সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী অ্যান কারসনের গদ্যের বই ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট: অ্যান এসে’ থেকে ‘হোয়াট ডাজ দ্য লাভার ওয়ান্ট ফ্রম লাভ?’ লেখাটি দৈনিক এদিন অনলাইন পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করল। আসুন পাঠক আমরা প্রেম প্রেমের কাছে কি চায় অ্যান কারসনের কাছে জেনে নেই।
মেন্তির বিরুদ্ধে আমার অসাধারণ বিজয় আমাকে যতটা আনন্দ দিয়েছিল, তার একশ ভাগের এক ভাগও আনন্দ দেয়নি সেই যন্ত্রণা, যা সে আমাকে দিয়েছিল যখন আমাকে ছেড়ে মঁসিয়ে দ্য রসপিয়েকের কাছে চলে গেল।
স্তাঁদাল, অঁরি ব্রুলারের জীবন
বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, প্রেমিক তার প্রিয় মানুষটিকেই চায়। কিন্তু আসলে ব্যাপারটি ঠিক এম নয়। প্রেমের আকাঙ্ক্ষার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের দিকে ভালো করে তাকালে বিষয়টি বোঝা যায়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, স্যাফোর ৩১ নম্বর খণ্ডকবিতার কথা। সেখানে প্রিয় মানুষটির মুখোমুখি হওয়াও প্রেমিকার জন্য এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা—যদিও মানুষটি দূরে বসে আছে। তাহলে যদি সত্যিই তাদের মিলন ঘটে? সেই মিলন হয়তো তাকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেবে। কবিতাটিতে প্রেমিকার প্রয়োজন তাই প্রিয় মানুষটিকে অধিকার করা নয়। তার প্রয়োজন, প্রিয় মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারা, অথচ তাতে নিজেকে হারিয়ে না ফেলা। তার প্রয়োজন হয়ে ওঠা সেই মানুষটির মতো, যে স্থিরভাবে বসে প্রিয়জনের কথা শোনে। এই শ্রোতার মধ্যে সে নিজের এক নতুন সম্ভাবনাকে দেখতে পায়। এমন একটি সত্তা, যে আকাঙ্ক্ষার ভেতরেও অবিচল থাকতে পারে; যে দেবতাদের সমকক্ষ। প্রেমিকা যদি সেই সত্তায় পৌঁছাতে পারে, তাহলে আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও সে অক্ষত থাকবে। আর যদি না পারে, তাহলে সেই আকাঙ্ক্ষাই তাকে ধ্বংস করতে পারে।
দুটি সম্ভাবনাই কবিতায় পাশাপাশি উপস্থিত। কবি এমন একটি ত্রিভুজ নির্মাণ করেন, যার তিনটি কোণ হলো বর্তমানের বাস্তব সত্তা, সম্ভাব্য আদর্শ সত্তা এবং তাদের মধ্যকার ব্যবধান। দৃষ্টির অবস্থান দ্রুত বদলে যায়। এক মুহূর্তের জন্য তিনটি কোণ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়; পরমুহূর্তেই আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আগে কখনো না-জানা সেই দেবতুল্য সত্তাটি দৃশ্যমান হয়, তারপর মিলিয়ে যায়। এই সংযোগের নাম এরোস—প্রেমের আকাঙ্ক্ষা। প্রেমিকা চায়, এই সংযোগের প্রবাহ যেন তার ভেতর দিয়ে বয়ে যায়। প্রেমের এই আকাঙ্ক্ষার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি সেই অনুভূতির মধ্যে, যাকে বলা যায় মধুর-বিষাদ। আনন্দ ও যন্ত্রণা এখানে একই সঙ্গে উপস্থিত। আর এর প্রাণশক্তি হলো অভাব—যা নেই, যা অধরা, যা এখনো পাওয়া যায়নি।
