পাহাড়ের চূড়ায় সাদা বরফ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সেখানে সময় থেমে আছে। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালা এখন বলছে অন্য কথা। ২০২৬ সালে দেশটির হিমবাহগুলো এক বছরের মধ্যে হারিয়েছে অবশিষ্ট বরফের প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বিজ্ঞানীদের কাছে এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কতটা বেড়েছে, তার একটি স্পষ্ট সংকেত।
সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ পর্যবেক্ষণ সংস্থার পরিচালক ম্যাথিয়াস হুস বলছেন, “এটা সত্যিই বিপর্যয়কর।” কারণ, এত দিন আল্পসের বিজ্ঞানীরা এক বছরে ২ শতাংশ বরফ হারানোকে ‘চরম’ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতেন। এবার সেই সীমার প্রায় তিন গুণ বরফ গলে গেছে।
হিমবাহ গলছে—এটা অবশ্য নতুন খবর নয়। পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বরফ কমবে, সেটাই স্বাভাবিক। এর পেছনে প্রধান কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো থেকে তৈরি গ্রিনহাউস গ্যাস। কিন্তু এবারের ঘটনাকে আলাদা করে তুলেছে গলনের গতি।
সমস্যার শুরু হয়েছিল শীতেই। সুইজারল্যান্ডে গত শীত ছিল তুলনামূলক উষ্ণ। ফলে হিমবাহের ওপর স্বাভাবিকের চেয়ে কম তুষার জমেছিল। এরপর মে ও জুনের তীব্র তাপপ্রবাহে সেই তুষারের বড় অংশ দ্রুত গলে যায়। নিচে বেরিয়ে আসে পুরোনো, কালচে বরফ।
এখানেই শুরু হয় আরেক বিপদ। নতুন তুষার সূর্যের আলো অনেকটা প্রতিফলিত করে। কিন্তু খালি বরফ তুলনামূলকভাবে বেশি আলো ও তাপ শোষণ করে। ফলে বরফ যত বেশি উন্মুক্ত হয়, তত বেশি গরম হয় এবং আরও দ্রুত গলে যায়। অর্থাৎ বরফ গলতে শুরু করলে সেটি নিজেই আরও দ্রুত গলার পরিবেশ তৈরি করে।
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবিজ্ঞানী ফাবিয়েন মসিওঁ বলেন, দশ বছর আগেও তিনি ভাবেননি যে এত দ্রুত হিমবাহের বরফ হারিয়ে যেতে পারে। জলবায়ুবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে এবারের গলন একই সঙ্গে ভয়াবহ এবং প্রত্যাশিত—কারণ পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ছে।
হিমবাহকে শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্যের অংশ ভাবলে ভুল হবে। এগুলো আসলে বিশাল প্রাকৃতিক জলাধার। গরম ও শুষ্ক সময়ে বরফ গলে যে পানি বের হয়, তা কৃষিকাজ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এমনকি নৌপরিবহনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলো থেকে প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন লিটার পানি বের হয়েছে। এই পানি এ বছর পানির ঘাটতি কমাতে সাহায্য করেছে। কিন্তু এখানেই রয়েছে ভবিষ্যতের বিপদ।
কারণ, হিমবাহের পানি এক অর্থে অতীতের সঞ্চয়। হুসের ভাষায়, তাপপ্রবাহের সময় যে পানি এখন নদীতে নেমে আসছে, তার অনেকটাই বহু দশক বা শতাব্দী ধরে বরফের মধ্যে জমা ছিল। আজ সেই পানি আমাদের কাজে লাগছে। কিন্তু বরফ যদি একই হারে গলতে থাকে, ভবিষ্যতের তাপপ্রবাহে সেই সঞ্চিত পানি আর পাওয়া যাবে না।
এর প্রভাব রাইন নদীতেও দেখা গেছে। চলতি গ্রীষ্মে নদীটির কয়েকটি অংশে পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে যায়। ফলে নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের খবর এসেছে পাহাড়ের আরও উঁচু এলাকা থেকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতাতেও গ্রীষ্ম শেষে কোথাও কোথাও তুষার অবশিষ্ট ছিল না। কিছু হিমবাহের সর্বোচ্চ অংশেই প্রায় চার মিটার বরফ হারিয়েছে। অথচ বছরের এই সময়ে সেখানে কয়েক মিটার শীতের তুষার থাকার কথা।
তুষারকে বলা যায় হিমবাহের ‘খাবার’। শীতের তুষার গ্রীষ্ম পার করে টিকে থাকলে সময়ের সঙ্গে চাপ খেয়ে শক্ত বরফে পরিণত হয়। এভাবেই হিমবাহ নতুন বরফ পায়। কিন্তু তুষার যদি গ্রীষ্মেই গলে যায়, তাহলে নিচের দিকে হারানো বরফ আর পূরণ হয় না। হিমবাহ তখন ক্রমেই ছোট হতে থাকে।

সুইজারল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলের প্লাটালভা হিমবাহ ইতিমধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। আরও অনেক হিমবাহের ক্ষেত্রেও একই পরিণতির আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
হিমবাহ পাতলা হয়ে যাওয়ার আরেকটি বিপদ আছে। দীর্ঘদিন বরফ গলে গেলে পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হতে পারে। একই সঙ্গে মাটির ভেতরের জমাট অংশ গলে গেলে বাড়তে পারে ভূমিধসের ঝুঁকি। চরম পরিস্থিতিতে সেখান থেকে আকস্মিক বন্যাও হতে পারে।
তবে সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। বিজ্ঞানীদের মতে, কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমাতে পারলে বিশ্বের অনেক হিমবাহকে এখনও রক্ষা বা স্থিতিশীল করা সম্ভব। বিশেষ করে হিমালয় ও মেরু অঞ্চলে, যেখানে পৃথিবীর বিপুল পরিমাণ বরফ জমা আছে, জলবায়ু রক্ষার পদক্ষেপ বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
হিমবাহ তাই শুধু বরফ নয়। এটি সময়ের ভেতর জমিয়ে রাখা পানি। বহু দশক, কখনো শতাব্দী ধরে যে পানি পাহাড়ের চূড়ায় বরফ হয়ে ছিল, আমরা এখন তা দ্রুত নদীতে নামিয়ে দিচ্ছি। আজ তা আমাদের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে, বিদ্যুৎ দিচ্ছে, কৃষিকে বাঁচাচ্ছে। কিন্তু সেই সঞ্চয় শেষ হয়ে গেলে কী হবে?
আল্পসের গলতে থাকা বরফ যেন সেই প্রশ্নই করছে। পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার গল্পটি শুধু তাপমাত্রার গল্প নয়; এটি পানির গল্প, নদীর গল্প, কৃষির গল্প এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের ভবিষ্যতের গল্প।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









