ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আটক হয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগের প্রতিবাদে মঙ্গলবার পার্লামেন্ট থেকে নির্বাচন কমিশনের দপ্তর পর্যন্ত মিছিলের আয়োজন করে বিরোধীদের ইন্ডিয়া জোট।
মঙ্গলবার সকালে পার্লামেন্টের মকর দ্বার থেকে মিছিল শুরু করেন ইন্ডিয়া জোটের নেতারা।
তাদের গন্তব্য ছিল নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তর ‘নির্বাচন সদন’। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ লেখা ব্যানার। এ সময় জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগানও দেওয়া হয়।
পরে আকাশবাণী ভবনের প্রাঙ্গণে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন বিরোধী দলের নেতারা ও কর্মীরা। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কথিত অনিয়ম এবং জ্ঞানেশ কুমারের ‘একতরফা’ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই এই কর্মসূচি বলে জানিয়েছে ইন্ডিয়া জোট।
মঙ্গলবার একই দিনে এর আগেও রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে কিছু সময়ের জন্য আটক করা হয়েছিল।
দুপুরের দিকে তাদের একটি পুলিশ বাসে তোলা হয়। কিছুক্ষণ পর অবশ্য তাদের সেখান থেকে নামতে দেখা যায়।
আকাশবাণী ভবনে সাংবাদিকদের রাহুল গান্ধী বলেন, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় সেখান থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরে হলেও তাদের সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশনের কাজ হলো সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা। অন্তত ৩০০ জন সংসদ সদস্য জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করতে চান। কিন্তু তিনি ভয় পাচ্ছেন। দেশে কী হচ্ছে, আমি বুঝতে পারছি না।’’
রাহুল আরও বলেন, ‘‘জনগণের প্রতিনিধিরাই যদি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করতে না পারেন, তাহলে গণতন্ত্রের অর্থ কী?’’

সাক্ষাতের আবেদন নিয়ে টানাপোড়েন
রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে সন্ধ্যায় আটক করার আগে কংগ্রেস সূত্র জানায়, দলের পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।
কংগ্রেসের একটি সূত্রের দাবি, নির্বাচন কমিশনের কোনো কর্মকর্তা এসে আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে বৈঠকের আশ্বাস দিলে রাহুল অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে পারেন। তবে তার শর্ত ছিল, বৈঠকে ৩০০ জন সংসদ সদস্যই অংশ নেবেন।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য
মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে এক বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশন জানায়, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে আগে সাক্ষাতের জন্য আবেদন করতে হয়। এরপর উভয় পক্ষের সম্মত সময় অনুযায়ী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিশনের দাবি, মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত তাদের কাছে এ ধরনের কোনো আবেদন পৌঁছায়নি।
কমিশন জানায়, বিকেল ৪টার পর সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব নিয়ে তারা আলোচনা করছিল। তখন দিল্লি পুলিশের ডিসিপি তাদের জানান, প্রায় ২৪০ জন সংসদ সদস্যের একটি দল সংসদ ভবন অ্যানেক্সে বৈঠক করতে চায়।
নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি প্রচলিত নিয়মের বাইরে হওয়ায় তারা প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য মনে করেনি।
কমিশনের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের বৈঠক নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়েই হওয়ার কথা।
এরপর কমিশন একটি ‘নজিরবিহীন’ প্রস্তাব দেয়। তাদের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তাকে সংসদ ভবন অ্যানেক্সে পাঠিয়ে সংসদ সদস্যদের স্মারকলিপি গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে বিরোধী সংসদ সদস্যরা সেই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন বলে কমিশন জানিয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
দিল্লি পুলিশও জানিয়েছে, বিক্ষোভ কর্মসূচির জন্য কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি এবং কোনো অনুমতিও দেওয়া হয়নি।
পুলিশের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে বিক্ষোভকারীদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ অন্য বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, আইন ও জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিরোধীদের আন্দোলনের কর্মসূচি
জ্ঞানেশ কুমার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করেছে কংগ্রেস।
দলের সোমবারের বৈঠকে পরবর্তী কর্মসূচির রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়।
কংগ্রেস এখন নির্বাচন কমিশনকে ব্যঙ্গ করে ‘চিটিং কমিশন’ বলেও অভিহিত করছে।
দলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১০ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ প্রচারাভিযান চালানো হবে। এতে ব্লক পর্যায়ে সাইকেল ও মোটরসাইকেল মিছিল, জ্ঞানেশ কুমারের কুশপুতুল পোড়ানো এবং প্রচারপত্র বিতরণ করা হবে।
এরপর ২৫ অক্টোবর থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত বুথ পর্যায়ে ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ শীর্ষক জনসভা বা চৌপাল আয়োজন করা হবে। এসব কর্মসূচিতে কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতারা অংশ নেবেন।
১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে বড় সমাবেশের পরিকল্পনা রয়েছে। ২৫ ও ২৬ নভেম্বর দিল্লির আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছয়টি পৃথক মিছিল বের হবে ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচির আওতায়।
বিভিন্ন নেতা এসব মিছিলে নেতৃত্ব দেবেন। ২৬ নভেম্বর সংবিধান দিবসে সব মিছিল দিল্লিতে এসে মিলিত হবে।
সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে বিষয়টি তুলবে কংগ্রেস
কংগ্রেসের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৬ নভেম্বরের পর শুরু হতে যাওয়া সংসদের শীতকালীন অধিবেশনেও নির্বাচন কমিশন ও জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে অভিযোগগুলো তুলে ধরা হবে। দলটি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনার কথাও ভাবছে।
এদিকে সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত একটি মামলার দিকেও নজর রাখছে বিরোধীরা। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে বিষয়টি শুনানি চলছে।
সুপ্রিম কোর্ট ইতোমধ্যে জ্ঞানেশ কুমার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে নোটিশ পাঠিয়েছে।
আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে, নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত যদি সর্বসম্মতভাবে নেওয়া না হয়, তাহলে সেটি স্থগিত রাখার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নিতে আদালত এখনো রাজি হয়নি।
আদালত বলেছে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন সবসময় শতভাগ নির্ভুল নাও হতে পারে। মামলাটির পরবর্তী শুনানি অব্যাহত থাকবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









