চিকিৎসাধীন এক নবজাতকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজন ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, মারধর এবং পাল্টা হেনস্তার অভিযোগে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতাল। ভুল চিকিৎসার অভিযোগে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে মৃত শিশুর মামাসহ দুইজনকে বেধড়ক মারধর করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে হাসপাতাল পরিচালক, কলেজ প্রশাসন ও পুলিশের দীর্ঘ মধ্যস্থতায় ঘটনার ৭ ঘণ্টা পর অবরুদ্ধ স্বজনরা মুচলেকা ও নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে অবরুদ্ধ দশা থেকে রেহাই পান।
গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু করে গভীর রাত ১টা পর্যন্ত শেবাচিম হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ড ও জরুরি বিভাগ প্রাঙ্গণে এই নজিরবিহীন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করে।
হাসপাতাল ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখারের বাসিন্দা উজ্জ্বল দে’র মাত্র ৭ দিন বয়সী কন্যাসন্তান গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে শেবাচিম হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়।
শিশুর বাবা উজ্জ্বল দে অভিযোগ করেন, সন্ধ্যার পর সন্তানের শ্বাসকষ্ট বাড়লে তারা কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কক্ষে যান। চিকিৎসকরা এসে শিশুকে মৃত ঘোষণা করলে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং চিকিৎসায় চরম অবহেলার অভিযোগ তোলেন। এ নিয়ে ওয়ার্ডে থাকা সাদা ইউনিফর্ম পরিহিত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বজনদের তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাকবিতণ্ডার কিছুক্ষণের মধ্যে মেডিকেল কলেজের একদল শিক্ষার্থী এসে মৃত শিশুর মামা জয়দেবকে মারধর শুরু করেন। এই ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে মামুন নামের অন্য এক যুবকও শিক্ষার্থীদের মারধরের শিকার হন। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় ওই দুজনকে হাসপাতালের নিচতলার জরুরি বিভাগের একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়।
মারধরের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা পাল্টা হেনস্তার দাবি করেছেন। শিক্ষার্থী শান্ত তালুকদার বলেন, আমাদের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের সকালে ও বিকেলে ওয়ার্ড ডিউটি এবং এর ওপর আইটেম (পরীক্ষা) থাকে। আইটেম দিয়ে বের হওয়ার সময় ভুল চিকিৎসার মনগড়া অভিযোগ তুলে মৃত শিশুর বাবা আমাদের পথরোধ করেন। এ সময় উত্তেজিত স্বজনরা নারী শিক্ষার্থীদের গায়ে থাকা অ্যাপ্রন ও ব্যাগ ধরে টানাহেঁচড়া করেন এবং ডিউটিরত নার্সদেরও হেনস্তা করেন।
অনুরূপ দাবি করে অপর শিক্ষার্থী মুনয়াত মুন বলেন, নবজাতক ওয়ার্ডের পাশে আমাদের ক্লাসরুম থেকে বের হওয়ার সময় এক ব্যক্তি আমাদের কারও হাত, কারও ওড়না, আবার কারও ব্যাগ ধরে টান দেন এবং অশোভন আচরণ শুরু করেন। আমরা আত্মরক্ষার্থে সেবিকাদের রুমে আশ্রয় নিই। পরে আমাদের সহপাঠীরা এসে তাকে নিবৃত করার চেষ্টা করলে তিনি তাদের মোবাইলও ভাঙচুর করেন। এই ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন’ বাস্তবায়নের দাবি তোলেন শিক্ষার্থীরা।
জরুরি বিভাগের রুমে দুই স্বজনকে আটকে রেখে শিক্ষার্থীরা যখন বিক্ষোভ করছিলেন, তখন অন্যপাশে দীর্ঘ ৭ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ওয়ার্ডের মেঝেতে সন্তানের লাশ কোলে নিয়ে বিচারের জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন মা পূজা রানী দাস।
অশ্রুসিক্ত চোখে মা পূজা রানী বলেন, সন্তানের মৃত্যুর পর আমার ভাই হয়তো আবেগের মাথায় মুখে কিছু বলেছে, কিন্তু কারও গায়ে হাত দেয়নি। তারপরও তাকে মারতে মারতে নিচে নিয়ে যাওয়া হলো। আমার ভাই কোনো ভুল করে থাকলে আমি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছি, আমাদের মাফ করে দিন। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত এখানে মৃত সন্তানকে নিয়ে বসে আছি, আমাদের বাড়ি যেতে দিন।
শিক্ষার্থীরা দুইজনকে আটকে রেখেছেন, এমন খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক এবং কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তখন শিক্ষার্থীরা স্বজনদের শাস্তি দাবি করে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অবস্থান নেন। দীর্ঘ আলোচনার পর অবরুদ্ধ স্বজনরা মুচলেকা দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং লাশ নিয়ে স্বজনরা হাসপাতাল ত্যাগ করেন।
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার অলক কান্তি শর্মা জানিয়েছেন, কথা কাটাকাটির সূত্র ধরে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ যাদের কাছ থেকে পাবো, তার সূত্র ধরেই তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা করা হবে।
শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ. কে. এম. মশিউল মুনীর বলেন, উভয় পক্ষের সাথে বসে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে। আমরা চাই এখানে যারা পড়ালেখা করছে তারা যেন নিরাপদ পরিবেশে ইউনিফর্ম পরে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতে পারে, সেইসাথে রোগীরাও যেন সঠিক চিকিৎসা পায়। হাসপাতালে নানাবিধ সংকট রয়েছে, তবে সবাইকে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









