নাওমি ক্লেইন ও অ্যাস্ট্রা টেলরের ‘এন্ড টাইমস ফ্যাসিজম: অ্যান্ড দ্য ফাইট ফর দ্য লিভিং ওয়ার্ল্ড’ বইয়ে সমকালীন উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির এক বিপজ্জনক রূপ তুলে ধরা হয়েছে। লেখকদের মতে, ধর্মীয় মৌলবাদী, প্রযুক্তি খাতের ধনকুবের এবং উগ্র জাতীয়তাবাদীরা এমন এক পৃথিবীর কল্পনা করছে, যেখানে সংকট ও বিপর্যয় অনিবার্য, আর কেবল ক্ষমতাবান ও নির্বাচিত কিছু মানুষই টিকে থাকবে। জলবায়ু বিপর্যয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অভিবাসনভীতিকে কেন্দ্র করে এই রাজনীতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে। এর বিপরীতে লেখকদ্বয় গণতন্ত্র, মানবিক সংহতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পৃথিবীর সম্মিলিত সুরক্ষার পক্ষে নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রকাশনা সংস্থা ফারার, স্ট্রাউস অ্যান্ড জিরু, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বইটি প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক এদিন অনলাইন বইটি সম্পর্কে পাঠকদের ধারণা তৈরিতে ভূমিকার অংশটি অনুবাদ করে ছাপল।
পৃথিবীর শেষ প্রান্তে সুরক্ষিত নগরী
“তিনি তাদের চোখের সব অশ্রু মুছে দেবেন। সেখানে আর মৃত্যু থাকবে না, থাকবে না শোক, কান্না কিংবা যন্ত্রণা। কারণ, পুরোনো সবকিছুর অবসান ঘটেছে।”
— বাইবেল, প্রকাশিত বাক্য ২১:৪
“পৃথিবীকে ভালোবাসাই আমার কাজ।”
— মেরি অলিভার
শীতের একেবারে গভীরে, পাহাড়ের চূড়ায় জড়ো হয়েছিলেন কয়েকজন ধর্মবিশ্বাসী মানুষ। তারা একটি স্বপ্নের কথা শোনাতে এসেছিলেন। বললেন, তারা এক অপূর্ব নগরী দেখেছেন। সোনালি আলোয় ঝলমল করছে সেই নগরী। ধ্বংসস্তূপ আর রক্তের নদীর বুক চিরে একদিন সেখানে মাথা তুলে দাঁড়াবে এক নতুন শহর। শহরটির ভবনগুলো হবে এতটাই সুন্দর যে মনে হবে মাটির ওপর ভেসে আছে। যেন স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে সেগুলো। সেখানে মানুষের কোনো অভাব থাকবে না। সবার পেট ভরা থাকবে, শরীর থাকবে সুস্থ, মন থাকবে বিস্ময়ে পরিপূর্ণ। আর তাদের নিরাপত্তার জন্য থাকবে এক স্নেহশীল, সতর্ক প্রহরী। সেই আলোকোজ্জ্বল নগরীতে কোনো অস্ত্র থাকবে না। থাকবে কল্পনারও অতীত সম্পদ। প্রতিটি প্রবেশপথে থাকবে বিশাল ফটক। সেখান থেকে আলো ও শান্তি ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীর সংঘাতময় দেশগুলোতে। স্বপ্নের কথা বলতে বলতে উপস্থিত ব্যক্তিদের একজনের চোখে পানি এসে গেল। তিনি আসন্ন সেই নগরীর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালেন।তার পাশে দাঁড়ানো অপেক্ষাকৃত তরুণ আরেকজন ঘোষণা করলেন, নগরীটি খুব শিগগিরই বাস্তব হয়ে উঠবে। আর মাত্র দুই কিংবা তিন বছর। তিনি দর্শকদের সামনে তুলে ধরলেন ভবিষ্যতের সেই নগরীর জীবন্ত ছবি। বললেন, বিশ্বাস রাখতে হবে, আর উদারভাবে অর্থ দিতে হবে। এই স্বপ্নের নগরীর নামও ঠিক করা হয়ে গেছে। নিউ গাজা।
