শারদীয় দুর্গাপূজায় শুভ শক্তির জয়গানে সুন্দর, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশের আকুতি জানিয়ে উৎসবের সপ্তমীতে দুর্গতিনাশিনী দেবীর কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। পাশাপাশি সব ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় থাকার জন্য এবং সব ধরনের হানাহানি বন্ধে বিশ্বশান্তির প্রার্থনাও করছেন ভক্তরা। নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনের মধ্য দিয়ে মহাসপ্তমীর পূজায় অংশ নিয়েছেন ভক্তরা।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গতকাল শনিবার সকালে মহাসপ্তমীর রীতি অনুযায়ী কলাবউয়ের মহাস্নান ও স্থাপনের পর কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা চলে। সকাল ৭টা ৩৯ মিনিটে নবপত্রিকা স্থাপন সম্পন্ন হয়। ভোর হতে না হতেই ঢাকে পড়ে কাঠি, ধূপের সুবাসিত ধোঁয়ায় চারদিক আচ্ছন্ন। শরতের মিষ্টি রোদে মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয়ে যায় মহাসপ্তমীর পূজা।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেখা যায়, ভোর থেকেই ভক্তরা মন্দিরে আসছেন, সেই ভিড়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের সংখ্যাই ছিল বেশি। ঢাক-ঢোল, কাঁসর ঘণ্টা আর শঙ্খনাদে মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দিরের আঙিনা। ঢাকেশ্বরীর পুরোহিত এবং ভক্তদের একটি দল লালপাড় সাদা শাড়িতে মোড়ানো ‘নবপত্রিকা‘ বা ‘কলাবউ’ মাথায় নিয়ে মন্দিরের পাশের জলাশয়ের দিকে রওনা হন। সেখানে মন্ত্রোচ্চারণ ও ভক্তদের জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে কলাবউয়ের মহাস্নান সম্পন্ন করা হয়। স্নান শেষে মহাসমারোহে কলাবউকে ফিরিয়ে এনে প্রতিমার ডানপাশে স্থাপনের পরই মূল বিহিত পূজা ও কল্পারম্ভ শুরু হয়।
মহাসপ্তমীর আনুষ্ঠানিকতা ও প্রার্থনা নিয়ে মহানগর পূজো কমিটির উপদেষ্টা মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, ‘আজ (শনিবার) দুর্গাপূজার দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ মহাসপ্তমী। ভক্তরা মণ্ডপে এসে অঞ্জলি প্রদান করছেন এবং মায়ের চরণে নিজেদের আকুতি জানাচ্ছেন। এ উৎসবের মধ্য দিয়ে একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা ছড়িয়ে দিতে চাই, যেন সবাই মিলে শান্তিতে বসবাস করতে পারি।’
তিনি বলেন, ‘শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। মাতৃশক্তিকে আবাহনের মাধ্যমে সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ও দেশের সমৃদ্ধি অর্জনের প্রার্থনাই এর মূল লক্ষ্য। এটি কেবল একটি সম্প্রদায়ের উৎসব নয়, বরং এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ সব ধর্মের মানুষের সমাগম ঘটে। শারদীয় দুর্গোৎসবের বিশেষত্ব ও সম্প্রীতি নিয়ে এই মিলনমেলা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মাঙ্গলিক ভাবধারাকে আরো সুদৃঢ় করে।’
‘নবপত্রিকা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নয়টি গাছের পাতা। কদলী বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (দাড়িম), অশোক, মান ও ধান এই নয়টি উদ্ভিদকে পাতাসহ একটি কলাগাছের সঙ্গে একত্র করা হয়। পরে একজোড়া বেলসহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দেওয়া হয়। তারপর তাতে সিঁদুর দিয়ে সপরিবার দেবীপ্রতিমার ডান দিকে দাঁড় করিয়ে পূজা হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকার নাম ‘কলাবউ’।
সপ্তমীর পূজার আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে মনীন্দ্র কুমার নাথ জানিয়েছেন, সপ্তমীর তিথিতে দেবীর মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়, অর্থাৎ দেবীর দিব্য শক্তিকে আবাহন করা হয়। এরপর নিয়ম মেনে ষোড়শোপচার (ষোলটি উপচার বা উপকরণ দিয়ে) পূজা করা হয়। সকালে শুদ্ধবস্ত্রে মণ্ডপে উপস্থিত হয়ে হাতে চন্দন, ফুল ও বেলপাতা নিয়ে সপ্তমী তিথির বিশেষ পুষ্পাঞ্জলি দিতে হয়। পুষ্পাঞ্জলির পর নিয়ম করে প্রণাম মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয় বলেও জানিয়েছেন মনীন্দ্র কুমার নাথ।
সপ্তমী পূজায় দেবীকে অন্নভোগ, লুচি, মিষ্টি, ফল ও নানা পদের ভোগ নিবেদন করা হয়। এবার মহাসপ্তমী তিথি গতকাল শনি ও রবিবার দুইদিন বিস্তৃত। পুরান ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা পুণ্যার্থী সুস্মিতা দে অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ‘সকাল সকাল এসে কলাবউ স্নান দেখেছি। ঢাকের শব্দ আর ধূপের গন্ধে সত্যি মন ভরে যায়। মায়ের কাছে একটাই প্রার্থনা, সবাই যেন শান্তিতে ও সুস্থ থাকে।’
