জেরুজালেমকে ঘিরে আজকের সংঘাতকে কেবল আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের বিরোধ, সীমান্তের বিবাদ কিংবা দুটি জনগোষ্ঠীর ভূখণ্ডগত দাবির সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে তার ঐতিহাসিক গভীরতা অধরাই থেকে যায়। এই শহরের ইতিহাসে ভূখণ্ডের ওপর কর্তৃত্বের প্রশ্ন কখনোই একা আসেনি; তার সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছে ধর্মীয় স্মৃতি, রাজনৈতিক বৈধতা এবং অন্যের ইতিহাসকে স্বীকার কিংবা অস্বীকার করার ক্ষমতা। জেরুজালেমের সংকট তাই একই সঙ্গে একটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ইতিহাসের অর্থ নির্ধারণের সংগ্রাম। প্রশ্নটি শুধু কে শহরটি শাসন করবে, তা নয়; কে তার অতীতের ব্যাখ্যা দেবে, কার স্মৃতি সেখানে স্বীকৃতি পাবে এবং কোন জনগোষ্ঠীর অধিকারকে বৈধ বলে গণ্য করা হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ফাতিহ সুলতান মেহমেত ফাউন্ডেশন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেকেরিয়া কুরশুনের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে ক্রুসেডারদের হাতে ১০৯৯ সালে জেরুজালেমের পতন এবং ১১৮৭ সালে সালাহউদ্দিন আইয়ুবির শহরটি পুনর্দখল এই প্রশ্নগুলো বোঝার দুটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। তিনটি আব্রাহামীয় ধর্মের কাছে পবিত্র জেরুজালেম বরাবরই ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্বের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিশ শতকের গোড়ার দিকে শহরটির শেষ দিককার উসমানীয় গভর্নরদের একজন মাজিদ বে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একে মুসার বিচরণের স্থান, যিশুর মাহদি-সংক্রান্ত প্রত্যাশার স্থান এবং মহানবী মুহাম্মদের মেরাজের স্থান হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তার বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই যে, জেরুজালেমের ওপর দাবি কখনোই নিছক মানচিত্রের রেখা দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
ক্রুসেড: পবিত্রতার ভাষায় ক্ষমতার বিস্তার
একাদশ শতাব্দীর শেষভাগে পশ্চিম ইউরোপ থেকে শুরু হওয়া প্রথম ক্রুসেডের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল জেরুজালেম দখল। পোপ দ্বিতীয় আরবানের আহ্বানে সংগঠিত এই অভিযানের ধর্মীয় যুক্তি ছিল মুসলমানদের কাছ থেকে চার্চ অব দ্য হলি সেপালকার পুনরুদ্ধার এবং যিশুখ্রিষ্টের দ্বিতীয় আগমনের পথ সুগম করা। মুসলমানদের ‘অবিশ্বাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে যুদ্ধকে পবিত্র কর্তব্যের রূপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের এমন সব অভিযানের মতো এখানেও ঘোষিত উদ্দেশ্য এবং কার্যকর স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য ছিল।
সামন্ততান্ত্রিক ইউরোপে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার তুলনায় জমি ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা, অভিজাতদের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং প্রাচ্যের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য গির্জার আকাঙ্ক্ষা ক্রুসেডের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ধর্মীয় বিশ্বাস এখানে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপরীত কিছু ছিল না; বরং বিশ্বাসের ভাষাই ক্ষমতার সম্প্রসারণকে নৈতিক বৈধতা দেওয়ার উপায় হয়ে উঠেছিল। এই প্রক্রিয়ায় পোপের কর্তৃত্ব ও পশ্চিম ইউরোপে তার মর্যাদা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

১০৯৯ সালে জেরুজালেম দখলের পর সেই ক্ষমতার রাজনীতি তার সহিংস রূপ প্রকাশ করে। মুসলমানদের পাশাপাশি শহরের ছোট ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপরও নেমে আসে নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ। যে অভিযানের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল পবিত্র স্থান উদ্ধারের নামে, তার পরিণতিতে প্রতিষ্ঠিত হয় এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার নির্ধারণের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। প্রায় ৮৮ বছরের ক্রুসেডার শাসন তাই শুধু সামরিক দখলের ইতিহাস নয়; এটি সেই প্রক্রিয়ারও ইতিহাস, যার মধ্য দিয়ে একটি শহরের বহুমাত্রিক পরিচয়কে একক কর্তৃত্বের অধীন করার চেষ্টা চলে।
সালাহউদ্দিন: পুনর্দখল ও শাসনের বৈধতা
১১৮৭ সালে সালাহউদ্দিনের জেরুজালেম পুনর্দখলের পেছনে ছিল ধর্মীয় দায়িত্ববোধ এবং মুসলিম রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার কৌশল। ফাতিমীয় শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মিসরের প্রতি ক্রুসেডারদের আগ্রহ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছিল। এ অবস্থায় সুন্নি তুর্কি শাসকগোষ্ঠী জেনগিদের সহায়তা চাওয়া হয়। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকা সালাহউদ্দিন এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই নিজের উত্থানের পথ তৈরি করেন।
আল-আকসা মসজিদ ও ডোম অব দ্য রককে ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা মুসলিম বিশ্বের কাছে ছিল গভীর মর্যাদার প্রশ্ন। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন ছিল বিভক্ত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সংহতি। সালাহউদ্দিন প্রথমে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকার প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম ও তুর্কি আমিরাতগুলোকে একত্র করেন। জেনগিদের পক্ষে মিসর জয় করে অকার্যকর হয়ে পড়া ফাতিমীয় খিলাফতের অবসান ঘটান। হিজাজ, ইয়েমেন ও উত্তর আফ্রিকায় অভিযান চালানোর পাশাপাশি দামেস্ক ও আলেপ্পোর অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করেন, ইরাকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং আইয়ুবীয় রাষ্ট্র গড়ে তোলেন।