গল্পটি কল্পিত নয়। এর পেছনে কোনো অলংকারও নেই। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার অবকাশযাপনকেন্দ্র দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনেই এই পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছিল। নিউ গাজার স্বর্গীয় ভবিষ্যতের যে ছবি তুলে ধরা হয়েছিল, তার উপস্থাপক ছিলেন জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ। দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন ব্যবসায়ী এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত। উপস্থাপনার সময় উইটকফের চোখেও পানি এসে গিয়েছিল। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিউ গাজায় থাকবে পর্যাপ্ত খাদ্য, শতভাগ কর্মসংস্থান, ৭৫টি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং ২০০টি স্কুল। ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসবে এক নতুন, সমৃদ্ধ নগরী। যে ছবিগুলো দেখানো হয়েছিল, সেগুলো ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছিল, মেঘ সরে গিয়ে সোনালি আলো এসে পড়ছে নতুন শহরের ওপর। ছবিগুলোতে গাজাকে দুবাইয়ের আদলে ধনীদের বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। সেখানে থাকবে সমুদ্রের ধারে বিলাসবহুল হোটেল, অভিজাত কনডোমিনিয়াম এবং ভবিষ্যৎ স্থাপত্যের চোখধাঁধানো সব ভবন। ট্রাম্প দাভোসে নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি আসলে মনেপ্রাণে একজন আবাসন ব্যবসায়ী। এই সুন্দর সম্পত্তিটার দিকে তাকান।’ ছবিতে আরও ছিল একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা। সেখানে বসবাস করবেন ফিলিস্তিনি শ্রমিকেরা, যারা সম্ভবত বিলাসবহুল ভবনগুলোর বাসিন্দাদের সেবা দেবেন। কিন্তু একটি ছোট সমস্যা ছিল। সেখানে যতগুলো বাড়ি দেখানো হয়েছিল, তা গাজায় বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যার তুলনায় অনেক কম।
আর নিরাপত্তার বিষয়টি?
ফাঁস হওয়া মার্কিন সামরিক নথি অনুযায়ী, গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য পরিকল্পিত ভবিষ্যৎ আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করতে হলে দিতে হবে বায়োমেট্রিক পরিচয় ও শরীরের স্ক্যান। বাসিন্দাদের চলাফেরা, দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং কেনাকাটা ডিজিটাল পদ্ধতিতে নজরদারির আওতায় থাকবে। সব তথ্য জমা হবে কাছাকাছি অবস্থিত ডেটা সেন্টারে। অর্থাৎ, এটি শুধু একটি নতুন শহর নয়। এটি হবে এমন এক স্মার্ট নগরী, যেখানে মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারির মধ্যে থাকবে। শহরটি যে চারদিক থেকে ঘেরা থাকবে, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। ইসরায়েলের বেআইনি সামরিক দখলদারত্বের পরিণতি হিসেবে যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, নিউ গাজা তারই পরবর্তী ধাপ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের প্রধান প্রকল্প হওয়ার কথা ছিল নিউ গাজা। দাভোসের সেই অনুষ্ঠানেই পর্ষদটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ট্রাম্পের ভাষায়, এই ঝলমলে শহর হবে গোটা বিশ্বের জন্য এক আদর্শ। এখান থেকে শুরু হবে এমন এক স্থায়ী ও গৌরবময় শান্তির যাত্রা, যা পৃথিবীকে নতুন করে গড়ে তুলবে। প্রথমে গাজা। তারপর ইউক্রেন। এরপর ভেনেজুয়েলা কিংবা কিউবা? তাহলে কি সামনে আসছে ‘নিউ মারিউপোল’, ‘নিউ কারাকাস’ কিংবা ‘নিউ হাভানা’?
ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার পছন্দের কয়েকজন শক্তিশালী নেতা, স্বৈরশাসক এবং তেলসমৃদ্ধ রাজতন্ত্রের প্রতিনিধিরা। তবে আমন্ত্রিতদের মধ্যে থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ভ্লাদিমির পুতিন উপস্থিত হতে পারেননি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগও রয়েছে। পর্ষদের সনদ অনুযায়ী, এক বিলিয়ন ডলার নগদ অর্থের বিনিময়ে সদস্যপদ কেনার সুযোগ রাখা হয়েছিল। অনেকটা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ক্লাব মার-আ-লাগোর মতো। ট্রাম্পের বিশ্বাস, পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই ক্লাবের সদস্য হওয়ার জন্য মানুষ অর্থ দিতে দ্বিধা করবে না। অথচ সেই সময় বাস্তব গাজার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দাভোসের উপস্থাপনায় যে স্বর্গীয় ভবিষ্যতের ছবি দেখানো হয়েছিল, তার কোনো চিহ্নই সেখানে ছিল না। আকাশ থেকে নেমে আসছিল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনকারী ড্রোন হামলা। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা প্রবল বৃষ্টিতে ছিঁড়ে যাচ্ছিল বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্থায়ী তাঁবু। বন্যার পানিতে ডুবে যাচ্ছিল আশ্রয়কেন্দ্র। বোমায় বিধ্বস্ত ভবনগুলো ধসে পড়ছিল, কখনো সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ছিল আশ্রয় নিতে আসা পরিবারগুলো। ছড়িয়ে পড়ছিল পানিবাহিত রোগ। অথচ পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার পক্ষে এসব রোগ মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ভয়াবহ হামলার পর ইসরায়েল যখন গাজার সমগ্র জনগোষ্ঠীকে তার মূল্য দিতে বাধ্য করার অভিযান শুরু করে, তখন থেকেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও ত্রাণকর্মীরা, যারা জীবনে অসংখ্য যুদ্ধ ও হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছেন, তারাও গাজার বাস্তবতা বর্ণনা করতে গিয়ে শব্দ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কীভাবে বর্ণনা করবেন চিকিৎসাহীন অঙ্গহানি, ক্ষুধা, গণকবর, শোক, ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে মিশে থাকা মৃতদেহ এবং বিস্ফোরিত না হওয়া বোমার স্তূপ? শেষ পর্যন্ত তারা যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তা হলো—অ্যাপোক্যালিপস। মহাপ্রলয়। গাজা এমন এক জায়গায় পরিণত হয়েছে, যেখানে মৃত্যুরও যেন মৃত্যু ঘটেছে। ফিলিস্তিনি গবেষক আবদালজাওয়াদ ওমর সম্প্রতি গাজার এক বন্ধুর বার্তা উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ‘তোমরা যাকে শেষ বলে মনে করছ, আমরা তা ইতিমধ্যেই সহ্য করছি।’
গাজা এখন এক চলমান মহাপ্রলয়। কিন্তু সুইস পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ট্রাম্প ও তার দূতদের কথা শুনলে মনে হতো, এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য থেকেই যেন মুহূর্তের মধ্যে একটি স্বর্গীয় নগরী জন্ম নিতে যাচ্ছে। গাজার বিপর্যয় সত্ত্বেও নয়, বরং সেই বিপর্যয়কেই নতুন শহর নির্মাণের সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কুশনার আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, ‘চলুন, বিপুল সাফল্যের জন্য পরিকল্পনা করি।’ আমরা এই গল্পের সঙ্গে পরিচিত। ধর্মীয় গ্রন্থে এর নানা সংস্করণ আছে। ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ইসলামি ঐতিহ্যের মধ্যে এর উপস্থিতি রয়েছে। তবে বাইবেলের নতুন নিয়মের ‘প্রকাশিত বাক্য’ গ্রন্থে এর সবচেয়ে নাটকীয় ও সহিংস রূপ দেখা যায়। গল্পটির কাঠামো প্রায় সব জায়গায় একই। প্রথমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়, যুদ্ধ, মৃত্যু, ধ্বংস এবং আর্মাগেডন। তারপর নির্বাচিত সৌভাগ্যবানদের জন্য আবির্ভূত হয় এক নতুন জেরুজালেম—যেখানে কোনো যন্ত্রণা নেই, কোনো মৃত্যু নেই, শুধু আলো ও শান্তি। মানবসভ্যতার এক নতুন অধ্যায়। এক নতুন স্বর্গ। অন্তত সেই অল্পসংখ্যক মানুষের জন্য, যারা নিজেদের নির্বাচিত বলে মনে করেন। এই গল্প আমাদের সংস্কৃতি ও কল্পনার এত গভীরে প্রোথিত যে আমরা অনেক সময় বুঝতেও পারি না, কতটা বিশ্বাস করি একে। মানুষ সব সময় চায় তার যন্ত্রণা কোনো না