ডিমের দাম বাড়লেও তার সুফল পাচ্ছেন না পাবনার পোলট্রি খামারিরা। বরং মুরগির খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। লোকসান গুনতে গুনতে অনেক খামারি ইতোমধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। এতে পাবনায় অন্তত ১০ হাজারের বেশি পোলট্রি খামারি এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
খামারি ও পাইকারদের অভিযোগ, ডিমের দাম বাড়ার বড় অংশের সুবিধা যাচ্ছে খুচরা বিক্রেতাদের পকেটে। খামারিরা যেখানে একটি ডিমে গড়ে ২০ পয়সার মতো লাভ করছেন, সেখানে খুচরা পর্যায়ে কোনো কোনো ব্যবসায়ী একটি ডিমে দুই টাকারও বেশি লাভ করছেন। ফলে উৎপাদনকারী লোকসানে থাকলেও ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে।
পাবনার বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে, আকারভেদে খুচরা পর্যায়ে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। অথচ খামারি ও পাইকার পর্যায়ে প্রতি হালি ডিমের দাম ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। অর্থাৎ খামারি পর্যায়ের দামের চেয়ে খুচরা বাজারে প্রতি হালিতে ৭ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
খামারি, আড়তদার ও পাইকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুরগির খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। দীর্ঘদিন লোকসান গুনে অনেকে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে ডিমের উৎপাদন কমলেও বাজারে চাহিদা কমেনি; বরং ক্রমেই বাড়ছে।
আড়তদাররা বলছেন, পাইকারদের চাহিদা অনুযায়ী ডিম সরবরাহ করতেই তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরবরাহ সংকটের কারণে পাইকারি পর্যায়ে দাম কিছুটা বাড়লেও সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, খুচরা বিক্রেতারা হালিতে ৭ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত এবং ডজনে ২১ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি লাভ করছেন।
আটঘরিয়া উপজেলার পোলট্রি খামারি লুৎফর রহমান বলেন, বর্তমানে পরিবহনসহ কোম্পানিভেদে ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা মুরগির খাদ্যের দাম ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা। একটি মুরগি প্রতিদিন গড়ে ১১০ থেকে ১৩০ গ্রাম খাদ্য খায়। সে হিসাবে ১০০টি মুরগির জন্য প্রতিদিন প্রায় ১১ থেকে ১৩ কেজি খাদ্য প্রয়োজন হয়, যার দাম প্রায় ৬৫০ টাকা। এর সঙ্গে ওষুধ, শ্রমিক ও বিদ্যুৎ খরচ রয়েছে।
তিনি বলেন, ১০০টি মুরগির মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি ডিম পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ডিম বিক্রি করে যে আয় হয়, তার বড় অংশই খাদ্য ও অন্যান্য খরচে চলে যায়। ফলে খামারিদের হাতে লাভ থাকে না বললেই চলে। যারা শ্রমিক না রেখে নিজেরাই খামারে কাজ করেন, মূলত তারাই কোনোভাবে টিকে আছেন।
লুৎফর রহমান আরও বলেন, আটঘরিয়ায় একসময় ছোট-বড় প্রায় ২০০টি মুরগির খামার ছিল। লোকসানের কারণে এর মধ্যে প্রায় ৩০টি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অন্তত ২০টি খামার বন্ধ হওয়ার পথে। খাদ্য ও ভেটেরিনারি ওষুধের দাম কমানো না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
পাবনা সদর উপজেলার খামারি শরিফুল ইসলাম বলেন, একটি লেয়ার মুরগিকে ডিম দেওয়ার উপযোগী করতে খাবার, ওষুধ ও পরিচর্যাসহ কমপক্ষে ৭০০ টাকা খরচ হয়। ডিম দেওয়া শুরু করার পরও প্রতিদিন একটি মুরগির পেছনে প্রায় ৮ টাকা খাদ্য ব্যয় হয়। অথচ প্রতিটি মুরগি প্রতিদিন ডিম দেয় না। রোগে বা অন্য কোনো কারণে মুরগি মারা গেলে খামারিকে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়।
সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রাম এলাকার খামারি ও পাইকারি ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর মুরগির খাদ্য ও ওষুধের দাম অনেক বেড়েছে। খাদ্য ও ওষুধের দাম না কমিয়ে শুধু ডিমের ব্যবসায়ীদের দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদন খরচ কমানোই এখন সবচেয়ে জরুরি।
পাবনা সদর উপজেলা প্রান্তিক পোলট্রি খামারি আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা খাদ্যের দাম কমিয়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা নির্ধারণ করা এবং প্রান্তিক খামারিদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে তারা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
পাবনা জেলা প্রান্তিক পোলট্রি শিল্পের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, মুরগির বাচ্চা ও খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রান্তিক খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নিম্নমানের খাদ্য ও বাচ্চা সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে। সরকারি নজরদারি না বাড়ালে অচিরেই জেলার পোলট্রি শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
অন্যদিকে, ডিমের বাড়তি দামে দিশেহারা সাধারণ ক্রেতারাও। বেড়া উপজেলার কাশীনাথপুরের বাসিন্দা কলেজ শিক্ষক মেহেদী উদ্দিন বলেন, সংসারে ডিম একটি প্রয়োজনীয় খাদ্য। নাস্তার টেবিল থেকে শিশুদের টিফিন—সব জায়গাতেই ডিমের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু দাম বাড়ায় সীমিত আয়ের মানুষের জন্য নিয়মিত ডিম কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে সাধারণত হাঁসের ডিমের সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কম থাকে। কিন্তু এবার ব্রয়লার ও অন্যান্য ডিমের দাম বেশি থাকায় হাঁসের ডিমের বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) পাবনার সাধারণ সম্পাদক এসএ আলম বলেন, ডিমের বাজারে অসাধু আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কারসাজি থাকলে তা বন্ধে কার্যকর বাজার মনিটরিং প্রয়োজন। নিয়মিত তদারকি করা হলে ডিমের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, ডিমের বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও বাজারে নজরদারি বাড়ানোর মাধ্যমে শিগগিরই ডিমের দাম কমে আসবে বলে আশা করছে তারা।
খামারিদের দাবি, শুধু বাজারে ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; উৎপাদন খরচ কমাতে মুরগির খাদ্য ও ভেটেরিনারি ওষুধের দাম কমানো, প্রান্তিক খামারিদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া এবং ডিমের বাজারে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে একদিকে ভোক্তাদের বাড়তি দামে ডিম কিনতে হবে, অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যেতে পারে পাবনার হাজার হাজার পোলট্রি খামার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