মোহাম্মদপুর থেকে আসা শুভাশীস রায় বলেন, ‘প্রতিবছর সপ্তমীর সকালে ঢাকেশ্বরীতে আসা আমাদের রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে এলে দুর্গাপূজার আসল আবহটা অনুধাবন করা যায়।’ মণ্ডপ চত্বর ও এর আশপাশের সড়ক সেজেছে বর্ণিল আলো ও নানা রঙের তোরণে। মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণে বসেছে রকমারি মেলা। শাঁখা, সিঁদুর, পূজার সামগ্রী থেকে শুরু করে শিশুদের খেলনা ও খাজা-গজা, বাতাসার পশরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। তবে সকালেই দোকানগুলোতে তেমন ভিড় চোখে পড়েনি।
দর্শনার্থী ও ভক্তদের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য মন্দিরজুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে। ঢাকা মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘সকালে পূজা শুরু হয়ে পৌনে দশটার দিকে অঞ্জলি প্রদান করা হয়। অঞ্জলি শেষে আমরা বিশ্ববাসী এবং বাংলাদেশের সব ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় এবং সব ধরনের হানাহানি বন্ধে বিশ্বশান্তির প্রার্থনা করেছি।’
তিন পর্ব মিলে দুর্গোৎসব
হিন্দু আচার অনুযায়ী, মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা- এই তিন পর্ব মিলে দুর্গোৎসব। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ দিনে মহাষ্ঠী থেকে শুরু হয়ে দশম দিনে বিজয়া দশমী পর্যন্ত দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা থাকে ৫ দিন। তবে এবার মহাসপ্তমী তিথি শনি ও রবিবার দুদিন বিস্তৃত হওয়ার এবারের এই আনন্দোৎসব চলবে ছয়দিন। সোমবা অষ্টমী, মঙ্গলবার নবমী এবং বুধবার দশমীর সন্ধ্যায় বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসবের। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, দশভূজা দেবী দুর্গা অসুর বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতি শরতে কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে মর্ত্যলোকে আসেন। সন্তানদের নিয়ে পক্ষকাল পিতার গৃহে কাটিয়ে আবার ফিরে যান দেবালয়ে।
আশ্বিন শুক্লপক্ষের এই ১৫টি দিন দেবীপক্ষ, গত শনিবার মহালয়ার দিনে মণ্ডপে-মণ্ডপে চণ্ডীপাঠ, মঙ্গলঘট স্থাপন, ঢাক-কাঁসা ও শঙ্খ বাজিয়ে দেবীকে আহ্বান জানিয়ে যে পক্ষের শুরু হয়েছিল। এর মাঝে ষষ্ঠ দিন, অর্থাৎ ষষ্ঠীতে বোধন। আর দশম দিন, অর্থাৎ দশমীতে বিসর্জন। দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। আর দেবীপক্ষের সমাপ্তি হবে পঞ্চদশ দিনে কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপূজার মধ্য দিয়ে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, তিন অবতারের আবির্ভাবকাল ত্রেতাযুগে ভগবান রাম তার স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করতে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেন। ব্রহ্মার নির্দেশ অনুযায়ী দুর্গার সাহায্যে রাবণ বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি। দেবীর সেই আগমণের সময়ই দুর্গোৎসব। রাম শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করেছিলেন বলে এ পূজা শারদীয় দুর্গাপূজা নামেও পরিচিত। আর মর্ত্যলোকে আসতে দেবীর সেই ঘুম ভাঙানোকে বলা হয় অকাল বোধন।
পুরোহিতরা বলছেন, দুর্গা দেবীর প্রকৃত আগমনের সময় চৈত্র মাস। অর্থাৎ বসন্ত কাল। চৈত্র মাসে যে দুর্গাপূজা হয় তাকে বলা হয় বাসন্তী পূজা। তবে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে শারদীয় পূজাই সবচেয়ে বড় উৎসব।
শাস্ত্র বলছে, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং গমন নৌকায়। শাস্ত্রমতে ঘোড়ায় আগমন ছত্রভঙ্গ বা অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের আশঙ্কার ইঙ্গিত দেয়। আর নৌকায় গমনকে শুভ বলে মনে করা হয়, যা সাধারণত বন্যা বা শস্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে, এ বছর সারাদেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা হবে। গত বছর পূজা হয়েছিল ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপে। অর্থাৎ এবার ৪৯৬টি পূজা বেড়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা মহানগরীতে এবার ২৫৮টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন থাকছে, যা গতবার ছিল ২৬১টি। রাস্তার মধ্যে পূজা আয়োজনের অনুমতি না মেলায় ঢাকা মহানগরীতে এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা ৩টি কমে গেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









