ডারউইনে যে অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল বাংলাদেশ, এবার সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে নয় উইকেটের দুর্দান্ত জয় এনে দিয়েছে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন। দুই ম্যাচের সিরিজে এখন বাংলাদেশের সামনে একটাই লক্ষ্য—ম্যাকেতে দ্বিতীয় টেস্ট জিতে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়।
অন্যদিকে প্রথম টেস্টের পর অস্ট্রেলিয়ার সামনে সমীকরণও পরিষ্কার। হারলেই ঘরের মাঠে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে প্রথমবারের মতো দুটিতেই হারের লজ্জা পেতে হবে তাদের। ফলে স্বাগতিকদের কাছে এই ম্যাচ শুধু ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নয়, সম্মান বাঁচানোর লড়াইও।
ডারউইনে বাংলাদেশের জয়কে ক্রিকেট বিশ্বে চমক হিসেবে দেখা হলেও ম্যাচের ফল ছিল পুরোপুরি প্রাপ্য। চার দিনজুড়ে বাংলাদেশই ছিল অধিকতর নিয়ন্ত্রিত ও কার্যকর দল।
বোলারদের নিখুঁত লাইন-লেংথ, প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষুরধার মানসিকতা এবং ব্যাটারদের অসাধারণ ধৈর্য—এই তিন অস্ত্রেই অস্ট্রেলিয়াকে পরাস্ত করে বাংলাদেশ।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের পেসাররাই অস্ট্রেলিয়ার ১০টি উইকেট তুলে নেন। এরপর ব্যাট হাতে দলকে শক্ত ভিত গড়ে দেন তানজিদ হাসান, নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজরা।
তানজিদ হাসান করেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন মেহেদী হাসান মিরাজ। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্ব ও মাঠের সিদ্ধান্তও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাজে আসে।
আর বল হাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নায়ক হাসান মাহমুদ। ম্যাচে নয় উইকেট নিয়ে তিনি নির্বাচিত হন ম্যাচসেরা।
বাংলাদেশের কোচ ফিল সিমন্সও ডারউইনের জয়কে নিজের কোচিং ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা টেস্ট জয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা
ডারউইনের জয় এখন অতীত। ম্যাকেতে বাংলাদেশকে আবারও প্রায় একই মানের ক্রিকেট খেলতে হবে।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলেও ম্যাচটির গুরুত্ব অনেক। বাংলাদেশ ম্যাকেতে জয় পেলে উঠে আসবে তৃতীয় স্থানে।
তবে অস্ট্রেলিয়া ঘরের মাঠে সহজ প্রতিপক্ষ নয়। প্রথম টেস্টে ব্যর্থতার পর তারা দলে পরিবর্তনও এনেছে। জেক ওয়েদারাল্ডের পরিবর্তে ওপেনিংয়ে ফিরছেন ম্যাট রেনশ।
অস্ট্রেলিয়ার কোচ ও অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের জন্য এটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ডারউইনে দলের ব্যাটিং যেখানে বারবার ভেঙে পড়েছে, সেখানে রেনশকে নিয়ে তারা নতুন শুরু করতে চাইবে।
নজরে ট্রাভিস হেড ও হাসান মাহমুদ
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন ট্রাভিস হেড। ২০২২ সালের পর থেকে টেস্ট ক্রিকেটে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা হেড ডারউইনে অবশ্য দুই ইনিংসেই হাসান মাহমুদের বলে আউট হয়েছেন।
দুইবারই প্রায় একই ধরনের ভুল করে উইকেট হারান তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর মৌসুমের প্রথম টেস্টে কিছুটা জড়তা এর কারণ হতে পারে। তবে হেডের সাম্প্রতিক ফর্ম বলছে, ম্যাকেতে তিনি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য মরিয়া থাকবেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বড় অস্ত্র হাসান মাহমুদ।
টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ক্যালেন্ডার বছরের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও পাকিস্তানে পাঁচ উইকেটের ইনিংস শিকার করা বোলার খুবই বিরল। এই কৃতিত্ব অর্জন করা মাত্র তিনজন বোলারের একজন হাসান।
ডারউইনে তাঁর নয় উইকেট বাংলাদেশের হয়ে বিদেশের মাটিতে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ডের সমান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাঁর বোলিংয়ে শুধু গতি নয়—ব্যাটারকে কীভাবে আউট করবেন, সেই পরিকল্পনাও স্পষ্ট।
ম্যাকেতেও তাঁর কাছ থেকে আরেকটি বড় পারফরম্যান্স চাইবে বাংলাদেশ।
দুই দলের সম্ভাব্য একাদশ
অস্ট্রেলিয়া দলে ম্যাট রেনশ ওপেনিংয়ে ফিরছেন। সম্ভাব্য একাদশে রয়েছেন ট্রাভিস হেড, রেনশ, মার্নাস লাবুশেন, স্টিভেন স্মিথ, ক্যামেরন গ্রিন, অ্যালেক্স ক্যারি, বিউ ওয়েবস্টার, অধিনায়ক প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, নাথান লায়ন ও জশ হ্যাজলউড।
বাংলাদেশ দলে তানজিদ হাসান, শাদমান ইসলাম, মুমিনুল হক, অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ, হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ, তাইজুল ইসলাম/শরিফুল ইসলাম এবং এবাদত হোসেনকে দেখা যেতে পারে।
তানজিদের ঘাড়ে সামান্য অস্বস্তি এবং মুশফিকুর রহিমের আঙুলে চোট নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও তাঁদের খেলা নিয়ে এখনো বড় কোনো সংশয় নেই। শরিফুল ইসলামও ফিট বলে জানা গেছে।
ম্যাকের পিচ কেমন?
ম্যাকের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় এবারই প্রথম টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে এই মাঠের টেস্ট ইতিহাস নেই বললেই চলে।
তবে গত বছর এখানে অনুষ্ঠিত ওয়ানডেতে ব্যাটারদের জন্য দারুণ পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথমে ব্যাট করে ৪৩১ রান করেছিল।
টেস্ট ম্যাচে পিচের আচরণ কতটা বদলায়, সেটিই দেখার বিষয়। সমুদ্রের দিক থেকে আসা শক্তিশালী দক্ষিণ-পূর্ব বাতাস অবশ্য বোলারদের কিছুটা সহায়তা করতে পারে। ডারউইনের তুলনায় এখানকার আবহাওয়াও তুলনামূলক আরামদায়ক।
ইতিহাসের সামনে বাংলাদেশ
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিততেই বাংলাদেশকে তিনটি ম্যাচ অপেক্ষা করতে হয়েছে। উপমহাদেশের অন্য দলগুলোর তুলনায় সেটিও উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
ভারতকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জিততে ১২টি ম্যাচ অপেক্ষা করতে হয়েছিল, পাকিস্তানের লেগেছিল সাতটি। বাংলাদেশ পেরেছে মাত্র তৃতীয় প্রচেষ্টায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