ব্যাকরণের বিচারে এরোস একটি বিশেষ্য। কিন্তু তার আচরণ ক্রিয়াপদের মতো। সে স্থির থাকে না। সে পৌঁছাতে চায়। আর আকাঙ্ক্ষার এই পৌঁছানোর চেষ্টায় প্রত্যেক প্রেমিককে কল্পনার কাজে নিযুক্ত হতে হয়। মানুষের আকাঙ্ক্ষায় কল্পনার ভূমিকা যে প্রবল, তা নতুন কোনো ধারণা নয়। হোমারের ইলিয়াড-এ হেলেনের বর্ণনা তার এক আদর্শ উদাহরণ। হোমার অবশ্য হেলেনের সৌন্দর্য সরাসরি বর্ণনা করেন না। তিনি শুধু বলেন, ট্রয়ের প্রাচীরের ওপর বসে থাকা বৃদ্ধেরা তাকে যেতে দেখলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন—
ট্রোজান ও সুন্দর বর্ম পরা গ্রিকদের এমন এক নারীর জন্য এত দীর্ঘকাল যন্ত্রণা ভোগ করা অসম্মানের নয়।
ইলিয়াড, ৩.১৫৬–১৫৭

হেলেনের সৌন্দর্য এখানে বর্ণনার চেয়ে কল্পনায় বেশি পূর্ণতা পায়। তিনি হয়ে ওঠেন সবার আকাঙ্ক্ষার বস্তু, সবার কল্পনার নারী—পরিপূর্ণ, অথচ অধরা। প্রেমের তাত্ত্বিকেরা বিভিন্ন দিক থেকে এই কল্পনাশক্তিকে বুঝতে চেয়েছেন। অ্যারিস্টটল তার রেটরিক গ্রন্থে বলেন, আকাঙ্ক্ষা হলো মধুর কিছুর দিকে হাত বাড়ানো। মানুষ যখন ভবিষ্যতের কোনো আনন্দের আশা করে কিংবা অতীতের আনন্দ স্মরণ করে, তখনও সে কল্পনার সাহায্যে সেই আনন্দের কাছে পৌঁছায়। দ্বাদশ শতকের আন্দ্রেয়াস কাপেলানুস তার দে আমোরে গ্রন্থে প্রেমের যন্ত্রণাকেও একইভাবে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, এই যন্ত্রণা কোনো কাজ থেকে জন্ম নেয় না; বরং যা দেখা হয়েছে, তাকে মন যখন বারবার ভাবতে থাকে, তখনই যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। স্তাঁদাল তার বিখ্যাত প্রেমবিষয়ক প্রবন্ধে এই কল্পনাপ্রক্রিয়ার একটি নাম দিয়েছিলেন—‘ক্রিস্টালাইজেশন’, অর্থাৎ স্ফটিকায়ন।
সাল্ৎসবুর্গের লবণখনিতে তিনি এক অদ্ভুত দৃশ্যের কথা বলেছিলেন। শীতের একটি পাতাহীন ডাল পরিত্যক্ত খনিতে ফেলে রাখা হয়। দুই-তিন মাস পর সেটিকে যখন তুলে আনা হয়, তখন তার গায়ে জমে থাকে ঝলমলে স্ফটিক। ছোট্ট ডালটিও তখন অসংখ্য হীরকের মতো ঝিকমিক করে। প্রথমে যে ডালটি সেখানে ফেলা হয়েছিল, তাকে আর চেনাই যায় না। প্রেমিকের মনেও ঘটে তেমন কিছু। স্তাঁদাল লিখেছেন, প্রেমিককে চব্বিশ ঘণ্টা নিজের চিন্তার সঙ্গে একা ছেড়ে দিলে তার প্রিয় মানুষটির মধ্যে সে নতুন নতুন পূর্ণতার প্রমাণ খুঁজে পাবে। যা কিছু ঘটে, যা কিছু সে দেখে বা ভাবে, সবই প্রিয় মানুষটির শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য হয়ে উঠবে। প্রেমিকের কল্পনা প্রিয় মানুষটির গায়ে স্ফটিক জমায়। বাস্তব মানুষটি ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে ওঠেন—আর তার কল্পিত রূপটি হয়ে ওঠে আরও উজ্জ্বল। কিয়ের্কেগার্ডও এই ইন্দ্রিয়নির্ভর আদর্শায়ন নিয়ে ভেবেছেন। আকাঙ্ক্ষার শক্তি কীভাবে আকাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে আরও সুন্দর করে তোলে, কীভাবে আমাদের কল্পনা তার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়—সেই প্রশ্ন তার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। ডন জুয়ানের প্রলোভন সৃষ্টির ক্ষমতার মধ্যেও তিনি এই ইন্দ্রিয়জ আকাঙ্ক্ষার শক্তি দেখতে পেয়েছিলেন। মনোবিশ্লেষণও মানুষের প্রেমে এই কল্পনাপ্রবণতার কথা বলে। এর একটি পরিচিত রূপ হলো ‘ট্রান্সফারেন্স’ বা অনুভূতির স্থানান্তর। মনোবিশ্লেষণের সময় রোগী কখনো চিকিৎসকের প্রতি প্রেমে পড়ে যান, যদিও চিকিৎসক নিজেকে দূরে রাখেন, সতর্ক করেন এবং সেই প্রেমকে নিরুৎসাহিত করেন।
এখানে একটি উদ্বেগজনক ব্যাপার ঘটে। মানুষ কখনো কখনো বাস্তব কোনো মানুষকে ভালোবাসে না; বরং নিজের মনের ভেতর তৈরি করা একটি প্রেমের অবয়বকে সেই মানুষের ওপর আরোপ করে। প্রেমিক নিজের কল্পনা দিয়ে প্রেমের বস্তুটি তৈরি করে নেন। আধুনিক ঔপন্যাসিকদের কাছে এই নির্মাণপ্রক্রিয়া বিশেষ আকর্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে। তলস্তয়ের আন্না কারেনিনা উপন্যাসে আন্নার ভ্রনস্কির প্রতি প্রেমের মধ্যে এই প্রক্রিয়া দেখা যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ভ্রনস্কির সঙ্গে দেখা হলে আন্না তার কাঁধে হাত রাখেন এবং গভীর, আবেগপূর্ণ, অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি যেন অনুপস্থিতির সময়টুকু পুষিয়ে নিতে চাইছেন। আর সেই সঙ্গে নিজের কল্পনায় তৈরি ভ্রনস্কির সঙ্গে বাস্তব ভ্রনস্কির তুলনা করছেন। কল্পনার ভ্রনস্কি বাস্তবের ভ্রনস্কির চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর—এমনকি বাস্তবে যার অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়, তিনি সেই কল্পিত মানুষটির চেয়েও কম। ফ্লবেয়ারের মাদাম বোভারি উপন্যাসেও একই ঘটনা ঘটে। রদলফকে প্রেমপত্র লেখার সময় এমার মনে ভেসে ওঠে অন্য এক পুরুষের ছবি। সেই মানুষটি তৈরি হয়েছে তার সবচেয়ে আবেগময় স্মৃতি, প্রিয় বই এবং গভীরতম আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। কল্পনার মানুষটি এতটাই বাস্তব হয়ে ওঠে যে এমা নিজেই বিস্মিত হয়। অথচ তার গুণাবলির প্রাচুর্য এত বেশি যে মানুষটিকে স্পষ্টভাবে কল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

