আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর নজিরবিহীন আঘাত। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে তার ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা আবার ফিরিয়ে আনা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নাভি পিল্লাই এ আহ্বান জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) দুর্বল করার জন্য ওয়াশিংটনের নেওয়া পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে তিনি এ কথা বলেন।
নেদারল্যান্ডসের হেগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৮৫ বছর বয়সী পিল্লাই বলেন, ‘আমার বার্তা হলো, বিশ্বের বাকি অংশের জন্য নেতৃত্ব দেওয়া এবং মুক্তির পথ দেখানোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরে যেতে হবে।’
পিল্লাই বর্তমানে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত শুক্রবার তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার ঘোষণা আসে। এর কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। আদালতটি পিল্লাইয়ের সাবেক কর্মস্থল।
পিল্লাই মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার এই সময়কে কাকতালীয় বলে মনে করার কারণ নেই। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নজিরবিহীন আঘাত। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা আগে থেকেই চলছিল।
নিষেধাজ্ঞার পর আদালতের কর্মকর্তাদের প্রতি সংহতি জানাতে তিনি হেগে ফিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কর্মীদের সঙ্গে দেখা করেন। পিল্লাই বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধবিচার প্রতিষ্ঠায় যাঁরা কাজ করছেন এবং যাঁরা ইতিমধ্যে নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি।
গাজায় গণহত্যার তদন্ত নিয়ে বিতর্ক
গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের একটি তদন্তে গণহত্যার সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াকে ‘ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করা বিভিন্ন গোষ্ঠীর মিথ্যা প্রচারণা’ বলে মন্তব্য করেন পিল্লাই। ইসরায়েলবিষয়ক ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রচারণা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর চাপ—দুটিই আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বলে তার বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
শান্তি পুরস্কারজয়ী মাত্র ২১তম নারী
নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার খবর জানার পর নিজের প্রথম ভাবনার কথা জানাতে গিয়ে পিল্লাই বলেন, ১৯০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি এ পুরস্কার পাওয়া মাত্র ২১তম নারী। তার মতে, এই পরিসংখ্যানই নারীদের প্রতি দীর্ঘদিনের বৈষম্যের গভীরতা তুলে ধরে। ১৯৯০-এর দশকে রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ছিলেন পিল্লাই। সে সময় তাঁর অংশগ্রহণে একটি বেঞ্চ ঐতিহাসিক রায় দেন। ওই রায়ে বলা হয়, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা গণহত্যার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
পিল্লাইয়ের মতে, যুদ্ধাপরাধের মামলাগুলোতে এখনো যৌন সহিংসতার যথেষ্ট বিচার হচ্ছে না। এর একটি কারণ, পুরুষপ্রধান কৌঁসুলিরা মনে করেন, এসব অপরাধকে গুরুত্ব দিলে মূল মামলার মনোযোগ অন্যদিকে সরে যেতে পারে।আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে গিয়ে থেমে থাকতে চান না তিনি। বরং যুদ্ধের সময় যৌন সহিংসতার বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে কাজ চালিয়ে যেতে চান।
পিল্লাই বলেন, রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল এবং পরবর্তী আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর কাজের মাধ্যমে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তাই যৌন সহিংসতাকে আর যুদ্ধের পার্শ্বক্ষতি কিংবা সেনাদের পুরস্কার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









