ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা বেশ আলোড়ন তুলেছে রাজনীতির মাঠে। এ নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। কিন্তু একদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় খোদ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রমও নিষিদ্ধের মতো প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার ফিরতে পারার মতো পরিস্থিতি আদৌ কতটা রয়েছে, তা নিয়েও আছে নানা ধরনের আলোচনা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক জনরোষের মুখে দেশ ছাড়তে হয়েছিল আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ নেতাকে। আড়াই বছর পর এসে সেই পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হওয়ার কোনো নজির নেই।
ফলে শেখ হাসিনা জনগণের সিদ্ধান্তের বিষয়ে যে কথা বলছেন, তার জোরালো ভিত্তি নেই বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতাই দলটির রাজনীতিতে ফেরার একমাত্র উপায় বলে মত তাদের। ফলে শেখ হাসিনা যে সময়সীমা দিয়েছেন, তা আসতে এখনো আরো পাঁচ মাস বাকি থাকলেও দৃশ্যত এটা যেন ‘খোলা দরজায় ঝোলানো হাজার তালা’র শামিল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এই দাবি কেবলই 'রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি‘। মূলত ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়ার পর দুমড়ে-মুচড়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়া নেতাকর্মীরা যেন একেবারে ম্রিয়মান হয়ে না পড়েন, তাদের ’চাঙ্গা’রাখতেই তাঁর এ হাঁকডাক। তাঁর ‘দেশে ফেরা’ কিংবা ‘ফিরে আত্মসমর্পণ’করা হতে পারে বলা হলেও আইনি এবং বাস্তব পরিস্থিতি এর দুটোর কোনোটিই এ ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য নয়। এটি বাস্তব কোনো পরিকল্পনা, নাকি আওয়ামী লীগকে আবার রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার কৌশল, তা নিয়ে দলটির ভেতরেই সংশয় রয়েছে। নেতাদের অনেকে বলছেন, শেখ হাসিনা নিজে ফিরবেন কি না, তার পাশাপাশি বড় প্রশ্ন হলো—বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই ঝুঁকি নিতে শেষ পর্যন্ত কতজন নেতা-কর্মী প্রস্তুত আছেন?
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর মতে, ডিসেম্বরের সময়সীমাটি প্রতীকীও হতে পারে। এটি নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করা, দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে চাপ তৈরি করা এবং রাজনৈতিক পরিসর ফিরে পাওয়ার কৌশলের অংশ হতে পারে। তবে আজ ৫ আগস্ট বুধবার নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেটস ক্লাবে (এফসিসি) বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়ালি অংশ নেওয়ার একটি কর্মসূচি রয়েছে। আজকের সাক্ষাৎকারে আরো স্পষ্ট হতে পারে শেখ হাসিনার পরবর্তী অবস্থান।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা বিদেশে থাকা দলীয় নেতা-কর্মীদের দেশে ফেরার জন্য প্রায়ই বলতেন। এর আগেও গত বছর ২৮ জুন ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা চলতি বছরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বলেছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো নেতা তার এই আহ্বানে সাড়া দেননি। বরং অনেকে নিরাপত্তা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় ভারত ছেড়ে অন্য দেশে চলে গেছেন। এছাড়া বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর দলটির রাজনৈতিক তৎপরতা এখন মূলত অনলাইনে সীমিত। এর বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঝটিকা মিছিল হয়েছে, যেগুলোকে দলটির সাংগঠনিক শক্তির চেয়ে অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, তাঁর সরকারের সাবেক মন্ত্রী, দলীয় সংসদ সদস্য এবং তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী আত্মগোপনে চলে যান। পরে ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাঁদের অনেকের অবস্থানের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ পায়। দেশে থাকা অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রচার হওয়ার পর আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ লোকই বলেছেন, এই ঘোষণার পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক কৌশল বা প্রস্তুতির তথ্য তাঁদের জানা নেই। ডিসেম্বর আসতে এখনো প্রায় পাঁচ মাস বাকি। এর মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ক্ষমতাসীন বিএনপির অবস্থান, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মনোভাব এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের ভূমিকা— এসবের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
এছাড়া এর জন্য দলের প্রস্তুতি কী এবং এর কৌশল কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। আবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দল প্রকাশ্যে কতটা সংগঠিত হতে পারবে এবং সরকারের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, তা নিয়েও সংশয় আছে। কারণ, যাদের সম্পদ ও আর্থিক নিরাপত্তা রয়েছে, তাদের বড় অংশ শেখ হাসিনার আহ্বানে দেশে ফিরে কারাবরণ করবেন বলে মনে করেন না অনেক নেতা। তাঁরা জানান, তাঁরা বরং রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ার অপেক্ষায় থাকবেন। ফলে শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা নেতা-কর্মীদের আবেগতাড়িত করতে পারলেও সেটি কতটা সম্মিলিত প্রত্যাবর্তনে রূপ নেবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
যদিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা এদিনকে বলেন, শেখ হাসিনা প্রায় ৪৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। দলের বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থাও অজানা নয়।
