শিপব্রেকিং ইয়ার্ড নামটা শুনলেই কানে আসে লোহা দিয়ে লোহা কাটার বিশ্রী শব্দ আর হাতুড়ির ধুপধাপ আওয়াজ। বাংলাদেশের সমুদ্রতীরবর্তী চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূল জুড়ে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জাহাজ ভাঙার কেন্দ্র।
এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জাপান, চীন, সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসমূহের পুরাতন মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজসমূহ বাংলাদেশে রিসাইক্লিং এবং ভাঙার জন্য প্রেরণ করা হয়। দেশের অন্যতম শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোর অধিকাংশ চট্টগ্রামে অবস্থিত হলেও নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, পটুয়াখালী ও খুলনা ইত্যাদি এলাকায় সীমিত পরিসরে জাহাজভাঙার কাজ হয়ে থাকে।
বর্তমানে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ সম্পূর্ণরূপে এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল। দেশের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডসমূহে প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার শ্রমিক সরাসরি কাজ করে থাকে। এছাড়া ইয়ার্ডগুলোর সাথে জড়িত পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির সাথে প্রায় দেড় থেকে দুই লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। এই শিল্পের সাথে জড়িত অধিকাংশ মানুষ অত্যন্ত দরিদ্র ও নিরক্ষর হওয়ায় এই শিল্পের বাইরে অন্য কাজ করতে পারে না।
ফলে দেখা যায়, এই একটি শিল্পের উপরই তাদের নির্ভর করে থাকতে হয়। তাছাড়া উপকূল এলাকায় বসবাসের কারণে তাদের সন্তানসন্ততি স্কুল-কলেজে পড়াশোনার পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না। এর ফলে দেখা যায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা এই শিল্পের সাথেই নিজেদের জীবন বেঁধে ফেলে।
দেশের এত বৃহৎ একটি অংশ এই শিল্পের উপর নির্ভর করলেও বাংলাদেশে এই শিল্পের ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সুবিধা মারাত্মক ভয়াবহ। কোনো প্রকার প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় শ্রমিকদের কাজ করানো হয় শিপব্রেকিং ইয়ার্ডসমূহে। হেলমেট, গ্লাভস ছাড়া কাজ করার সময় সামান্য ভুলে শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে বেশি লাভের আশায় শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো শ্রমিকদের এই কাজগুলোতে পাঠিয়ে দেয়। ফলে অনেক সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা এমনকি প্রাণনাশের মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস)-এর সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেটর ও জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে নানা দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন নিহত হয়েছেন।
এ সময়ে আহত হয়েছেন ২৩৯ জন। এ ছাড়াও বিলস-এর তথ্য অনুযায়ী, জাহাজভাঙা শিল্পে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় তিন শ্রমিক নিহত এবং ২৫জন আহত হয়েছেন। এ সকল দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সীতাকুণ্ডে ‘এমটি রাসি’ নামক জাহাজের ট্যাংকার কাটার সময় তীব্র বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে ৯ জন শ্রমিক নিহত হয়। জানা যায়, কোনো ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া এবং জাহাজের ট্যাংকারকে গ্যাসমুক্ত না করে শ্রমিকদের ওই জায়গায় কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল। নিহত শ্রমিকদের মধ্যে অনেকে ছিলেন পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি; দুর্ঘটনার ফলে ওই ব্যক্তিদের পরিবারে দেখা দিয়েছে মারাত্মক অভাব-অনটন।
দেশের অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই শিল্পশ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কাজ করতে হবে। সরকারি পর্যায়ে উপকূল এলাকাসমূহে বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, শ্রমিকদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দুর্ঘটনায় আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। শিপব্রেকিং ইয়ার্ডসমূহে নিয়মিত পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে শ্রমিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অপেক্ষাকৃত ভারী কাজ সম্পাদনের জন্য ক্রেন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ ব্যবহারে ইয়ার্ড মালিকদের সাথে আলোচনা করতে হবে। এ ছাড়া এ সকল অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি ও বিভিন্ন এনজিওর সাহায্যে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। এর সাথে তাদের অন্যান্য দক্ষতামূলক কাজের প্রতি আগ্রহী করে গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই শিল্পকে নিরাপদ ও লাভজনক শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব।
লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









