টানা বর্ষণ, উজানের ঢল কিংবা আকস্মিক বন্যা মুহূর্তেই স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে বন্যার চেয়ে মানুষের অসতর্কতাই বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, পানিবাহিত রোগ, সাপের কামড় কিংবা অন্যান্য দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বহু মানুষ প্রাণ হারান বা আহত হন। তাই বন্যার সময় কিছু বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা জরুরি।
বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী, বন্যার পানিতে নিচের ১০টি ভুল কখনোই করা উচিত নয়।
অপ্রয়োজনে বন্যার পানিতে নামবেন না
বন্যার পানি দেখতে শান্ত মনে হলেও এর নিচে খোলা ম্যানহোল, গর্ত, ভাঙা রাস্তা, ধারালো বস্তু বা বৈদ্যুতিক তার থাকতে পারে। প্রয়োজন ছাড়া পানিতে নামবেন না। নামতেই হলে লাঠি দিয়ে পথ পরীক্ষা করে ধীরে এগোন এবং শক্ত জুতা বা রাবারের বুট ব্যবহার করুন।
পানিতে দাঁড়িয়ে বৈদ্যুতিক সুইচ বা যন্ত্র স্পর্শ করবেন না
বন্যার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। পানিতে দাঁড়িয়ে কখনো সুইচ অন-অফ করবেন না এবং ভেজা হাতে বৈদ্যুতিক যন্ত্র স্পর্শ করবেন না। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে প্রবেশ থেকেও বিরত থাকুন।
বন্যার পানি পান বা রান্নায় ব্যবহার করবেন না
বন্যার পানিতে নর্দমার বর্জ্য, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশে থাকতে পারে। তাই শুধু ফুটানো, বিশুদ্ধ বা বোতলজাত পানি পান করুন। প্রয়োজনে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করুন।
খালি পায়ে পানিতে হাঁটবেন না
খালি পায়ে চলাফেরা করলে পায়ে কাটা, সংক্রমণ এবং সাপ বা অন্য বিষাক্ত প্রাণীর আক্রমণের ঝুঁকি থাকে। নিরাপত্তার জন্য রাবারের বুট বা শক্ত স্যান্ডেল ব্যবহার করুন।
পানির সংস্পর্শে আসা খাবার খাবেন না
বন্যার পানিতে ভিজে যাওয়া বা দূষিত খাবার খেলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগ হতে পারে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্রিজে রাখা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকা খাবারও এড়িয়ে চলুন।
শিশুদের একা পানির কাছে যেতে দেবেন না
বন্যার সময় শিশুরা পানিতে খেলতে আগ্রহী হয়। কিন্তু অল্প গভীর পানিতেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই শিশুদের সবসময় বড়দের তত্ত্বাবধানে রাখুন।
সাপ বা অচেনা প্রাণী দেখলে ধরার চেষ্টা করবেন না
বন্যার সময় সাপসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে চলে আসতে পারে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন এবং প্রয়োজন হলে স্থানীয় উদ্ধারকর্মী বা বন বিভাগের সহায়তা নিন।
বন্যার পানিতে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালাবেন না
পানির গভীরতা বা রাস্তার অবস্থা বোঝা কঠিন। এতে যানবাহন আটকে যাওয়া বা স্রোতে ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। নিরাপদ নিশ্চিত না হয়ে পানির মধ্যে দিয়ে যানবাহন চালানো থেকে বিরত থাকুন।
প্রশাসনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করবেন না
অনেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়ি ছাড়তে চান না, যা বড় বিপদের কারণ হতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।
পানি নেমেই ঘরে প্রবেশ করবেন না
বন্যার পানি সরে গেলেও ঝুঁকি শেষ হয় না। ভেজা বৈদ্যুতিক সংযোগ, দুর্বল দেয়াল, গ্যাস লিক বা বিষাক্ত প্রাণীর উপস্থিতি থাকতে পারে। তাই ঘরে ঢোকার আগে সবকিছু ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিন এবং প্রয়োজনে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করান।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
বন্যা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা না গেলেও সচেতনতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। সরকারি নির্দেশনা মেনে চলুন, নিরাপদ আশ্রয়ে থাকুন এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়িয়ে চলুন।
মনে রাখবেন, বন্যার সময় সাহস দেখানোর চেয়ে সচেতন থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ছোট ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
তথ্যসূত্র : সিডিসি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









