর্থসংকট আরও বাড়াবে, এমন বাজেট ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা অসন্তোষে ইন্ধন জুগিয়েছে।

সহিংসতা বাড়ছে, গ্রেপ্তার ২ হাজার
গত সপ্তাহে প্যারিস অঞ্চলে বিক্ষোভ শুরু হয়। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আরও সহিংস হয়ে উঠেছে।
বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ আরটিএল রেডিওকে জানান, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে ২ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই কিশোর।
তিনি বলেন, “সম্পত্তির ক্ষতি যারা করছে, তাদের বাবা-মাকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন বহিরাগতদের হাতে চলে গেছে।”
অশান্তির কারণে শুক্রবার ৪০০টি হাইস্কুল বন্ধ ছিল, যা মোট স্কুলের প্রায় ১০ শতাংশ। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে অভিভাবকদের অনুরোধ করেন, তারা যেন সন্তানদের রাস্তায় বিক্ষোভে যেতে নিরুৎসাহিত করেন।
বিএফএম টিভিকে তিনি বলেন, “রাস্তায় শিশুরা বিপদে আছে।”
সপ্তাহের শুরুতে প্যারিস অঞ্চলের স্কুলগুলোর বাইরে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, বাড়তে থাকা সহিংসতার কারণে শুক্রবার তারা বিক্ষোভ থেকে দূরে থাকছে।

শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
স্কুল অবরোধ করা শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ভিড়, নিয়মিত শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ ভবন নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর এ খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি।
প্যারিসের শহরতলি পাঁতাঁয় ১৫ বছর বয়সী কেসিয়া রয়টার্সকে বলে, “আমাদের ক্লাসে ৩৫ জন করে, শ্রেণিকক্ষে যথেষ্ট চেয়ার নেই, আর এক ঘণ্টার টিফিন বিরতিতে সবার খাবার পাওয়া সম্ভব হয় না।” এরপর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়লে সে দৌড়ে সরে যায়।
বৃহস্পতিবার সরকারের উপস্থাপন করা ২০২৭ সালের খসড়া বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে মাত্র ১.৭ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম। শিক্ষকদের পেনশন বাদে এ খাতের বরাদ্দ দাঁড়াবে ৬ হাজার ৫৫৩ কোটি ইউরো। শিক্ষা সাধারণত বাজেটের সবচেয়ে বড় খাত। কিন্তু খসড়া বিল অনুযায়ী আগামী বছর ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে ৭ হাজার ৪৫০ কোটি ইউরো, ফলে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে।

বামপন্থী দলের দিকে অভিযোগের আঙুল
বৃহস্পতিবারের সংকট বৈঠকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানায়, চরম বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবাউড (এলএফআই) এর রাজনীতিকেরাই এই আন্দোলনের সূচনা করেছেন। এলএফআইয়ের জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতারা এ অভিযোগ নাকচ করেছেন।
তাদের পাল্টা অভিযোগ, ম্যাক্রোঁর উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার নির্বাচনের আগে সরকার এই বিক্ষোভকে রাজনৈতিক রং দিচ্ছে।

পুলিশি বাড়াবাড়ির অভিযোগ
শিক্ষার্থী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নাবালকদের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর পন্থা নিচ্ছে। লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস ও ফ্ল্যাশ-বল নামের প্রাণঘাতী নয় এমন বন্দুকের ব্যবহারের কথা তারা বলেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। এক্স-এ সংস্থাটি লিখেছে, ‘শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে হবে, লাঠি দিয়ে পেটানো চলবে না।’
শুক্রবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশি সহিংসতার তিনটি তদন্ত শুরু হয়েছে।

ফ্রান্সের বাইরেও ছড়াতে পারে
বিক্ষোভ ফ্রান্সের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিতও মিলেছে। বেলজিয়ামের লিয়েজ শহরের কিছু হাইস্কুলের শিক্ষার্থী বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ শুরু করে।
সিটি হলের এক মুখপাত্র জানান, শুক্রবার সেখানকার হাইস্কুলগুলো বন্ধ ছিল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