এর পরও তিনি যেহেতু ফেরার কথা বলেছেন, হয়তো তার নিজের সেই ধরনের প্রস্তুতি আছে। যদিও শেখ হাসিনার পলায়নের পর গত দুই বছরে আওয়ামী লীগের তেমন কোনো কার্যক্রম নজরে পড়েনি। সর্বশেষ গত ২৩ জুন দলটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষেও দেশের দু-এক জায়গায় ঝটিকা মিছিল ছাড়া অন্য কোথাও তেমন কোনো কর্মকাণ্ডই চালাতে পারেনি। মাঠেও কোনো নেতা-কর্মীদের দেখা মেলেনি। ফলে নতুন বাস্তবতায় বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর কোণঠাসা হয়ে পড়া আওয়ামী লীগ কতটা শক্তি দেখাতে পারবে তা নিয়েই প্রশ্ন সবার।
তবে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিলেও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা এখনো দুঃখ প্রকাশ করেননি। বরং তিনি ও তাঁর দলের নেতারা আন্দোলনকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরছেন এবং গণ-অভ্যুত্থানের নেতাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করে চলেছেন। ফলে দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের বার্তা দিলেও এর সঙ্গে আত্মসমালোচনা বা অতীতের দায় স্বীকারের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে দেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি চলছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা-সংক্রান্ত বক্তব্যে ইতিমধ্যে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার জুলাই আন্দোলনের শীর্ষ নেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গত শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ডিসেম্বরে কেউ একজন দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। দেশ তো অলরেডি (ইতিমধ্যে) ১৬ বছরের ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। এখন আমরাও চাই দেশে ফিরবেন, ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য। কারণ দেশে ফিরে তাঁকে সোজা ফাঁসির মঞ্চে যেতে হবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অভ্যুত্থানের বার্ষিকী ও তারেক রহমানের চীন সফর— সব মিলিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা তাঁর দেশে ফেরার বক্তব্য সামনে এনেছেন। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা-সংক্রান্ত বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের কোনো কোনো কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে। যদিও শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান, ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের চিঠি দেওয়া— সব মিলিয়ে বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে বেশ প্রভাব ফেলেছে। কারণ, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের বিষয়টি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে অন্যতম বাধা। যদিও ভারতের ভাবনায় বিষয়টি বাদ রেখে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা রয়েছে।
সব মিলিয়ে দৃশ্যমান রাজনৈতিক সমঝোতা, সাংগঠনিক প্রস্তুতি কিংবা নেতাদের সম্মিলিতভাবে দেশে ফেরার উদ্যোগ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফলে শেখ হাসিনার ঘোষণা আপাতত বাস্তব কর্মপরিকল্পনার চেয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের সক্রিয় করা এবং রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে।
কারণ, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত পলাতক শেখ হাসিনার বিষয়টি তার কোনো ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা রাজনৈতিক ঘোষণার বিষয় নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যমান চুক্তি ও আদালতের সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে দুই দেশের সরকারি অবস্থানই বিষয়টির চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে আইন, কূটনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের সমন্বিত বাস্তবতার ওপর।
সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নির্দিষ্ট করে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান।
তিনি বলেন, ‘আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। যদি মৃত্যুই আসে, আমি চাই আমার নিজের মাটিতেই মৃত্যু হোক— যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছিল।’শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ফেরত পাঠাতে ভারতকে চিঠি দিচ্ছে, কিন্তু তিনি নিজেই দেশে ফিরবেন।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাঁদের অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি। একদিন তোমরাও সবাই এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।’
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা চাইলেই দেশে ফিরতে পারবেন— এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ তার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি নির্ভর করবে বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি, ভারতের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের আদালতের আদেশের ওপর। কারণ, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আদালতের রায় কার্যকরের প্রশ্নে রাজনৈতিক বিতর্ক যেমন তীব্র হয়েছে, তেমনি বিষয়টি এখন আইনি ও কূটনৈতিক আলোচনারও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
দুই বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশত্যাগের পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক মামলায় তিনি দণ্ডিত পলাতক আসামি হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তার আইনি অবস্থান আরো জটিল হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে তাঁকে ফেরাতে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন জানিয়েছে। এর আগে কূটনৈতিক চ্যানেলে নোট ভার্বাল পাঠানো হলেও ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর আবেদনটি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও তিনিসহ দলের একাধিক নেতার বিচার শুরু হয়। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।
