গুপ্ত। শব্দটি ছোট্ট হলেও এতেই হঠাৎ তেঁতে উঠেছে গোটা দেশ। বিশেষ করে ক্যাম্পাসগুলো। এই শব্দ প্রয়োগের জেরে সরকার ও বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠন রীতিমতো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মেতে উঠেছে। গত দুইদিনে এ নিয়ে কমপক্ষে ১০টিরও বেশি ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি এমন, যে কোনো মূল্যে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া উভয় দল।
জানা গেছে, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় মরিয়া হয়ে উঠেছে সরকার ও বিরোধী দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল ও শিবির। দেশের রাজনীতিতে হঠাৎ করেই ‘গুপ্ত’ শব্দটি নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। অনেকই প্রশ্ন তুলছেন, আসলে কারা এই ‘গুপ্ত’?
তবে আলোচনা যাই হোক, বাস্তবতা হচ্ছে এটি এখন আর শুধু একটি শব্দ নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। যে শব্দকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। রাজপথ থেকে সে বিতর্ক এখন সংসদেও আলোচিত হচ্ছে। যেখানে শাসক ও বিরোধী দল একে অপরকে দায়ী করছে।
মূলত, গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের দেয়ালে এ ‘গুপ্ত’ শব্দটি লেখাকে কেন্দ্র করে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও বিরোধী দলীয় ছাত্র সংগঠন শিবিরের নেতা-কর্মীরা সংঘর্ষে জড়ায়। দিনভর চলা সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন মারাত্মক আহত হয়। এর মধ্যে শিবিরের পাহাড়তলী ওয়ার্ড ইউনিটের সভাপতি আশরাফুল আলমের একটি পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শিবিরের অভিযোগ, ছাত্রদলের কর্মীদের কিরিচের আঘাতে এ অবস্থা হয়েছে। এ খবরে দেশের অপর শিক্ষাঙ্গনের ক্যাম্পাসগুলোতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে হামলাার প্রতিবাদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের নেতা-কর্মীরা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ মিছিল বের করে। একই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসুর নেতাদের উদ্যোগে মিছিল-মিটিংয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস।
এমনকি শিবিরের নেতা-কর্মীরা বুধবার বিকেলে রাজধানীতে বিরাট মিছিল বের করে। এ ঘটনার রেশ ধরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ সমাবেশ করে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে আলোচনা হয় সংসদেও। সংসদের চলতি অধিবেশনে মঙ্গলবার সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ওয়াদুদ ভুইয়া বক্তব্য দেন। এরপরই একই ইস্যুতে বিরোধী দলীয় নেতা তার বক্তব্যে প্রতিবাদ জানান। এ নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কথা বলেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন।
এদিকে 'রাজনীতিতে শিবিরকে গুপ্ত' অভিযুক্ত করে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সারাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে দেওয়াল লিখন কর্মসূচি ঘোষণা করে ছাত্রদল। তারই ধারাবাহিকতায় বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে এ কর্মসূচি চালু করে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। কিন্তু তাদের গুপ্ত বানানে ভুল ও অসুন্দর মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশকিছু ছবি প্রকাশ করে শিবিরের নেতা-কর্মীরা, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশ ট্রল হয়। বিশেষ করে তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের দেওয়ালে গুপ্ত চিকা মারার পরপরই সেগুলোর সামনে ছবি তুলে শিবির নিজেদের সক্রিয় উপস্থিতির জানান দেয়। সেই সাথে ছাত্রদলের দেওয়াল লিখনের নানান অসঙ্গতি তুলে ধরে বিভিন্ন ব্যাঙ্গাত্মক ছবি এবং ভিডিও প্রকাশ করে। এ ছাড়া বিএনপির এবং ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের গুপ্ত নিয়ে ক্যাম্পেইনের পরপরই বিরোধী দলের লোকজনও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নের আত্মগোপনের নানা ভিডিও দিয়ে মিমিক্রি বানিয়ে প্রচার করতে দেখা গেছে। এসব ছবি, ভিডিও এবং স্যাটায়ারমূলক আলোচনা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এখন সবার মুখে মুখে।
এদিকে শিবিরের রাজনীতিকে গুপ্ত উল্লেখ করে তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের দাবিতে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেয়াল লেখন কর্মসূচি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সরকার ও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মাঝে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের সিটি কলেজের পর গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাল্টাপাল্টি মিছিল ও শোডাউন দিয়েছে ছাত্রদল এবং শিবিরের নেতা-কর্মীরা। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার পাবনার ঈশ্বরদী কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ এবং যশোর কলেজে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা আরো বড়সড় আকার ধারণ করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের গুপ্ত ক্যাম্পেইনকে নিজেদের কৌশল বলেই মনে করছেন শিবিরের নেতা-কর্মীরা। তাদের ভাষ্য হচ্ছে, যে দলের লোক হওয়ার সন্দেহে বিশ্বজিৎ নামে 'হিন্দু' যুবককে দিনেদুপুরে সন্ত্রাসী আওয়ামী লীগাররা কুপিয়ে হত্যা করে, শিবির হওয়ার সন্দেহে আবরারের মতো দেশপ্রেমিক সাধারণ যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, সে দলের কর্মী সমর্থক যদি টিকে থাকার জন্য নিজেকে গোপন করার কৌশল অবলম্বন করে, তাহলে এখানে মন্দ কী?
