কখনো ১৯ বছরের এক তরুণ, চোখে ছিল স্বপ্ন আর পায়ে ছিল অসাধারণ গতি। কখনো পরাজয়ের পর মাঠে বসে অঝোরে কেঁদেছেন। আবার কখনো অধিনায়কের বাহুতে ভর করে একটি জাতিকে উপহার দিয়েছেন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল-সাফল্য। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল-অধ্যায় আসলে শুধু গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির গল্প নয়; এটি অপেক্ষা, ব্যর্থতা, প্রত্যাবর্তন, নেতৃত্ব আর স্বপ্নপূরণের দীর্ঘ এক যাত্রা।
২০০৪ সালে ঘরের মাঠে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ দিয়ে শুরু হয়েছিল এই গল্প। ১৯ বছরের রোনালদো তখন বিশ্ব ফুটবলে নিজের পরিচয় তৈরি করছেন। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেমিফাইনালে গোল করে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু গ্রিসের কাছে ফাইনালে হারের পর মাঠে তার কান্নার দৃশ্য হয়ে ওঠে টুর্নামেন্টের অন্যতম স্মরণীয় ছবি। যে শিরোপা সেদিন অধরা ছিল, ১২ বছর পর সেটিই তুলে ধরবেন তিনি।

২০০৬ বিশ্বকাপে ইরানের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেন রোনালদো। সেমিফাইনালে উঠলেও ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় পর্তুগালকে। ২০০৮ সালের ইউরোতে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়, ২০১০ বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে হার—বারবার স্বপ্নের কাছাকাছি গিয়েও থেমে যেতে হয়েছে তাকে।
২০১২ সালের ইউরোতে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল পর্তুগাল। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে স্বপ্নভঙ্গ হয়। ২০১৪ বিশ্বকাপও সুখকর ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নাটকীয় ড্রয়ের পর শেষ পর্যন্ত গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় দল। ঘানার বিপক্ষে রোনালদোর গোলও সেই ব্যর্থতা আড়াল করতে পারেনি।
অবশেষে আসে ২০১৬। হাঙ্গেরির বিপক্ষে জোড়া গোল করে পর্তুগালকে নকআউট পর্বে তোলেন রোনালদো। ওয়েলসের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তার গোল দলকে পৌঁছে দেয় ফাইনালে। কিন্তু ফ্রান্সের বিপক্ষে শিরোপার লড়াইয়ে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। চোখে জল নিয়েই সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের উৎসাহ দেন অধিনায়ক। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপসেরা হয় পর্তুগাল। রোনালদোর হাতে ওঠে বহু বছরের অপেক্ষার শিরোপা। কান্নার সেই পুরোনো ছবির জায়গা নেয় আনন্দাশ্রু।

২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে নিজের সামর্থ্যের আরেকটি প্রমাণ দেন তিনি। শেষ মুহূর্তে ফ্রি-কিক থেকে করা গোলটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে। তবে উরুগুয়ের কাছে শেষ ষোলোতে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন তখনো অধরা।
২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো নেশনস লিগ জেতে পর্তুগাল। ২০২০ সালের ইউরোতে ৩৬ বছর বয়সেও গোল করে রেকর্ড গড়েন রোনালদো। তবে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বেলজিয়ামের কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হয়। ২০২২ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে পরাজয়ও তাকে বিশ্বকাপের স্বপ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
২০২৪ সালের ইউরো ছিল তার ষষ্ঠ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। কোনো ফুটবলারের জন্য যা অনন্য এক অর্জন। ফ্রান্সের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। ১৪ গোল নিয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেই টুর্নামেন্টটি শেষ করেন রোনালদো।
২০২৫ সালের নেশনস লিগের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে গোল করে আবারও পর্তুগালকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। অধিনায়ক হিসেবে তুলে ধরেন দেশের তৃতীয় বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি।
এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপেও ইতিহাস গড়েন ৪১ বছর বয়সী রোনালদো। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গোল করে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েন। পরে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নেন।

এভাবেই দুই দশকের বেশি সময় ধরে পর্তুগালের জার্সিতে লিখেছেন এক অনন্য ইতিহাস। জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন তিনি। ২০০৪ সালের কান্না থেকে ২০১৬ সালের শিরোপা, ২০২৫ সালের আরেকটি ট্রফি থেকে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের রেকর্ড—প্রতিটি অধ্যায়েই রয়েছে একেকটি গল্প।
রোনালদোর বিদায় তাই কেবল একজন ফুটবলারের বিদায় নয়। এটি পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসের একটি স্বর্ণালি অধ্যায়ের সমাপ্তি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