কোনো অর্থ পাক। দীর্ঘ দুঃখের পর যেন আসে মুক্তি, অন্যায়ের পর ন্যায়বিচার, অন্ধকারের পর আলো। এই কারণেই নতুন জেরুজালেমের স্বপ্ন একসময় মুক্তি ও সাম্যের আন্দোলনে শক্তিশালী অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙতে চাওয়া মানুষ, বিপ্লবী এবং অত্যাচারিত জনগোষ্ঠী এই স্বপ্ন থেকে সাহস পেয়েছে। রাজা ও স্বৈরশাসকদের কাছ থেকে ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনার সংগ্রামেও এই কল্পনার ভূমিকা ছিল। কিন্তু বিপদ শুরু হয় তখন, যখন বিপুল ক্ষমতাধর মানুষ এই ধর্মীয় কাহিনিগুলোকে রূপক হিসেবে না দেখে বাস্তব পৃথিবী বদলে দেওয়ার নকশা হিসেবে গ্রহণ করেন।

তখন আর ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করার প্রয়োজন থাকে না। অস্ত্র দিয়ে যে ক্ষতি করা হয়েছে, তার জন্য অনুশোচনা করারও দরকার পড়ে না। কারণ, তাঁদের বিশ্বাস, খুব শিগগিরই সবকিছু নতুন করে শুরু হবে। ডুবতে থাকা জাহাজের পিতলের অংশগুলো পালিশ করে কী লাভ? আরও বিপজ্জনক হলো, যদি মহাপ্রলয়কে স্বর্গে পৌঁছানোর অপরিহার্য শর্ত বলে মনে করা হয়, তাহলে প্রতিটি যুদ্ধ, প্রতিটি হত্যাযজ্ঞ, প্রতিটি দুর্যোগকেই নতুন পৃথিবীর আগমনের শুভসংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এমনকি নিজেরাই যে বিপর্যয় ঘটাচ্ছে, সেটিকেও তারা ভবিষ্যতের মহিমার প্রস্তুতি বলে প্রচার করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা তার দূতেরা প্রথম ব্যক্তি নন, যারা রক্তাক্ত ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে সেখানে নতুন পরিকল্পনার জন্য একেবারে খালি জমি দেখতে পান। আমরা বহু বছর ধরে এই প্রবণতা অনুসরণ করছি। এর ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ—দুই রূপই আমাদের পরিচিত। প্রায় বিশ বছর আগে আমাদের একজন এই প্রবণতা নিয়ে লিখেছিলেন দ্য শক ডকট্রিন: দ্য রাইজ অব ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম নামের একটি বই। সেখানে দেখানো হয়েছিল, কীভাবে যুদ্ধ, সন্ত্রাসী হামলা, সামরিক অভ্যুত্থান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো সংকটকে ডানপন্থী সরকারগুলো কাজে লাগিয়ে করপোরেট স্বার্থে নতুন অর্থনৈতিক নীতি চাপিয়ে দেয়। জরুরি অবস্থার সুযোগে সরকারি সম্পদ ও জমি বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হয়। ধনীদের জন্য কর ছাড় দেওয়া হয়। জনসাধারণের সম্পদ পরিণত হয় করপোরেট মুনাফার উৎসে। এই প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয়েছিল বিপর্যয় পুঁজিবাদ বা ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম। কিন্তু আজ পরিস্থিতি আরও এক ধাপ এগিয়েছে। এখন বিভিন্ন করপোরেশন ও প্রতিক্রিয়াশীল সরকার শুধু সংকটের সুযোগ নিচ্ছে না; তারা নিজেরাই সংকট তৈরি করছে, তাকে আরও গভীর করছে এবং সেই সংকট থেকে মুনাফা অর্জনের ব্যবস্থা করছে। আগের যুগে যুদ্ধ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল স্বাভাবিক ব্যবস্থার ব্যতিক্রম। সংকট শেষ হলে সমাজ আবার স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজকের নতুন ডানপন্থী শক্তিগুলো পৃথিবীকে অন্যভাবে কল্পনা করছে। তাদের কাছে ভবিষ্যৎ মানেই একের পর এক বিপর্যয়। মহামারি, জলবায়ু বিপর্যয়, সম্পদের জন্য যুদ্ধ, নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক সংঘাত—এসব আর ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক বাস্তবতা। এই পৃথিবীতে দরিদ্র ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিপুল জনগোষ্ঠীকে সব সময় নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। আর ভাগ্যবান অল্প কয়েকজন বিপুল অর্থের বিনিময়ে কিনে নেবেন নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং বিপর্যয় থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ। আমাদের অনেকেই এই পরিবর্তন শরীর ও মন দিয়ে অনুভব করছি। মনে হচ্ছে, আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে স্থিতিশীলতা ব্যতিক্রম আর অনিশ্চয়তাই স্বাভাবিক অবস্থা।
