বাংলাদেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে হওয়া গণআন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন এনেছে। তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন সরকার বদলেছে, নীতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইতিহাসে আলোচিত এমনই ছাত্র আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।
ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন (যুক্তরাষ্ট্র)
১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৭০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। তারা ক্লাস বর্জন, অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করেন। এই আন্দোলন দেশে যুদ্ধবিরোধী জনমত শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রাখে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম থেকে সেনা প্রত্যাহার করেসোয়েটো বিদ্রোহ (দক্ষিণ আফ্রিকা)
১৯৭৬ সালের জুনে দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটো এলাকায় শিক্ষার্থীরা বর্ণবৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। পুলিশের কঠোর দমন-পীড়নে বহু শিক্ষার্থী নিহত হন। এই ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে। পরে বর্ণবাদী শাসনের অবসানে এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
ভেলভেট বিপ্লব (চেকোস্লোভাকিয়া)
১৯৮৯ সালে প্রাগে শিক্ষার্থীরা একটি ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের স্মরণসভা থেকে কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। পুলিশের দমন-পীড়ন আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে। শেষ পর্যন্ত কমিউনিস্ট নেতৃত্ব পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং দেশটি শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক শাসনে ফিরে আসে।
আমব্রেলা আন্দোলন (হংকং)
২০১৯ সালে হংকংয়ের শিক্ষার্থীরা একটি প্রত্যর্পণ বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, এই আইন পাস হলে হংকং থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের মূল ভূখণ্ড চীনে পাঠানো সহজ হবে। দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে সরকার বিলটি স্থগিত করতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলন চীনের বাড়তে থাকা প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
জুঁই বিপ্লব ও আরব বসন্ত (তিউনিসিয়া)
২০১০-১১ সালে মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিউনিসিয়ায় গণবিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীরাও এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। আন্দোলনের মুখে প্রেসিডেন্ট জিন এল আবিদিন বেন আলি ক্ষমতা ছাড়েন। এরপরই মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলন।
ইউরোময়দান আন্দোলন (ইউক্রেন)
২০১৩ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি না করে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকলে শিক্ষার্থীরা কিয়েভের স্বাধীনতা চত্বরে আন্দোলন শুরু করেন। তারা ব্যারিকেড ও অস্থায়ী শিবির গড়ে তোলেন। পরে এই আন্দোলনের ফলে ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতা হারান এবং ইউক্রেনের রাজনৈতিক পথ নতুন দিকে মোড় নেয়।
সানফ্লাওয়ার আন্দোলন (তাইওয়ান)
২০১৪ সালে চীনের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা করে তাইওয়ানের শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজ আন্দোলনে নামেন। তারা পার্লামেন্ট ভবন দখল করে বিক্ষোভ চালান। শেষ পর্যন্ত সরকার চুক্তিটি স্থগিত করে। এই আন্দোলন ২০১৬ সালের নির্বাচনের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে।
আরাগালায়া আন্দোলন (শ্রীলঙ্কা)
২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকট ও সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কায় শুরু হওয়া গণআন্দোলনে শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আন্দোলনের মুখে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে চলে যান। পরে রনিল বিক্রমাসিংহের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। যদিও আন্দোলনের সব রাজনৈতিক দাবি পূরণ হয়নি, তবুও এটি শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









