পাহাড়, টিলা, চা-বাগান, রাবার বাগান, হাওর, পাহাড়ি ছড়া—কী নেই হবিগঞ্জের বাহুবলে! প্রকৃতির এসব সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বধ্যভূমি, মন্দির ও বৈচিত্র্যময় জনপদ। সব মিলিয়ে পর্যটনের জন্য সম্ভাবনাময় এক উপজেলা বাহুবল। অথচ এত সম্পদ থাকার পরও পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো, নিরাপত্তা, প্রচার ও ব্যবস্থাপনার অভাবে পর্যটন মানচিত্রে এখনো সেভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি উপজেলাটি। প্রকৃতি তার সৌন্দর্য উজাড় করে দিলেও সেই সৌন্দর্যকে পর্যটন শিল্পে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে নানা দর্শনীয় স্থান। ভাদেশ্বর ইউনিয়নের কামাইছড়া থেকে মুছাই এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়ি টিলা, বনভূমি, চা-বাগান ও রাবার বাগানের সবুজ দৃশ্য সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে প্রকৃতিপ্রেমীদের। বর্ষায় পাহাড়ি ছড়া ও ঘুঙ্গিয়াজুরি হাওরের জলরাশি এ অঞ্চলের সৌন্দর্যে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। শীত মৌসুমেও সবুজ পাহাড়, চা-বাগান আর নির্মল পরিবেশ ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য।
বাহুবলের উল্লেখযোগ্য পর্যটন আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে পুটিজুরীর দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট, রুপাইছড়া রাবার বাগান, রশিদপুর গ্যাস ফিল্ডসংলগ্ন প্রাকৃতিক এলাকা, আলিয়া খাসিয়াপুঞ্জি, বিভিন্ন চা-বাগান এবং কামাইছড়া ও মুছাই এলাকার পাহাড়ি পরিবেশ। এ ছাড়া রয়েছে শ্রী শ্রী হরিবল ঠাকুরের মন্দির, শ্রী শ্রী শচী অঙ্গন মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা।
পুটিজুরী এলাকায় বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট। অন্যদিকে রুপাইছড়া রাবার বাগানের সবুজ প্রকৃতি এবং রশিদপুর, বৃন্দাবন, ফয়জাবাদ, কেদারপুর ও আমতলী চা-বাগানের সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো। মিরপুর-শ্রীমঙ্গল সড়কের মুছাই এলাকা থেকে ভেতরে অবস্থিত আলিয়া খাসিয়াপুঞ্জিতে গেলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও পাহাড়ি জনজীবন সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব এলাকায় পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রকৃতির পাশাপাশি ইতিহাসের টান
বাহুবলের পর্যটন সম্ভাবনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ফয়জাবাদ বধ্যভূমি। উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নে রশিদপুর চা-বাগান ও গ্যাস ফিল্ডসংলগ্ন ফয়জাবাদ হিল এলাকায় অবস্থিত এই বধ্যভূমি মহান মুক্তিযুদ্ধের এক বেদনাবিধুর স্মারক।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে ধরে এনে নির্যাতনের পর ফয়জাবাদ হিল এলাকায় হত্যা করত। স্বাধীনতার পর সেখানে অসংখ্য মানুষের কঙ্কাল পাওয়ার তথ্যও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।
স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ এই স্মৃতিস্থানের যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বধ্যভূমির স্মৃতিচিহ্ন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, তথ্যসমৃদ্ধ ফলক এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধারও ঘাটতি রয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের এই ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ফয়জাবাদ বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও সংস্কারের পাশাপাশি ইতিহাসসমৃদ্ধ তথ্যফলক, স্মৃতিচিহ্ন এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এই স্মৃতিস্থানকে ঘিরে বাহুবলে হেরিটেজ ট্যুরিজমের বিকাশের সুযোগ রয়েছে।
পরিকল্পনার অভাব, অবকাঠামোতেও ঘাটতি
এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাহুবলের পর্যটন এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। অনেক স্থানে দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড নেই। নেই নির্ধারিত পর্যটন জোন, বিশ্রামাগার, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। অনেক দর্শনীয় স্থানে যাতায়াতের পথ পর্যটকবান্ধব নয়। ফলে দর্শনার্থীদের নিজেদের উদ্যোগেই গন্তব্য খুঁজে নিতে হয়। কোথাও কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ পথে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে।
পর্যটন খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে উন্নয়ন না করে দর্শনীয় স্থানগুলোকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন। কামাইছড়া-মুছাই পাহাড়ি এলাকা, চা-বাগান, রাবার বাগান, আলিয়া খাসিয়াপুঞ্জি ও ফয়জাবাদ বধ্যভূমিকে যুক্ত করে পৃথক ভ্রমণ রুট তৈরি করা যেতে পারে। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য তথ্যকেন্দ্র, দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, নিরাপদ চলাচলের পথ, বিশ্রামাগার, শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা দরকার।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। পাহাড়ি ছড়া, বনভূমি ও হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতিমালা প্রয়োজন। যত্রতত্র প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলা বন্ধ, প্রাকৃতিক জলাধার দখল ও দূষণ প্রতিরোধ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে। চা-বাগান, রাবার বাগান ও খাসিয়াপুঞ্জিতে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি নিশ্চিত করাও জরুরি।

পর্যটন বদলাতে পারে স্থানীয় অর্থনীতি
পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে শুধু দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়বে না, স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। স্থানীয় তরুণদের পর্যটন গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পের বাজার সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাহুবলের দর্শনীয় স্থানগুলো তুলে ধরতে পারলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকদের কাছে উপজেলাটির পরিচিতি বাড়বে।
স্থানীয় সচেতন মহল, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও ব্যবসায়ীদের মতে, বাহুবলের পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে ফয়জাবাদ বধ্যভূমি সংরক্ষণ, পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ পর্যটন পরিবেশ তৈরি এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পের প্রসার ঘটবে। তৈরি হবে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র।
তাঁদের মতে, উপজেলা ও জেলা প্রশাসন, পর্যটন করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বাগান কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বাহুবলের পর্যটন আকর্ষণ নিয়ে প্রচারপত্র, ওয়েবসাইট, মানচিত্র ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা গেলে পর্যটকদের কাছে এ অঞ্চলের সম্ভাবনা আরও ভালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
প্রকৃতির সৌন্দর্য, পাহাড়ি জনপদ, চা-বাগান, হাওর আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা—সব মিলিয়ে বাহুবলের পর্যটন সম্ভাবনা যথেষ্ট। অভাব শুধু পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর উদ্যোগের। এসব সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পর্যটন উপযোগী করা গেলে বাহুবল হয়ে উঠতে পারে সিলেট বিভাগের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য। সে জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় এবং স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









