বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন বদলে দিচ্ছে এল নিনো। এর প্রভাবে কোথাও বাড়ছে দাবদাহ ও খরা, কোথাও আবার ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও ঝড়ের ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানল
এল নিনোর প্রভাবে সাধারণত শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়ার মুখে পড়ে ইন্দোনেশিয়া। চলতি বছর দেশটিতে দাবানলের ভয়াবহতা বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
দাবানলের কারণে বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। সুমাত্রা ও কালিমানতানের লাখ লাখ মানুষ বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসেছে। প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভুগেছে। আক্রান্তদের মধ্যে কাশির পাশাপাশি ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের তৎপরতা
পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে চলতি মৌসুমে ঘূর্ণিঝড়ের তৎপরতা বেড়েছে। সেখানে ২২টি নামযুক্ত ঝড় ও ১২টি হারিকেন তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে ১০টি ছিল শক্তিশালী হারিকেন। মৌসুম শেষ হতে তখনো দুই মাস বাকি ছিল।
এল নিনোর কারণে সমুদ্রের পানি উষ্ণ হওয়া এবং বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বাতাসের বাধা কমে যাওয়ায় ঝড় দ্রুত শক্তিশালী হতে পারে। অন্যদিকে, উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে বাতাসের পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড় তৈরির অনুকূল পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সেখানে স্বাভাবিকের তুলনায় ঝড়ের তৎপরতা কম রয়েছে।

ভারতে বৃষ্টির ঘাটতি, কৃষিতে উদ্বেগ
ভারতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত গড়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম হয়েছে। মধ্য ভারতে বৃষ্টিপাত প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঘাটতি ছিল প্রায় ২৬ শতাংশ। দক্ষিণাঞ্চলেও বৃষ্টিপাত ২৪ শতাংশ কম হয়েছে।
কখনো দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়া, আবার কখনো অতিবৃষ্টির কারণে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভারতের মৌসুমি বৃষ্টির ওপর এল নিনো ছাড়াও অন্যান্য আবহাওয়াগত পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে।
চীন ও জাপানে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মাইসাক ও দুজুয়ানের মতো ঝড়ের কারণে চীন ও জাপানের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধস দেখা গেছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে চলতি মৌসুমে ১০টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছে, যা ১৯৬৬ সালের পর সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, উষ্ণ সমুদ্রের কারণে আরও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে। এতে চীন ও জাপানের উপকূলীয় এলাকায় ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার এই পরিবর্তন কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তবে সব চরম আবহাওয়ার জন্য শুধু এল নিনোকেই দায়ী করা যায় না; অন্যান্য প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত কারণও এসব পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