ইতালো কালভিনোর দ্য ননএক্সিস্টেন্ট নাইট উপন্যাসের নায়িকাও এমন এক প্রেমের অধিকারী। তিনি কেবল সেই নাইটের প্রতিই সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন, যার অস্তিত্ব আসলে একটি শূন্য বর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদের তিনি চেনেন, কিংবা চিনে ফেলা সম্ভব। তাই তারা তার আকাঙ্ক্ষা জাগাতে পারেন না। এখানেই আমরা আবার সেই মূল প্রশ্নের কাছে ফিরে আসি। যা জানা হয়ে গেছে, যা পাওয়া গেছে, যা নিজের অধিকারে এসেছে—তা কি আর আকাঙ্ক্ষার বস্তু থাকতে পারে? স্তাঁদালের ভাষায়, প্রেমে অধিকার পাওয়াটা বড় কথা নয়; আসল কথা আনন্দ। সক্রেটিসের মতে, এরোসের মূলে রয়েছে অভাব। যা আমাদের নেই, আমরা তার দিকেই হাত বাড়াই। আর একবার পেয়ে গেলে সেই হাত বাড়ানোর প্রয়োজন বদলে যায়। ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার বিউটি অ্যান্ড স্যাডনেস উপন্যাসে এই ব্যবধানের একটি সূক্ষ্ম ছবি আছে। উপন্যাসে ওকি একজন ঔপন্যাসিক, আর তার স্ত্রী ফুমিকো একটি সংবাদ সংস্থায় টাইপিস্ট হিসেবে কাজ করেন। ফুমিকো তার স্বামীর পাণ্ডুলিপি টাইপ করে দেন। সদ্যবিবাহিত জীবনে এই কাজের মধ্যেও ওকি এক ধরনের মুগ্ধতা খুঁজে পান। হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি আর ছাপার অক্ষরের মধ্যে যে পার্থক্য, তা প্রথমবার দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। একই লেখা, অথচ রূপ বদলে গেলে তার প্রভাবও বদলে যায়। কিন্তু ধীরে ধীরে এই পার্থক্যের সঙ্গে তিনি অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। পাণ্ডুলিপি ও মুদ্রিত লেখার মধ্যকার ব্যবধান আর তাকে বিস্মিত করে না। ফুমিকোর প্রতি তার আকর্ষণও কমতে থাকে। একসময় তিনি অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। হাতে লেখা ও ছাপার অক্ষরের মধ্যে, বাস্তব ভ্রনস্কি ও কল্পিত ভ্রনস্কির মধ্যে, স্যাফো ও সেই স্থির শ্রোতার মধ্যে, বাস্তব নাইট ও শূন্য বর্মের মধ্যে—এই যে ব্যবধান, আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যেই অনুভূত হয়।
এই ব্যবধানের ওপর দিয়েই প্রেমিকের মনে এরোসের স্ফুলিঙ্গ বয়ে যায়। আনন্দকে জাগিয়ে তোলে। অ্যারিস্টটলের ভাষায়, আনন্দ আত্মার এক ধরনের গতি। কোনো পার্থক্য না থাকলে গতি থাকে না। গতি না থাকলে এরোসও থাকে না। প্রেমিকের মনে যখন এই স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের জ্ঞানের আভাস তৈরি হয়। সে অনুভব করে, এমন কিছু বুঝতে চলেছে, যা আগে কখনো বোঝেনি। গ্রিক কবিদের কাছে এই জ্ঞান অনেক সময় নিজের সম্পর্কে নতুন করে জানার জ্ঞান। এক অচেনা সত্তা যেন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই সত্তাকে পাওয়া যায় তার অভাবের মধ্য দিয়ে—ব্যথার মধ্য দিয়ে, নিজের ভেতরের শূন্যতার মধ্য দিয়ে। সব প্রেমিক অবশ্য এই অভিজ্ঞতাকে নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন না। ভার্জিনিয়া উলফের চরিত্র নেভিল যখন বলে, ‘কিছু একটা এখন আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে’, তখন তার মধ্যে এক ধরনের শান্ত স্বীকারোক্তি আছে। আবার নিৎশের কাছে নিজের সত্তার পরিবর্তন আনন্দ ও উচ্ছ্বাস নিয়ে আসতে পারে।
