নদীমাতৃক বাংলার চিরচেনা ঐতিহ্য নৌকাবাইচ। একসময় বর্ষা এলেই নদী-খাল-বিলের বুকে নৌকার পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা, ঢাকঢোলের শব্দ আর দর্শকদের উল্লাসে মুখর হয়ে উঠত গ্রামবাংলা। সময়ের পরিবর্তনে বিনোদনের নানা মাধ্যম জনপ্রিয় হলেও নৌকাবাইচের প্রতি মানুষের আকর্ষণ এখনো অমলিন। সেই ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে পটুয়াখালীর দশমিনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ-২০২৬।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে উপজেলার কবিরাজবাড়ি-সংলগ্ন পুকুরে কবিরাজবাড়ি মন্দির কমিটির উদ্যোগে এ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতির চর্চা ও সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারের একটি উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব শাহ আলম শানু, উপজেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক আবুল বশারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, নৌকাবাইচ বাংলার আবহমান ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করে তোলে। আধুনিকতার প্রভাবে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক আয়োজন করলে সমাজে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার হয়। এসব আয়োজনে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়লে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য সংরক্ষণে আয়োজক সংগঠন ও স্থানীয় জনগণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলার ইতিহাস, জনজীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক বহু পুরোনো। নদী-নালা, খাল-বিলের বিস্তৃত জনপদে নৌকা একসময় শুধু যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের মাধ্যম ছিল না; মানুষের আনন্দ-উৎসব ও সামাজিক মিলনমেলারও অনুষঙ্গ ছিল। সেই জীবনধারা থেকেই নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার জনপ্রিয় লোকজ বিনোদনে পরিণত হয়।
নৌকাবাইচে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি থাকে দলগত প্রচেষ্টা, ছন্দ ও সম্মিলিত আনন্দের আবহ। বৈঠার তালে তালে নৌকা এগিয়ে নেওয়ার দৃশ্য দর্শকদের মধ্যে তৈরি করে উচ্ছ্বাস। বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় রীতি ও আয়োজনের ধরন ভিন্ন হলেও নৌকাবাইচের মূল আকর্ষণ—প্রতিযোগিতা, আনন্দ এবং মানুষের সম্মিলন।
কালের বিবর্তনে নগরায়ণ, নদী-খালের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং আধুনিক বিনোদনের প্রসারের কারণে অনেক এলাকায় এ ঐতিহ্য আগের মতো নিয়মিত দেখা যায় না। তবু গ্রামীণ জনপদে নৌকাবাইচের আয়োজন মানুষের মধ্যে পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে এবং নতুন প্রজন্মকে লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
দশমিনায় কবিরাজবাড়ি মন্দির কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত নৌকাবাইচও সেই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার একটি প্রয়াস। এ ধরনের আয়োজন স্থানীয় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতি বাড়ানোর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চাকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে। এর মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম নৌকাবাইচের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানবে এবং বাংলার শেকড়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









