‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’- মধ্যযুগে কবি আব্দুল হাকিম মাতৃভাষার প্রতি বিমুখতা দেখে আক্ষেপ করে এই কবিতা লিখেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আজও আমাদের সেই একই খেদ প্রকাশ করতে হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের মাতৃভাষা বাংলা আজ নিজ দেশেই যেনো এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অবহেলার শিকার। বিশেষ করে দেশের ইংরেজি মাধ্যম (ইংলিশ মিডিয়াম) শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা ভাষার অবস্থান পর্যালোচনা করলে এই তিতা সত্যটি উন্মোচিত হয়।
ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে অষ্টম বা 'ও' লেভেল পর্যন্ত বাংলা বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত রাখা হলেও, উচ্চমাধ্যমিক সমমানের 'এ' লেভেলে বাংলা চর্চার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে উচ্চশিক্ষার ঠিক পূর্বমুহূর্তে দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষার্থী তার নিজের দেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। একজন শিক্ষার্থী যখন দীর্ঘ সময় ধরে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠে, যেখানে তার মাতৃভাষা ঐচ্ছিক বা গৌণ, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে।
আরো আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ইংরেজি ভাষাকে বিশ্বায়নের যুগে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে না দেখে, অনেকেই ইংরেজিতে কথা বলতে পারাটাকে 'স্মার্টনেস' বা শিক্ষিত হওয়ার একমাত্র মাপকাঠি মনে করছেন। অথচ তারা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারেন না। বাংলায় কথা বলাটাকে 'গেয়ো' কিংবা অবহেলার চোখে দেখার মানসিকতাও কোনো কোনো শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষাক্রম (ক্যামব্রিজ বা এডেক্সেল) অনুসরণ করা দোষের কিছু নয়। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সেই দক্ষতা অর্জনের মূল্য যদি নিজের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে দূরে সরে যাওয়া হয়, তাহলে বিষয়টি নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা গ্রহণ এবং মাতৃভাষার চর্চা- দুটিকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। একাধিক ভাষায় দক্ষতা একজন শিক্ষার্থীর সক্ষমতাকে আরো সমৃদ্ধ করে। ইংরেজি তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে যোগাযোগের সুযোগ করে দিতে পারে, আর বাংলা তাকে নিজের সমাজ, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখে। তাই ইংরেজির উৎকর্ষের পাশাপাশি মাতৃভাষার ভিত্তিও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষার সঙ্গে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, আবেগ ও আত্মপরিচয় জড়িয়ে থাকে। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও বিষয়টি আরো গভীর। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকেই বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম নতুন মাত্রা পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই চেতনা স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের পথকে আরো শক্তিশালী করেছে। তাই বাংলা ভাষাকে কেবল একটি পরীক্ষার বিষয় হিসেবে দেখলে এর গুরুত্বকে সীমিত করে ফেলা হয়। শিক্ষার্থীদের বাংলা শেখার অর্থ শুধু ব্যাকরণ বা সাহিত্য পড়া নয়; একই সঙ্গে নিজের ইতিহাস ও সমাজকে বোঝার সুযোগ তৈরি করা।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে- ‘এ’ লেভেলে বাংলা বাধ্যতামূলক করলে শিক্ষার্থীদের ওপর কি বাড়তি চাপ তৈরি হবে না? বাস্তবতা হলো, বিষয়টি কীভাবে পড়ানো হচ্ছে তার ওপরই চাপের মাত্রা অনেকাংশে নির্ভর করে। বাংলা শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষামুখী না করে ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত করে তুলতে পারলে এটি শিক্ষার্থীদের কাছে আরো আকর্ষণীয় হতে পারে। মুখস্থনির্ভর পাঠ্যক্রমের পরিবর্তে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, চলচ্চিত্র, সংবাদ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সমকালীন বাংলাদেশকে পাঠ্যক্রমের অংশ করা যেতে পারে।
‘এ’ লেভেলে বাংলা বিষয়কে বাধ্যতামূলক কিংবা অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আন্তর্জাতিক শিক্ষা বোর্ডগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি উপযুক্ত পাঠ্যক্রম তৈরি করা, যেখানে বাংলাদেশের ভাষা, ইতিহাস ও সাহিত্যের মৌলিক দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এতে আন্তর্জাতিক শিক্ষাক্রমের মান বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও সংযোগ অটুট রাখা সম্ভব হবে।
এ ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। শুধু বাংলা বিষয়টি পাঠ্যক্রমে রাখাই যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষা ব্যবহারের বাস্তব সুযোগও তৈরি করতে হবে। বাংলা বিতর্ক, রচনা, সাহিত্যচর্চা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দেয়ালিকা বা পাঠচক্রের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে ভাষাটিকে আনন্দ ও সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে বাংলা শুধু পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন চিন্তা ও সৃজনশীলতার অংশ হয়ে উঠবে। এ ছাড়া পারিবারিক ও সামাজিকভাবেও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। অভিভাবক ও শিক্ষকদের মনে রাখতে হবে- একাধিক ভাষা জানা দক্ষতার প্রতীক, কিন্তু মাতৃভাষাকে অবহেলা করা কোনো স্মার্টনেস নয়, বরং তা আত্মপরিচয়হীনতার লক্ষণ।
সন্তান ইংরেজিতে দক্ষ হবে- এটি যেমন অভিভাবকদের প্রত্যাশা হওয়া স্বাভাবিক, তেমনি সে যেন নিজের ভাষায়ও সাবলীলভাবে কথা বলতে, লিখতে ও ভাব প্রকাশ করতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
যে ভাষা আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল, সেই ভাষাকে নিজ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যথাযথ মর্যাদায় টিকিয়ে রাখা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। তাই আন্তর্জাতিক শিক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়েই ‘এ’ লেভেলে বাংলা শিক্ষাকে আরো গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বিশ্বকে জানার জন্য ইংরেজি শিখব, কিন্তু নিজেকে জানার জন্য বাংলা ভুলে যাব না-শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত এই ভারসাম্যই।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