কিন্তু গ্রিক কবিরা এত সহজে সম্মতি দেন না। তারা স্বীকার করেন, প্রেম প্রথমে মধুর। গ্রিক শব্দ গ্লুকু—মিষ্টি। প্রেমের অভিজ্ঞতা মানুষের সামনে নতুন এক সত্তার সম্ভাবনা খুলে দেয়। তারা অনেক সময় প্রেমের দেবতা এরোসের মধ্যে সেই সম্ভাবনাকে দেবত্ব দিয়েছেন। স্যাফো তার ৩১ নম্বর খণ্ডকবিতায় সেই আদর্শ সত্তাকে দেখতে পান ‘যে মন দিয়ে শোনে’ তার মধ্যে। অন্যদিকে, প্লেটোর সিম্পোজিয়াম গ্রন্থের আলকিবিয়াদিস নিজের আদর্শকে নিজের মধ্যেই স্থাপন করেন। সক্রেটিসকে অনুসরণ করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, নিজের যতটা সম্ভব উন্নতি সাধন করাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিজের মধ্যে নতুন সম্ভাবনাকে ধারণ করার যে উল্লাস, প্রাচীন প্রেমের এসব ছবিতে তা খুব একটা দেখা যায় না। সেখানে মধুর-বিষাদময় এরোস বারবার নেতিবাচক প্রতিচ্ছবি হয়ে ফিরে আসে। হয়তো প্রেমিক যদি নিজের অভাবকে নিজের সত্তার মধ্যে নতুনভাবে গ্রহণ করতে পারতেন, তাহলে এই ছবিটি ইতিবাচক হতে পারত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাতে কি প্রেমিকের আকাঙ্ক্ষা সত্যিই পূর্ণ হতো? প্রেমের কাছে মানুষ আসলে কী চায়?
প্রাচীন গ্রিস থেকে এর একটি উত্তর পাওয়া যায়। প্লেটোর সিম্পোজিয়াম গ্রন্থে নাট্যকার অ্যারিস্টোফেনিস এক জোড়া কাল্পনিক প্রেমিকের কথা বলেন। তারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আছেন। অ্যারিস্টোফেনিস মনে করেন, কেবল শারীরিক মিলন তাদের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা হতে পারে না। তিনি বলেন, তাদের আত্মা অন্য কিছু চায়। কিন্তু সেই চাওয়াকে তারা স্বাভাবিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না। তাই তারা কখনো ভবিষ্যদ্বাণীর মতো, কখনো ধাঁধার মতো করে নিজেদের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের চেষ্টা করেন। কী সেই অন্য কিছু? অ্যারিস্টোফেনিস একটি দৃশ্য কল্পনা করেন। প্রেমিক-প্রেমিকা পাশাপাশি শুয়ে আছেন। এমন সময় দেবতা হেফাইস্টাস তাঁর যন্ত্রপাতি নিয়ে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে মানুষ, তোমরা পরস্পরের কাছ থেকে আসলে কী চাও?’ তারা উত্তর দিতে পারলেন না।

তখন দেবতা আবার বললেন, ‘তোমরা কি এমনভাবে এক হয়ে যেতে চাও, যাতে দিনরাত একে অন্যের কাছ থেকে আলাদা হতে না হয়? যদি তাই চাও, আমি তোমাদের গলিয়ে একসঙ্গে জুড়ে দিতে পারি। তোমরা দুজন থেকে একজন হয়ে যাবে। যত দিন বাঁচবে, এক জীবন ভাগ করে বাঁচবে। মৃত্যুর পরও পাতালে দুজনের বদলে একজন হয়েই থাকবে। বলো, এটাই কি তোমাদের আকাঙ্ক্ষা? এমন মিলন পেলে কি তোমরা সন্তুষ্ট হবে?’