অথচ বড় করপোরেশন ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুধু প্রস্তুতি নয়, তারা এই ভবিষ্যৎকে নিজেদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও মুনাফার হিসাবের অংশ করে ফেলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান পালান্টিরের প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্প একবার গর্ব করে বলেছিলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘খারাপ সময়ের জন্য তৈরি’। কারণ, তাঁর ভাষায়, ‘খারাপ সময় মানেই প্রতিষ্ঠানের জন্য শক্তিশালী আর্থিক অবস্থা।’ অর্থাৎ, পৃথিবী যত অস্থির হবে, কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা তত ভালো চলবে। আজ পুঁজির বিচারে মহাপ্রলয়ও একটি বিনিয়োগের ক্ষেত্র। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তখন কুখ্যাত অর্থলগ্নিকারী জেফরি এপস্টেইন প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী পিটার থিয়েলকে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, বিশ্বায়নের বিপরীতে উপজাতীয় পরিচয় ও বিভাজনের রাজনীতি ফিরে আসছে। নতুন নতুন জোট তৈরি হচ্ছে। তার ভাষায়, ধসে পড়তে থাকা জায়গা খুঁজে বের করা নতুন কোনো সস্তা বিনিয়োগ খোঁজার চেয়ে অনেক সহজ। থিয়েল ছিলেন ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়ানো সিলিকন ভ্যালির প্রথম দিককার বড় প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের একজন। এর কিছুদিন পর ট্রাম্পের সাবেক প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার আগ্রহ ছিল, কীভাবে এই পরিচয়ভিত্তিক বিভাজনকে একটি আন্তর্জাতিক ডানপন্থী পাল্টা বিপ্লবে রূপ দেওয়া যায়।
আজ আমরা সেই রাজনীতিরই বিস্তার দেখছি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে এই নতুন রাজনৈতিক প্রকল্পের ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষাগার হিসেবে। এল সালভাদরে নায়িব বুকেলে গড়ে তুলছেন স্থায়ী জরুরি অবস্থার ওপর দাঁড়ানো এক কারাগারকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। আর্জেন্টিনায় হাভিয়ের মিলেই পরীক্ষা করছেন চরম বাজারনির্ভর ও রাষ্ট্রবিরোধী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন বহু আগেই দেখিয়েছেন কীভাবে সংবাদমাধ্যমকে দুর্বল করে দেওয়া যায়। হাঙ্গেরিতে ভিক্তর অরবান গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমাগত দুর্বল করার কৌশল প্রয়োগ করেছেন। ইতালিতে জর্জিয়া মেলোনি অভিবাসীবিরোধী কট্টর জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করেছেন। ব্রাজিলে জাইর বলসোনারো লিঙ্গপরিচয়ের প্রশ্নকে নির্বাচনী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ভারতে নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে মুসলিম নাগরিকদের অধিকার ও নাগরিকত্ব নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে প্রযুক্তিনির্ভর দীর্ঘস্থায়ী দখলদারত্ব এবং একটি জাতিগতভাবে একচেটিয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে। এই সবকিছুর পেছনে রয়েছে একটি সাধারণ সূত্র: সংকটকে ব্যবহার করে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করা। যুক্তরাষ্ট্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন একটি বিদেশি দেশের নেতাকে আটক করার পর প্রকাশ্যেই জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য সেই দেশের তেলসম্পদ। তেল এমন একটি জ্বালানি, যার ব্যবহার পৃথিবীর পরিবেশগত সংকটকে আরও গভীর করছে। আর সেই সংকট থেকেই জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন বিপর্যয়। তবু ক্ষমতার এই নগ্ন প্রদর্শন আড়াল করার প্রয়োজনও যেন আর অনুভূত হচ্ছে না। হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান স্টিফেন মিলার সিএনএনের সাংবাদিক জেক ট্যাপারকে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক সৌজন্য বা কূটনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, বাস্তব পৃথিবী পরিচালিত হয় শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার নিয়মে। এগুলোই পৃথিবীর অলঙ্ঘনীয় আইন।
