বাংলা কবিতায় যারা হৃদয়ের কথা সাবলীল ভাষায় উচ্চারণ করেছেন, গোবিন্দচন্দ্র দাস তাদের অন্যতম। আবেগের গভীরতা, ব্যক্তিগত বেদনা আর পূর্ববঙ্গের প্রকৃতির সহজ অথচ তীব্র উপস্থিতি তার কবিতাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র স্বর। আজ এই ‘স্বভাব কবি’র জন্মদিন।
১৮৫৫ সালের ১৬ জানুয়ারি ঢাকা জেলার ভাওয়ালের জয়দেবপুরে জন্মগ্রহণ করেন কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস। পিতা রামনাথ দাস। শৈশবের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ভাওয়ালরাজ প্রতিষ্ঠিত জয়দেবপুর মাইনর স্কুলে। পরে তিনি ভর্তি হন ঢাকা নর্মাল স্কুলে এবং এক পর্যায়ে ঢাকা মেডিক্যাল স্কুলেও অধ্যয়ন করেন। তার শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করতেন ভাওয়ালরাজ কালীনারায়ণ—যা সেই সময় একজন প্রতিভাবান কিন্তু আর্থিকভাবে অসচ্ছল তরুণের জন্য ছিল বিরল সৌভাগ্য।
তবে গোবিন্দচন্দ্রের অস্থির মানসিকতা ও আবেগপ্রবণ স্বভাবের কারণে তিনি আজীবন এক ধরনের দুঃখ ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেছেন। বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন ব্যক্তির আশ্রয়ে কাজ গ্রহণ করেছেন, আবার তা ছেড়েও দিয়েছেন। জীবনের বড় অংশজুড়ে তিনি ছিলেন গাজীপুর অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত, যা তার কবিতার ভৌগোলিক ও মানসিক পরিসরে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ভাওয়াল রাজপরিবারের আশ্রয়ে থাকাকালীন রাজপরিবারের প্রধান কর্মচারী কালীপ্রসন্ন ঘোষের সঙ্গে বিরোধের জেরে তিনি ভাওয়াল থেকে নির্বাসিত হন। এই অপমান, বিচ্ছেদ ও অন্তর্গত ক্ষোভ তার কাব্যে গভীর বেদনাবোধের জন্ম দেয়। ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও সামাজিক অবহেলার অভিজ্ঞতাই তার কবিতার প্রধান সুর হয়ে ওঠে।
কবিতায় আন্তরিকতা ও স্বতঃস্ফূর্ততার জন্য সমসাময়িক সাহিত্যসমাজে তিনি পরিচিত হন ‘স্বভাব কবি’ নামে। তাঁর কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে নারীভক্তি, পতি-পত্নীর প্রেম, ভ্রাতৃস্নেহ, সন্তানবাৎসল্য, বন্ধুপ্রীতি, গাহর্স্থ্য জীবনের সুখ-দুঃখের কাহিনি, পল্লিজীবনের আলেখ্য, জাতীয় উদ্দীপনা ও স্বদেশপ্রেম। কবিতার মধ্য দিয়েই তিনি তার প্রথমা পত্নীকে অমর করে রেখেছেন।
গোবিন্দচন্দ্র দাস অনুবাদক হিসেবেও পরিচিত। অ্যালেন হিউম রচিত ‘Aye, O Ek!’ কবিতার বাংলা অনুবাদ তাকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়। তিনি গীতার কাব্যানুবাদও করেন, যা তার সাহিত্যচর্চার বহুমাত্রিকতার পরিচয় বহন করে।
সাংবাদিকতা ও সম্পাদনাতেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘বিভা’ পত্রিকার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন এবং শেরপুর থেকে প্রকাশিত ‘চারুবার্তা’ পত্রিকার অধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার আর্থিক ও শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তার চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ করেন—যা সমকালীন সাহিত্যিক সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৯১৮ সালের ১ অক্টোবর কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি রেখে যান দশটি কাব্যগ্রন্থ এবং কিছু অপ্রকাশিত কবিতা। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
প্রসূন (১৮৭০), প্রেম ও ফুল (১২৯৪ বঙ্গাব্দ), কুঙ্কুম (১২৯৮ বঙ্গাব্দ), কস্তুরী (১৩০২ বঙ্গাব্দ), চন্দন (১৩০৩ বঙ্গাব্দ), ফুলরেণু (১৩০৩ বঙ্গাব্দ) এবং মগের মুল্লুক।
উনিশ শতকের কবিসভার সদস্যদের প্রায় সকলেই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত এবং নাগরিক কবি। তাঁরা কাব্য সাধনা করতেন কলকাতায় বসে এবং থাকতেন গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে। এদের মধ্যে সর্বাধিক স্বতঃস্ফূর্ত কবিপ্রতিভার অধিকারী ছিলেন গোবিন্দচন্দ্র দাস। জীবনের বেদনা, প্রেম ও স্বাভাবিক মানবিকতার যে খাঁটি ভাষা তিনি রেখে গেছেন, তা তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