চিরস্থায়ী একত্বের প্রস্তাব। কিন্তু প্রেমিক-প্রেমিকার উত্তর আমরা শুনতে পাই না। বরং অ্যারিস্টোফেনিস নিজেই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন—প্রেমিক এর বাইরে আর কিছুই চাইতে পারে না। এই বক্তব্য কতটা বিশ্বাসযোগ্য? প্রেমের প্রকৃতি সম্পর্কে অ্যারিস্টোফেনিস কিংবা তার মুখপাত্র হেফাইস্টাস কতটা নির্ভরযোগ্য সাক্ষী? এখানে দুটি প্রশ্ন ওঠে। অলিম্পাসের দেবতাদের মধ্যে হেফাইস্টাস ছিলেন এক অবহেলিত, প্রতারিত স্বামী। প্রেমের বিষয়ে তার কর্তৃত্ব তাই কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ। আর অ্যারিস্টোফেনিসের নিজের কল্পকাহিনিই তার সিদ্ধান্তকে দুর্বল করে দেয়। তিনি তো এমন এক আদিম মানবজাতির কথা বলেছিলেন, যাদের শরীর ছিল গোলাকার। তারা ছিল নিজেদের মধ্যে সম্পূর্ণ, এক অখণ্ড সত্তা। কিন্তু সেই একত্বে তারা কি চিরকাল সন্তুষ্ট ছিল? না। তারা নিজেদের শক্তি নিয়ে বড় বড় কল্পনা করতে শুরু করল। তারপর দেবতাদের আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে অলিম্পাসের দিকে গড়িয়ে যেতে লাগল। অর্থাৎ একত্ব পেয়েও তারা অন্য কিছুর দিকে হাত বাড়িয়েছিল।তাহলে এক হয়ে যাওয়াই কি প্রেমের শেষ কথা? প্রেমিকের মন বারবার যে দিকে ঝোঁকে, তা শুধু ‘এক’ হয়ে যাওয়া নয়। তার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে থাকে পৌঁছানোর আনন্দ। আর যদি সেই পৌঁছানো হয় পরিপূর্ণ কিছুর দিকে, তাহলে সেই আনন্দও যেন পরিপূর্ণ হতে পারে। স্যাফোর ১০৫ক নম্বর খণ্ডকবিতায় গাছের ডালে ঝুলে থাকা মিষ্টি আপেলটির কথা মনে করা যাক। আপেলটি দেখা যায়, আকাঙ্ক্ষা জাগায়, কিন্তু নাগালের বাইরে থাকে। তার মিষ্টতা শুধু তার স্বাদে নয়; তার অধরা থাকার মধ্যেও। প্রেমের আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য স্যাফো অসম্পূর্ণতার নানা কৌশল ব্যবহার করেন। প্রেমিকের যুক্তির মধ্যেও এই কৌশল কাজ করে। কখনো সে প্রিয় মানুষটির কল্পিত সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে, কখনো নিজের সত্তাকে নতুনভাবে কল্পনা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার লক্ষ্য একটি নির্দিষ্ট ব্যবধানকে চিহ্নিত করা। দুটি ছবির মাঝখানে থাকা ব্যবধান। একটি বাস্তব। অন্যটি সম্ভাব্য। একটি এখনকার মানুষ। অন্যটি সেই মানুষ, যিনি হতে পারতেন, কিংবা যাকে প্রেমিক তার কল্পনায় নির্মাণ করেছেন। দুটি ছবিকে এক জায়গায় মেলানো যায় না, কারণ তারা একই বাস্তবতার স্তর থেকে উঠে আসেনি। অথচ প্রেমিক তাদের দুটিকেই দেখতে চায়। তাদের মধ্যকার পার্থক্যটুকুও অক্ষুণ্ণ রাখতে চায়।

এই দুইয়ের মধ্যে চলাচল করাই প্রেমের এক গোপন কৌশল। হয়তো প্রেমিক প্রেমের কাছে শেষ পর্যন্ত কোনো মানুষকে পাওয়ার নিশ্চয়তা চায় না। সে চায় এমন একটি ব্যবধান, যার দিকে বারবার হাত বাড়ানো যায়; এমন একটি সম্ভাবনা, যা কখনো সম্পূর্ণ ফুরিয়ে যায় না। প্রেমের আনন্দ হয়তো অধিকার পাওয়ার মধ্যে নয়। বরং যা আছে এবং যা হতে পারে—এই দুইয়ের মাঝখানে, সেই অতিক্রম করা যায় না এমন অথচ আকর্ষণীয় দূরত্বের মধ্যে।
আর সেই দূরত্বের নামই এরোস।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









