চারদিকে সবুজ পাহাড়। মাঝখানে নীল জলরাশি। পাহাড়ের বুক চিরে চলে গেছে কাপ্তাই হ্রদ। কোথাও নৌকার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, কোথাও ঝরনার কলকল ধ্বনি। প্রকৃতি যেন যত্ন করে সাজিয়েছে রাঙামাটিকে।
এই সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। কাপ্তাই হ্রদ, ঝুলন্ত সেতু, সুবলং ঝর্ণাসহ অসংখ্য পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে গড়ে উঠেছে ব্যবসা-বাণিজ্য। হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, নৌযান ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থানও নির্ভর করছে পর্যটনের ওপর।
সম্ভাবনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি পর্যটন অবকাঠামো। অপরিকল্পিত নগরায়ন, যানজট, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট ও পর্যটকবান্ধব ঘাটের অভাব—সব মিলিয়ে নানা ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটকেরা। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কাপ্তাই হ্রদ ঘিরে।
রাঙামাটির পর্যটনের প্রাণ কাপ্তাই হ্রদ। নীল জলরাশি, পাহাড় আর ছোট-বড় দ্বীপের মতো ভূপ্রকৃতিই এ হ্রদের প্রধান আকর্ষণ। অথচ সেই হ্রদেই বাড়ছে দূষণের চাপ। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেটসহ নানা ধরনের বর্জ্য হ্রদের পানিতে পড়ছে। শহরের বিভিন্ন ড্রেন ও নালা দিয়েও বর্জ্য হ্রদে গিয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি হ্রদের তীর দখল করে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও আছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কাপ্তাই হ্রদ দূষণ ও দখলমুক্ত রাখা না গেলে রাঙামাটির পর্যটন আকর্ষণই একসময় বড় ধরনের সংকটে পড়বে। কারণ এখানকার পর্যটনের বড় অংশই এই হ্রদকে ঘিরে।
সিএইচটি ট্যুরিজম অ্যান্ড কালচার রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, কাপ্তাই হ্রদকে ঘিরে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে হ্রদকে দূষণ ও অবৈধ দখল থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি পরিবহনব্যবস্থা ও নগর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রাঙামাটির পর্যটনের অন্যতম প্রতীক ঝুলন্ত সেতু। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের কাছে এটি পরিচিত একটি আকর্ষণ। কিন্তু সেতুটিকে ঘিরেও রয়েছে নানা সমস্যা। বর্ষায় কাপ্তাই হ্রদের পানি বেড়ে গেলে সেতুর নিচের অংশে পানি উঠে যায়। হ্রদে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়াকেও এ সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে সেতুতে পর্যটকদের চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। দূর-দূরান্ত থেকে রাঙামাটিতে এসে প্রধান আকর্ষণগুলোর একটি বন্ধ পেলে হতাশ হন পর্যটকেরা। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তাই সামনে আসছে বারবার।
শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, রাঙামাটি শহরের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে নানা ঘাটতি। শহরে প্রবেশের পরই পর্যটকের চোখে পড়ে কোথাও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, কোথাও সড়কের পাশে অপরিকল্পিত দোকানপাট। যানজট ও যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে ছুটির দিন ও পর্যটন মৌসুমে ভোগান্তি আরও বাড়ে।

পৌরসভার ডাম্পিং জোনের ময়লা ও দুর্গন্ধ নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। ভাঙাচোরা সড়ক, অপর্যাপ্ত পার্কিং এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে পর্যটন শহরের সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হচ্ছে। পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট ও নির্ধারিত পার্কিং জোনেরও ঘাটতি রয়েছে। কাপ্তাই হ্রদে নৌভ্রমণে আসা পর্যটকদের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ নৌ-অবতরণ ঘাটের সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়।
পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের মতে, এসব মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকদের অবস্থানকাল বাড়বে। তাতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও আরও গতিশীল হবে। কারণ পর্যটনকে ঘিরে রাঙামাটিতে তৈরি হয়েছে বড় একটি স্থানীয় অর্থনীতি। আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, নৌযান, দোকানপাট থেকে শুরু করে নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল।
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রভাষক ফাহিম হোসেন বলেন, রাঙামাটির পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পরিকল্পিত উন্নয়ন জরুরি। শহরের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র ও প্রাকৃতিক ঝরনাগুলোকে পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মতে, পর্যটন অবকাঠামোর পাশাপাশি তাঁদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের সুযোগও বাড়াতে হবে। ব্যাংকিং সুবিধা সহজ হলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন বিনিয়োগ তৈরি হতে পারে। দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি পর্যটনের সুফলও স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পার্বত্য ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতাকেও পর্যটন বিকাশের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মতে, এসব সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলে পর্যটন খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার বলেন, পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় রাঙামাটি শহর ও বিভিন্ন উপজেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে আরও আধুনিক ও পর্যটকবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তার মতে, রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিশ্ববাসীর নজর কাড়ার সক্ষমতা রাখে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। পর্যটন উন্নয়নে শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ করলেই হবে না। কাপ্তাই হ্রদের পরিবেশ রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নৌপথের নিরাপত্তা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, পার্কিং ব্যবস্থা, পাবলিক টয়লেট, পর্যটকবান্ধব ঘাট এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিয়মিত সংস্কার—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
প্রকৃতিই রাঙামাটির সবচেয়ে বড় সম্পদ। পাহাড়, হ্রদ, ঝরনা আর সবুজের এই সৌন্দর্য একবার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই পর্যটক বাড়ানোর পাশাপাশি যে সম্পদ পর্যটকদের টেনে আনে, সেটি রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে রাঙামাটির পর্যটন নতুন মাত্রা পেতে পারে। তখন কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি শুধু পর্যটকদের চোখ জুড়াবে না, হয়ে উঠতে পারে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেরও বড় ভিত্তি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









