জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শনিবার ফ্রান্স, জার্মানি ও পর্তুগালে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। বেশির ভাগ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলেও কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। তবে আগের দুই সপ্তাহের তুলনায় ফ্রান্সে সহিংসতা কম হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে জার্মানির কয়েকটি শহরে রাতভর সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে।
রবিবার (১ নভেম্বর) ফ্রান্সের কর্মকর্তারা জানান, শনিবারের বিক্ষোভে সহিংসতার মাত্রা আগের সপ্তাহগুলোর তুলনায় কম ছিল। তবে সোমবার থেকে স্কুল খুলতে যাওয়ায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, দেশটির উচ্চবিদ্যালয়গুলো এই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। শরৎকালীন ছুটি শেষে সোমবার এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে।
শনিবার প্যারিসের পূর্বাঞ্চলে বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে একদল বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে। এতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া আইফেল টাওয়ারের বিপরীত পাশের একটি পর্যবেক্ষণস্থলে মুখোশধারীরা পুলিশের দিকে আতশবাজি নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক দফা অভিযান চালালে আতঙ্কিত পর্যটকেরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।
১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের তুলনায় এবার সহিংসতা অনেক কম ছিল। ওই দিন কয়েক ঘণ্টার সহিংসতায় একটি নগর ভবনে আগুন দেওয়া হয় এবং দুই হাজারের বেশি দোকানে লুটপাট চালানো হয়। পরবর্তী ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভেও ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার রাত পর্যন্ত ৭৭৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ১৭ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২ হাজার ৬২৮ জনকে। আর গত সপ্তাহে গ্রেপ্তার করা হয় ১ হাজার ৩১৪ জনকে। প্যারিস ও মার্সেইয়ের পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকটি দোকানে হামলা হলেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
ফ্রান্সের একজন জাতীয় পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বিক্ষোভে শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণকারী ও সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের উপস্থিতি বেশি হতে পারে—এমন প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।
মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার নতুন করে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে শিক্ষার্থী সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। এ কারণে স্কুল খোলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে পুলিশ।
জার্মানিতে সংঘর্ষ ও লুটপাট
ফ্রান্সের পাশাপাশি শনিবার জার্মানিতেও এক লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেন। শিক্ষা, আবাসন ও জলবায়ু সুরক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে মূলত তরুণেরা এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। দিনের বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ হলেও রাতে কয়েকটি শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
ফ্রাঙ্কফুর্টে বিক্ষোভ শেষে একদল দাঙ্গাকারী শহরের কেন্দ্রস্থলে পুলিশের ওপর হামলা চালায় এবং দোকানে লুটপাট করে। এতে শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ঘটনায় ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৫৪ জনকে আটক করা হয়েছে। শহরের ১৭টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে পাঁচটিতে লুটপাট চালানো হয়েছে। রোববার ভোরের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
জার্মানির হেসে রাজ্যের গভর্নর বরিস রাইন ফ্রাঙ্কফুর্টের সহিংসতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই শাস্তি ছাড়া থাকতে পারে না।

কোলোন শহরেও শনিবার রাতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। বার্লিনে বিক্ষোভকারীরা বোতল ও আতশবাজি নিক্ষেপ করে পুলিশের ওপর হামলা চালান।
বিক্ষোভের আয়োজক তরুণদের সংগঠন ‘জেন জি রেগেল্ট’ এক বিবৃতিতে সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে। তাদের দাবি, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির সঙ্গে সহিংসতার কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার ডোব্রিন্ট অভিযোগ করেছেন, বামপন্থী সহিংস গোষ্ঠী ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে নিজেদের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। দাঙ্গা ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
পর্তুগালে আবাসনসংকটের প্রতিবাদ
এদিকে আবাসনসংকট ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার দিনের বেলায় হাজারো মানুষ শহরের রাস্তায় মিছিল করেন। পরে কয়েক শ বিক্ষোভকারী শহরের কেন্দ্রস্থলের ঐতিহাসিক রোসিও চত্বরে অবস্থান নেন।
রবিবার ভোরে দাঙ্গা পুলিশ বলপ্রয়োগ করে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয়। এ সময় তাঁবু সরিয়ে দেওয়া হয় এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়।
স্পেনে শুরু হওয়া জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিবিরোধী আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পর্তুগালেও কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছে। দেশটিতে বিশেষ করে আবাসন ও বাড়িভাড়ার ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









