মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

হিজাব নিয়ে বৈষম্যবিরোধী  লড়াইয়ে জার্মানির ব্যুসরা

প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২৬, ১০:৩৪ এএম

আপডেট: ১৯ মে ২০২৬, ১০:৩৪ এএম

হিজাব নিয়ে বৈষম্যবিরোধী  লড়াইয়ে জার্মানির ব্যুসরা

হিজাব পরে ‘মিস জার্মানি’সুন্দরি প্রতিযোগিতার মঞ্চে উঠেছিলেন ব্যুসরা সায়েদ। তা মোটেই ভালো লাগেনি কট্টর ডানপন্থি দল এএফডির। সংসদে এই ইস্যুতে ঝড় তুলেছিলেন এএফডির এক নেত্রী। বাজারে নতুন ধরনের হিজাব ছেড়ে তার জবাব দিয়েছেন ব্যুসরা। সেই ‘এএফডি হিজাব’ এখন পৌঁছে যাচ্ছে জার্মানির অনেক ঘরে। ব্যুসরা সায়েদ মিস জার্মানি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন গত মার্চে। জার্মানিতে সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা আর শুধু শারীরিক সৌন্দর্যের জয়ধ্বনি নয়। প্রতিযোগিতার মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে নারীর ক্ষমতায়ন। সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনের সফল নারীরা মূলত নিজেদের ব্যক্তিত্ব এবং অর্জনের স্বীকৃতির জন্যই এখন এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

২৭ বছর বয়সি ব্যুসরা সায়েদ একজন নারী উদ্যোক্তা। নিজে হিজাব পরেন, হিজাব বিক্রিও করেন। মিস জার্মানি প্রতিযোগিতার মঞ্চে সেদিন উঠেছিলেন নিজের ডিজাইন করা হিজাব পরে। জার্মানির সংবাদমাধ্যম তুলে ধরে সেই মুহূর্ত। ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় সেই ঘটনা। কয়েক দিন পরে জার্মানির পার্লামেন্টেও ঝড় তোলে বিষয়টি। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কট্টর ডানপন্থি দল ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি' (এএফডি)-র সদস্য বিয়াট্রিক্স ফন স্টর্খ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মিস জার্মানি প্রতিযোগিতার ফাইনালে হিজাব! ওই নারী কেবল হিজাব পরেই ক্ষান্ত হননি; তিনি তো পুরোদস্তুর হিজাব-অ্যাক্টিভিস্ট। হিজাবের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি।’ নিজের বক্তব্যে ফন স্টর্খ আরো বলেন, “মিস জার্মানি প্রতিযোগিতার ফাইনালে এমন এক ইসলামি অ্যাক্টিভিস্টের অংশগ্রহণকে যদি অগ্রগতি হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমরা এক  অ্যবসার্ডিস্টানে (উদ্ভট রাজ্য) বসবাস করছি এবং সে অত্যন্ত বিপজ্জনক এক ‘অ্যাবসার্ডিস্টান’৷”

জার্মানির সংসদে বিয়াট্রিক্স ফন স্টর্খের ওই বক্তব্যের কয়েক সপ্তাহ পর ডয়চে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্যুসরা সায়েদ সেই দিনটির কথা স্মরণ করে বলেন, ‘আসলে আমি একটুও অবাক হইনি। বরং কিছুটা খুশিই হয়েছিলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম, যে কারণে আমি মিস জার্মানি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম— আমার সেই মিশন সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার জন্য বুন্ডেসটাগে আমার নাম প্রচার হওয়ার চেয়ে ভালো কিছু তো হতে পারে না।’

মিস জার্মানি প্রতিযোগিতার আগে নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে ব্যুসরা বলেছিলেন, ‘মিস জার্মানির মঞ্চের মাধ্যমে আমি এমন এক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সহায়তা করতে চাই  যেখানে বৈচিত্র্য দৃশ্যমান হবে এবং যেখানে প্রতিটি নারীই অনুভব করবেন যে সেখানে তারও নিজস্ব একটা স্থান আছে - এমনকি হিজাব পরা অবস্থাতেও।’
বিয়াট্রিক্স ফন স্টর্খের বক্তব্যের জবাব এক রিল ভিডিওতে খুব মজা করে দিয়েছিলেন ব্যুসরা। ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে প্রকাশ করা সেই রিলে বলেছিলেন, এই প্রথম ‘এএফডির সদস্য এক বন্ধু’ বুন্ডেসটাগে তার এবং তার ব্র্যান্ডের হয়ে প্রচার চালিয়েছেন। দর্শকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলেন, ‘দয়া করে তার (বিয়াট্রিক্স ফন স্টর্খ) প্রতি সবাই সদয় হোন।’সংসদে দেয়া ফন স্টর্খের বক্তৃতার একটি অংশ যোগ করে ভিডিওতে ব্যুসরা আরো বলেছিলেন, ‘ওটা ছিল তার প্রথম যৌথ কাজ, তাই তিনি ডিসকাউন্ট কোড উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন। এএফডি-ওয়ানজিরো —এই কোডটি ব্যবহার করলে আপনারা আমাদের সব ধরনের হিজাবের ওপর ১০% ছাড় পাবেন’

