আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জ্বালানি খাতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে আগামী ৩০ অক্টোবর গণবিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এনসিপির সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, গত সাত মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। একই সময়ে জ্বালানি খাতেও সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। সরকারের এই ব্যর্থতার দায় সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রীকে নিতে হবে এবং তাঁদের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের পরিবর্তে সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। অন্যদিকে, জ্বালানিমন্ত্রীও খাতটির সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। আপাতত এই দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদ পুনর্গঠনের দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বে অবহেলার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ অসহায় বোধ করছে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এনসিপি মানুষের পাশে থাকবে। তার মতে, সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া জনগণের অধিকার আদায় সম্ভব নয়।
কারওয়ান বাজার থেকে গণসংযোগ কর্মসূচি শুরু করার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচাবাজার ও সবজির কেন্দ্র এই এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অভিযোগ রয়েছে। কয়েক মাস আগে ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধভাবে চাঁদাবাজদের প্রতিহত করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সারা দেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারত্ব ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এনসিপির এই নেতা।
আগামী ৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভের চারটি প্রধান কারণ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের কথা তুলে ধরেন তিনি। ওই দিন দুপুর ৩টায় ঢাকার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে কর্মসূচি পালিত হবে বলে জানান। পরে সারা দেশেও ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের কথা বলেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটছে। তিনি নেত্রকোনায় ১৫ অক্টোবর এক সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা, পরদিন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আরেক সাংবাদিককে গুলি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এসব ঘটনায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এ ছাড়া ১৯ অক্টোবর কক্সবাজারের বিভিন্ন সড়কে ৫০ থেকে ৬০টি যানবাহনে ডাকাতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। তার বক্তব্যে গত নয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা, নারী নির্যাতন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় গ্রেপ্তারের বিষয়ও উঠে আসে। এসব বিষয়ে উত্থাপিত পরিসংখ্যান ও অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রসঙ্গে কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন পণ্যের দাম তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২০০ থেকে ২১০ টাকা, টমেটো কেজিপ্রতি ১৬০ থেকে ২০০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, শুকনা মরিচ ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং ডিম ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তার দাবি, বাড়তি দামের কারণে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এলপিজি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, নির্বাচনের পর এলপিজির দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে থাকলেও বর্তমানে সরকারি হিসাবে তা ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং বেসরকারিভাবে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া সরকার তিন দফায় অকটেনের দাম বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানান।
সংবিধান সংস্কার ও আইনি পরিবর্তনের বিষয়ে এনসিপির অবস্থান তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি ভেঙে দিয়ে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। জুলাই সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত সাইবার আইনের সংশোধনী বাদ দিতে হবে এবং গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত যেসব আইনকে তারা কর্তৃত্ববাদী বলে মনে করেন, সেগুলো বাতিল করতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শহীদ ও আহতদের পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগগুলোরও বিচার দাবি করেন তিনি।
সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার বিদ্যমান ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তার মতে, শুধু সরকার বা ব্যক্তির পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রের সামগ্রিক ব্যবস্থারও পরিবর্তন প্রয়োজন।
এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম বিস্তারের পাশাপাশি নির্বাচনের পর সংগঠনে যুক্ত হওয়া নতুন সদস্যদের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের জন্য এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হবে।
দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হওয়ায় দেশের জনগণকে ধন্যবাদ জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সাধারণ মানুষ, বিরোধী দল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সহযোগিতা করেছেন। এ সম্প্রীতি বজায় রাখতে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন ও ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে অপপ্রচার চালানোর সমালোচনা করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে নাহিদ ইসলাম পুনরায় সরকারের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করা, জননিরাপত্তা জোরদার করা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