কিন্তু শিবিরের এ কৌশলকে দেশের মূলধারার রাজনীতিকে কলুষিত করে বলে মনে করছেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। তাদের দাবি, মূলত গুপ্ত রাজনীতি বলতে বোঝানো হয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলবে, কিন্তু সেটা চলবে অন্য পরিচয়ে।
এ ব্যাপারে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দলের তেমন কোনো অবস্থানই ছিল না। অন্য কোনো দল করলে হল থেকে বিতাড়িত হতে হতো। ছাত্রদলকে তো ক্যাম্পাসে ঢুকতেই দেওয়া হতো না। কিন্তু ২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেখা গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবিরের নেতা-কর্মীরা তো ছিলই, এমনকি তাদের রীতিমতো কমিটি পর্যন্ত ছিল।
এখন প্রশ্ন হলো- কীভাবে থেকেছে এরা? এদের অনেকেই ছাত্রলীগের সঙ্গে মিশে ছিল। ছাত্রলীগের কর্মী ছিল, কেউ নেতা পর্যন্ত ছিল। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অনেক বছর ধরে একটা অভিযোগ ছিল, তারা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালাতো। সেসব অপকর্মে কি এই ছদ্মবেশী শিবিরের লোকেরা অংশ নিত না? অবশ্যই নিত। গুপ্ত শিবিরের ছাত্রদলের ওপর তাঁদের আক্রমণের মাত্রা ছিল সীমাহীন।
নাসির বলেন, এই যে অন্য পরিচয়ে থেকে গোপনে নিজের রাজনীতিটা করে যাওয়া, এটাকেই বলা হচ্ছে গুপ্ত রাজনীতি। গুপ্ত রাজনীতির অসাধারণ একটা উদাহরণ তৈরি করেছে ছাত্রশিবির। তিনি আরো বলেন, "আমি গুপ্ত শিবিরকে চ্যালেঞ্জ করছি- ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে তাদের শিবিরের যতগুলো কমিটি ছিল, সেগুলোতে আসলে কারা কারা ছিল তা প্রকাশ করুক। নামগুলো প্রকাশ পেলে বোঝা যাবে তারা কোন কোন সংগঠনের পরিচয়ে গুপ্তভাবে ছিল। বলাবাহুল্য, ছাত্রশিবির তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকাটি এখন পর্যন্ত প্রকাশ করেনি। আগে না হয় একটা প্রতিকূল পরিবেশ ছিল, তাই তারা গুপ্ত থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। এখন তো আর সেই অবস্থা নেই। তাহলে এখনো কেন তাদের পুরনো নেতৃত্বের নামগুলো প্রকাশে দ্বিধা করছে তারা?
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই এ গুপ্ত শব্দের প্রবর্তন করেন বলে অভিযোগ শিবিরের। সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের মনোভাব হচ্ছে, তারা কৌশলে রাজনীতি করতে চান, যা তাদের মেধা ও বুদ্ধির বহি:প্রকাংশ মাত্র। সেজন্য রাজনীতিতে এমন শব্দের কোনো যথার্থতা নেই।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ও ছাত্রশিবির নেতা সাদিক কায়েম বলেছেন, দেওয়ালে যে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে, সেই শব্দটি প্রধানমন্ত্রী চয়ন করেছেন, যা তার পদের সঙ্গে যায় না। তিনি বলেন, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে আর কোনো ট্যাগিং বা গণরুম সংস্কৃতির রাজনীতি ফিরে আসুক, আমরা তা চাই না।
সাদিক কায়েম গত বুধবার চট্টগ্রাম নগরের পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিবিরকর্মীদের দেখতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন।
সাদিক কায়েম অভিযোগ করেন, ফ্যাসিবাদের আমলে আমরা যেমন দেখেছি, ছাত্রলীগ ও পুলিশ এক হয়ে বিরোধীদের ওপর হামলা করত। গতকালও দেখা গেছে, ছাত্রদলের বহিরাগত ক্যাডাররা ধারালো অস্ত্র হাতে পুলিশের সামনে শিবিরের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা করছে। অথচ পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
দেওয়ালে ‘গুপ্ত’ শব্দটি লেখাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই শব্দ আমরা ধারণ বা বর্জন কোনোটাই করি না। কে কাকে ‘গুপ্ত’ বলল, এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করে শিবিরের সাদিক কায়েম বলেন, হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা যদি দায়মুক্তি পায়, তবে সারাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে এভাবেই হামলা চালানোর সাহস পাবে।
এ সময় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, আপনারা কি সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন কি না, তা খোলাখুলি জানান। তাহলে আমরাও আপনাদের সেভাবে ডিল করব।
সূত্র জানায়, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে ভিন্ন কিছুর প্রত্যাশা থাকলেও গতকালের চট্টগ্রাম গভর্নমেন্ট সিটি কলেজের নিন্দনীয় ঘটনা সেই প্রত্যাশায় ধস নামিয়েছে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আরো অস্থিতিশীলতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
যে ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবির সমর্থিত প্যানেল একচেটিয়া জয় পেয়েছিল, সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার লক্ষ্যে বহুবিধ পরিকল্পনা আছে বলেও জানা যাচ্ছে। দলীয় শিক্ষকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নসহ নানা ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ ও আ.লীগপন্থীদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রদল বা শিবিরের পক্ষ থেকে এ গুপ্ত শব্দ নিয়ে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও সংঘর্ষ হলেও সাধারণ মানুষ এসবে কান দিতে নারাজ। তারা দেশের চলমান সমস্যায় মনোযোগ দিতে সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান।
ছাত্রদল ও শিবিরের গুপ্ত যুদ্ধ নিয়ে আকছার উদ্দিন নামে একজন তার ফেসবুকের পোস্টে বলেন, দেশে অনেক ধরনের সমস্যা আছে। যেমন- তেল সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ সংকট, হামের টিকা সংকট। অথচ দেশে রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিরা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের গুপ্ত নিয়ে মারামারি করছে। শালার এক আজব দেশে আছি আমরা সবাই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