এভাবে মিসর, সিরিয়া, ইরাক এবং জেরুজালেম ছাড়া ফিলিস্তিনের অধিকাংশ অঞ্চল তার নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু সামরিক শক্তির বিস্তারই ছিল না তার প্রস্তুতির একমাত্র দিক। নিজের শাসনের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৮ বছরের প্রস্তুতির পর তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযানে অগ্রসর হন।
তিবেরিয়াস হ্রদের কাছে হিত্তিনে সেনাবাহিনী সমবেত করে সালাহউদ্দিন জেরুজালেমের আত্মসমর্পণ প্রস্তাব করেন। ক্রুসেডাররা তা প্রত্যাখ্যান করলে ১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তিনি শহরটির প্রাচীরের সামনে পৌঁছান। ১২ দিনের অবরোধের পর ২ অক্টোবর জেরুজালেম পুনর্দখল করেন। দিনটি মহানবী মুহাম্মদের মেরাজের বার্ষিকীর সঙ্গে মিলে যাওয়ায় বিজয়টি মুসলিমদের কাছে বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য লাভ করে।
তবে এই বিজয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কেবল ধর্মীয় প্রতীকের মধ্যে নিহিত ছিল না। সালাহউদ্দিন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং অমুসলিম বাসিন্দাদের জীবন, সম্পত্তি ও মর্যাদার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। মুসলমান ও অমুসলমান উভয়ের জন্য নিজ নিজ ধর্মীয় স্থানে যাওয়ার সুযোগও বজায় রাখেন। ক্রুসেডারদের দখলদারির অভিজ্ঞতার বিপরীতে তার এই নীতি এমন একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনা সামনে আনে, যেখানে শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যের ধর্মীয় পরিচয় মুছে ফেলা অপরিহার্য নয়।
বর্তমানের জেরুজালেম ও ইতিহাসের দায়
আজ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের কেন্দ্রে থাকা জেরুজালেম আবারও বৈধতা, পরিচয় ও সার্বভৌমত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। সমগ্র শহরকে ইসরায়েলের অবিভাজ্য রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠার নীতি এবং তার বহুধর্মীয়, বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাসের ওপর একক কর্তৃত্ব আরোপের প্রচেষ্টাকে ক্রুসেডার যুগের বর্জনমূলক শাসনের সঙ্গে তুলনা করেছেন কুরশুন। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের একটি মৌলিক দিক হলো শহরটির সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, পরিচয় ও অধিকার রক্ষা।
তবে ইতিহাসের তুলনা করতে হলে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: অতীতের ঘটনাকে বর্তমানের রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে নিছক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। ইতিহাস কোনো একক জনগোষ্ঠীর চিরস্থায়ী মালিকানার সনদ নয়। বরং এটি দেখায়, ক্ষমতাবানরা কীভাবে ধর্ম, স্মৃতি ও অতীতের ব্যাখ্যাকে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করে। জেরুজালেমের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শহরটির পবিত্রতা একাধিক ধর্মের বিশ্বাস ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত।

কুরশুনের মতে, ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পশ্চিমা খ্রিষ্টীয় জায়নবাদের পরকালকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কল্পনা এবং ইসরায়েলের নীতির সঙ্গে যুক্ত শারীরিক ও মানসিক দখলদারির অবসান প্রয়োজন। তিনি আরও মনে করেন, ইসরায়েলের প্রতিবেশী দেশগুলো কৌশলগত ঐক্য গড়ে তুলতে পারলে আঞ্চলিক শক্তির উদ্যোগে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু সামরিক বা কৌশলগত ঐক্যের সম্ভাবনার চেয়েও মৌলিক প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা কীভাবে জেরুজালেমের বহুধর্মীয় চরিত্র এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষের অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে।
হিত্তিনের যুদ্ধ থেকে আজকের জেরুজালেম পর্যন্ত ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি শহরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা আর তার শাসনের নৈতিক বৈধতা অর্জন করা এক বিষয় নয়। ধর্মীয় দাবিকে একচ্ছত্র ক্ষমতার যুক্তিতে পরিণত করলে ইতিহাস বর্জন ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। বিপরীতে, ন্যায়বিচার ও বহুত্বের স্বীকৃতি শাসনের অন্য সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
জেরুজালেমের সংকট তাই অতীতের কোনো দূরবর্তী প্রতিধ্বনি নয়। এটি ইতিহাসের অর্থ, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং মানুষের অধিকারের মধ্যে চলমান সংঘাতেরই বর্তমান রূপ। শহরটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্নে সবচেয়ে জরুরি বিষয় শুধু কে বিজয়ী হবে তা নয়, বরং এমন কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি না, যেখানে একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও স্মৃতিকে স্বীকার করতে অন্য জনগোষ্ঠীর অধিকার অস্বীকার করতে হবে না।
আনাদুলো


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