সেই রিল ভিডিও ইতিমধ্যে ৬০ লাখেরও বেশিবার দেখা হয়েছে। ডিডাব্লিউকে (ডয়েচে ভেলে) ব্যুসরা জানান, ‘শুধু মন্তব্য করে নয়, আমাদের দোকানে এসে কেনাকাটা করেও অনেকে সংহতি প্রকাশ করেছেন।’ তিনি আরো জানান, ‘অনেক অমুসলিম নারী, এমনকি পুরুষও হিজাবের অর্ডার দিয়েছেন। কয়েকজন খ্রিস্টান নারী যাজকের কাছ থেকেও সুন্দর মন্তব্য পেয়েছি। তারা লিখেছেন, কেবল সংহতি প্রকাশের উদ্দেশ্যে তারাও হিজাবের অর্ডার দিচ্ছেন। বিষয়টি আমাদের জন্য সত্যিই অভাবনীয় এবং অত্যন্ত আবেগঘন।’

ব্যুসরা সায়েদের অ্যাকাউন্টে অনুসারীর সংখ্যা ইতোমধ্যে এক লাখ ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। ডয়চে ভেলেকে তিনি জানান, ‘অনেক চমৎকার ও নতুন নতুন মানুষ আমার কমিউনিটিতে যুক্ত হয়েছেন৷ এ নিয়ে আমি খুব গর্বিত। আর আমাদের ‘এএফডি ব্লু' হিজাব তো প্রায় সবই বিক্রি হয়ে গেছে।’ ব্যুসরা মনে করেন, ‘বৈচিত্র্যময় কোনো সমাজে মানুষ একে অপরের পাশে যত বেশি দাঁড়াবে এবং সমতার মাত্রা যত উঁচু হবে, নব-অর্জিত সমতা অটুট রাখতে মানুষ তত বেশি লড়াই করবে।’

ব্যুসরা সায়েদের ভিডিওর মন্তব্যের ঘরে এএফডির সমর্থকরাও উঁকি দেন, বিরূপ মন্তব্য করেন। ব্যুসরার কাছে এসব নতুন কিছু নয়। বললেন, ‘শুরু থেকেই বিদ্বেষমূলক মন্তব্য পাচ্ছি। বিভিন্ন সময় বৈষম্যের শিকারও হয়েছি। সেই সময় আমার কমবয়সি সত্ত্বা জানতো না কীভাবে এসব মোকাবিলা করতে হয়।’ আরো বলেন, ‘এক সময় বিস্ময়ে ও আতঙ্কে পুরোপুরি জমে গিয়েছিলাম। আমার তখন চটপটে কোনো জবাব ছিল না। ভীষণ ভয় পেতাম৷ তবে এটা স্পষ্ট বুঝতাম যে, এসব মোকাবিলার একটা উপায় খুঁজে বের করতেই হবে, কারণ, দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এই বিদ্বেষ রাতারাতি থেমে যাবে না।’ এখন ভালোবাসা দিয়েই ঘৃণার জবাব দেয়ার চেষ্টা করেন ব্যুসরা, তবে কেউ সহিংসতার হুমকি দিলে অনতিবিলম্বে তা পুলিশকে জানান।

বুন্দেসটাগে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিনিধি রাশা নাসেরের আমন্ত্রণে সম্প্রতি জার্মান সংসদ ভবনে গিয়েছিলেন ব্যুসরা সায়েদ। সেখানকার দৃশ্য এবং অভিজ্ঞতা নিয়েও রিল ভিডিও বানিয়েছেন। গত কয়েক সপ্তাহে আসলে জীবন অনেক বদলে গেছে। উগ্রতার বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এখন আর একা নন ব্যুসরা, অনেকেই আছেন তার পাশে। ব্যুসরা বলছিলেন, ‘কত মানুষ যে সোচ্চার হয়েছেন, একে অন্যের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন! তা দেখে আমি তো বটেই, আরো অনেকেই আশার আলো খুঁজে পেয়েছেন।’ তার মতে, ‘আমরা সাধারণত নেতিবাচক কণ্ঠস্বরগুলোই শুনতে পাই, কারণ সাধারণত সেগুলোই বেশি উচ্চকিত হয়।’তবে ব্যুসরা মনে করেন, ‘এমন সংহতি আমাদের আরো বেশি প্রয়োজন৷ সবাইকে দৃশ্যমান হতে হবে এবং ডানপন্থি শক্তির বিরুদ্ধে এক হয়ে লড়তে হবে।’

সূত্র: ডয়চে ভেলে

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.