এসব হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এ ছাড়া তাঁদের বিরুদ্ধে আরো কয়েকটি মামলার বিচার চলমান। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর শেখ হাসিনাসহ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ভারত সরকারকে চিঠি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ভারত বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানালেও প্রত্যর্পণের বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি প্রকাশ্যে আসেনি।
বর্তমান বিএনপি সরকারও শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের কথা বলেছে। শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান, ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের চিঠি দেওয়া— সব মিলিয়ে বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে বেশ প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যর্পণের প্রশ্নে আইনের পাশাপাশি কূটনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক কৌশলগত স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন দিকও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে এমন সংবেদনশীল বিষয়ে সময়সীমা নির্ধারণ করাও কঠিন।
তবে বাংলাদেশে আসার সঙ্গে সঙ্গেই শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তাঁর মতে, নিজে নিজে এসে শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণ করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই। কারণ তিনি ভারত সরকারের অধীনে রয়েছেন। অতএব চাইলেই আসতে পারবেন না।
সম্প্রতি আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমে বলেন, শেখ হাসিনা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তাই যেকোনোভাবে বাংলাদেশে ফিরলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রথমেই তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হবে। এরপর জেলহাজতে গিয়ে তিনি যদি কোনো আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে আপিল করেন, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু শেখ হাসিনা আদৌ আসবেন কি না বা আপিল করবেন কি না- সেসবের তেমন নিশ্চয়তা নেই।
আইনের চোখে শেখ হাসিনা পলাতক থাকলেও ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি ভারত সরকারের অধীনে জীবনযাপন করছেন। সেখানে পলাতক নন। যদিও আইনের দৃষ্টিতে পলাতক। এ কারণে তাকে ফেরত বা হস্তান্তরের জন্য এরই মধ্যে ভারত সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। তাই ভারত হস্তান্তর না করলে তার কোনোভাবেই আসা সম্ভব নয়।
তবে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হলেও শেখ হাসিনার আপিলের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মত দিয়ে ফৌজদারি আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, শেখ হাসিনা আপিল ফাইল করার জন্য উদ্যোগ নিতে পারবেন। কিন্তু গৃহীত হবে কি না, তা শুনানির সময় বলা যাবে।
দৈনিক এদিনকে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনটি হলো একটি বিশেষ আইন। এই আইনানুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করতে হয়। অন্যথায় আর কোনো সুযোগ থাকে না। সাধারণ ফৌজদারি মামলায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট বিভাগের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১-এ ধারায় (কোয়াশমেন্ট) আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল হওয়ায় এ ধরনের আবেদনের সুযোগ নেই। সুতরাং বিশেষ আইনে আপিলে বিলম্ব বা তামাদি কখনো মার্জনা করা যায় না। ফলে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আপিল গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সেটি আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে।
তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, যদি তিনি (শেখ হাসিনা) দেশে ফেরেন, তাহলে আদালতের দেওয়া রায় গ্রহণের মানসিকতা নিয়েই ফিরবেন। তবে দেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনার অন্যান্য বক্তব্যকে ‘পলিটিক্যাল রেটোরিক’মনে করেন এই রাজনৈতিক নেতা।
সামান্তা শারমিন বলেন, আসলে এ ধরনের ব্যক্তিরা এক ধরনের ফাঁকাবুলিতে অভ্যস্ত থাকেন। তাদের এসব কথা বা বার্তার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এজন্য শেখ হাসিনাও তেমন কিছু চেষ্টা করছেন। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার ব্যবস্থা করা উচিত। এছাড়া শেখ হাসিনার বিচার অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হতে হবে, যেন ভবিষ্যতে কোনো আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগ না থাকে।
সবমিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নতুন করে আলোচনার খোরাক জোগালেও আইনি প্রশ্ন- ৩০ দিনের আপিলসীমা পার হয়ে যাওয়ার পরও আদালতের দ্বার কতটা খোলা রয়েছে। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার কিংবা কারাগারে যাওয়ার বিষয়ে আইনজ্ঞরা একমত হলেও সাবেক এই সরকারপ্রধানের পরবর্তী বিচারিক পথ পুরোপুরি আপিল বিভাগের ব্যাখ্যা আর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাই শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা কেবলই হাঁকডাক, নাকি আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে সক্রিয় রাখার কৌশল, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছুদিন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









