বইয়ের পাতায় জ্ঞান, কল্পনা আর স্বপ্নের সন্ধান। সেই বইপড়ার অভ্যাসকে আরও উৎসাহিত করতে বরিশালে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্কুলভিত্তিক বইপড়া কর্মসূচির বর্ণাঢ্য পুরস্কার বিতরণ উৎসব। দিনভর আয়োজনে বইপ্রেমী শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর ছিল বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমি। কারও হাতে গল্পের বই, কারও হাতে জীবনীগ্রন্থ, আবার কেউবা পুরস্কার হাতে স্মৃতিবন্দি করেছেন আনন্দের মুহূর্ত।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) গ্রামীণফোনের সহযোগিতায় আয়োজিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্কুল পর্যায়ের বইপড়া কর্মসূচির পুরস্কার বিতরণ উৎসব-২০২৬ বইপ্রেমী শিক্ষার্থীদের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চারটি পর্বে আয়োজিত এই উৎসবে বরিশাল মহানগরের ৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট ২ হাজার ৭৭৬ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত করা হয়।
আয়োজকরা জানান, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ‘শুভেচ্ছা’, ‘অভিনন্দন’ ও ‘সেরা পাঠক’ এই তিন বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৭ জন শিক্ষার্থী ‘শুভেচ্ছা’, ৬৯০ জন ‘অভিনন্দন’ এবং ৪৯ জন ‘সেরা পাঠক’ হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিরা শিক্ষার্থীদের বইপড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে বই-ই পারে একজন মানুষকে সৃজনশীল, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ, জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ডা. আবদুন নূর তুষার, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক উপপরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসাইন, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, বরিশাল পিটিআইয়ের সুপারিনটেনডেন্ট শিরীন শবনম, বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবা হোসেন, গ্রামীণফোনের রিজিওনাল হেড মো. শাহিনুর রহমানসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী এম এ মুহিত বলেন, বড় স্বপ্ন পূরণ করতে হলে ধৈর্য, অধ্যবসায় ও জ্ঞানের প্রয়োজন। বই সেই জ্ঞানের সবচেয়ে বড় উৎস। আজ যারা পুরস্কার পেয়েছ, তারা শুধু ভালো পাঠক নও—তোমরাই আগামী দিনের আত্মবিশ্বাসী ও আলোকিত নাগরিক।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক সচিব খোন্দকার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বই শুধু তথ্য দেয় না, মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়। আমরা চাই নতুন প্রজন্ম পরীক্ষার ফলের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, রুচিবোধ ও সৃজনশীলতায়ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক। বইপড়া সেই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, গল্পের বই পড়তে তার ভীষণ ভালো লাগে। পুরস্কার পাওয়ার পর ভবিষ্যতে আরও বেশি বই পড়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছে সে। একইভাবে ছাবেরা খাতুন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলে, জীবনের প্রথম বইপড়া পুরস্কার হাতে নেওয়ার মুহূর্তটি তার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এবারের আয়োজনের একটি নতুন সংযোজন ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য ‘অনলাইন সেফটি ফান্ডামেন্টালস’ সচেতনতামূলক কোর্স। আয়োজকদের ভাষ্য, এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিশু-কিশোর এবং তাদের অভিভাবকদের নিরাপদ, সচেতন ও দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে মৌলিক ধারণা দেওয়া হবে।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বইপড়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে কাজ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী এই কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার সুযোগ পেয়ে থাকে।
দিনব্যাপী উৎসবজুড়ে ছিল বই হাতে ছবি তোলা, সহপাঠীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি, প্রিয় লেখক ও বই নিয়ে আলোচনা এবং পুরস্কার গ্রহণের উচ্ছ্বাস। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করে তুলবে এবং জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও আলোকিত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









