ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পরও নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার দল লিকুদ পার্টি ও ডানপন্থী মিত্ররা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুললেও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে দেশটিতে সাংবিধানিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ইসরাইলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ১২০ আসনের নেসেটে তার জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। বিপরীতে বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা ৬৭।
নির্বাচনে আরব-সমর্থিত রাজনৈতিক দলগুলো ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছে। দল দুটি মিলিয়ে ১৯টি আসন অর্জন করেছে। ফলে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী দলগুলোর কাছে তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ নেতানিয়াহুর
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর নেতানিয়াহু ও তার দল অভিযোগ করেছে, আরব রাজনৈতিক দলগুলো বিদেশি অর্থায়ন, ঘুষ ও কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করেছে। এমনকি বিদেশি রাষ্ট্রগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন নেতানিয়াহু।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনও নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ফলাফলের বৈধতা নিয়ে কোনো গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পায়নি।
নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, বিদেশি দেশগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে ইসরাইলের নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে।
আরব নেতাদের তদন্ত নিয়ে নতুন বিতর্ক
নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনির ভূমিকা নিয়ে। তিনি নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবে কয়েকজন আরব রাজনৈতিক নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নেন।
কিন্তু দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারা পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান।
এ নিয়ে সরকার ও অ্যাটর্নি জেনারেলের মধ্যে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহুর দল অভিযোগ করেছে, অ্যাটর্নি জেনারেল তদন্তে বাধা দিচ্ছেন। অন্যদিকে বিরোধী নেতারা বলছেন, গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, গণতন্ত্রকে দুর্বল করার চেষ্টা
নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা নির্বাচনের ফলের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদও এ পরিস্থিতিকে গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আরব রাজনৈতিক দলগুলোও নেতানিয়াহুর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, আরব ভোটারদের ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ ও নির্বাচনী সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এ ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
নতুন সরকার গঠনে প্রেসিডেন্টের উদ্যোগ
এদিকে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল গ্রহণের পর তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করছেন।
নিয়ম অনুযায়ী, যে নেতা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারবেন বলে প্রেসিডেন্ট মনে করবেন, তাকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হবে।
নেতানিয়াহুর দল এককভাবে ২৭টি আসন পেলেও তার জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেক দূরে রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের সামনে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে বিরোধী শিবিরের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে।
কোন দিকে যাচ্ছে ইসরাইলের রাজনীতি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া, নতুন সরকার গঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে ইসরাইল এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে রয়েছে।
নেতানিয়াহু যদি আরব দলগুলোর সমর্থনকে অবৈধ বা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন, তাহলে বিরোধী জোটের সরকার গঠনের পথ জটিল হতে পারে। অন্যদিকে তার এই অবস্থান বিরোধী দলগুলোকে আরও ঐক্যবদ্ধও করতে পারে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর নেতানিয়াহুর অবস্থান এবং নির্বাচনের ফল নিয়ে তার অভিযোগ ইসরাইলের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া আগামী দিনগুলোতে বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