তাহলে এই দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আমরা কীভাবে বুঝব? এ কি অতীতের ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন?কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই তার মিল রয়েছে। একসময় বর্তমানের কট্টর ডানপন্থী সরকারগুলোর সঙ্গে গত শতাব্দীর ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার তুলনা করা বিতর্কিত বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখন সেই সাদৃশ্য আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অনেক কর্তৃত্ববাদবিষয়ক গবেষকের কাছেই বিষয়টি স্পষ্ট: আমরা ফ্যাসিবাদেরই একটি প্রাথমিক পর্যায়ের মুখোমুখি।বিপ্লব সাধারণত দুর্বল, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের বিদ্রোহ। ফ্যাসিবাদ তার বিপরীত। এটি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অথচ নিজেদের অপমানিত, বঞ্চিত কিংবা অধিকারহারা মনে করা মানুষের বিদ্রোহ। গণতন্ত্রবিরোধী হলেও এটি মানুষের গভীর ক্ষোভ, হতাশা ও পরিচয়সংকটকে কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলে। ইতিহাসে ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে প্রায়ই দেখা গেছে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয় কিংবা জাতীয় অপমানের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যারা নিজেদের মুনাফা ও ক্ষমতার ওপর হুমকি অনুভব করেছে। কখনো যুক্ত হয়েছে রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতারাও। অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতার সময় ফ্যাসিবাদীরা নিজেদের অভিজাত শ্রেণির অপমান ও মর্যাদাহানির অনুভূতিকে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব কষ্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। বিশেষ করে সেই পুরুষদের ক্ষোভকে সংগঠিত করে, যাঁরা নিজেদের সামাজিক অবস্থান ও পুরোনো কর্তৃত্ব হারানোর আশঙ্কায় ভুগছেন। শ্রমিকদের বিপ্লবের লক্ষ্য হলো নিচ থেকে সমাজকে বদলে দেওয়া। কিন্তু ফ্যাসিবাদ দাবি করে, তারা সমাজের বিদ্যমান শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করছে—জাতি, বাজার, সামরিক বাহিনী এবং পরিবারকে। তাদের চোখে এসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে কিছু শত্রু ঢুকে পড়েছে। তাদের সরিয়ে দিতে হবে। আর সেই কাজের জন্য প্রয়োজন জরুরি ব্যবস্থা, কঠোর দমননীতি এবং প্রায়ই লাগামহীন সহিংসতা। মজার বিষয় হলো, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করার কথা বলেই ফ্যাসিবাদীরা শেষ পর্যন্ত সেগুলোর অনেক কিছু ধ্বংস করে ফেলে।
স্বৈরতন্ত্রের গবেষক রবার্ট প্যাক্সটন ২০০৪ সালে প্রকাশিত দ্য অ্যানাটমি অব ফ্যাসিজম বইয়ে ফ্যাসিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ফ্যাসিবাদ এমন এক রাজনৈতিক আচরণ, যেখানে জাতি বা সম্প্রদায়ের পতন, অপমান ও নির্যাতিত হওয়ার ধারণা নিয়ে এক ধরনের আবেশ তৈরি হয়। সেই আবেশ থেকে জন্ম নেয় ঐক্য, শক্তি ও বিশুদ্ধতার পূজা। জাতীয়তাবাদী উগ্রপন্থীদের গণভিত্তিক আন্দোলন প্রচলিত ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট বাঁধে, গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা পরিত্যাগ করে এবং নৈতিক ও আইনি বাধা উপেক্ষা করে অভ্যন্তরীণ শুদ্ধিকরণ ও বাইরের দিকে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে সহিংসতা চালায়। আজ ফ্যাসিবাদের এসব পরিচিত বৈশিষ্ট্যের অনেকগুলোই আমাদের সামনে উপস্থিত। তবে এই বইয়ের উদ্দেশ্য শুধু এটুকু বলা নয় যে ইতিহাস আবার ফিরে আসছে। আমরা শুধু ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর ফ্যাসিবাদী শাসকদের মিল খুঁজে দেখব না। ফ্যাসিবাদী শুদ্ধি অভিযান, প্রকাশ্য নিষ্ঠুরতা, গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে গণতন্ত্র ধ্বংস করা কিংবা সংকটকে কাজে লাগিয়ে জনগোষ্ঠীকে বলির পাঁঠা বানানোর ইতিহাস নিয়ে ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হচ্ছে। আমরা বরং অন্য একটি পরিবর্তন বোঝার চেষ্টা করছি। আন্তর্জাতিকভাবে যুক্ত কট্টর ডানপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে এক নতুন বিবর্তন ঘটছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মানবসভ্যতার সামনে উপস্থিত অভূতপূর্ব বৈশ্বিক অস্তিত্বসংকট। এই শক্তিগুলো সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে না। বরং তারা স্থায়ী বিপর্যয়ের সম্ভাবনাকে মেনে নিয়েছে। তাদের রাজনীতি এখন এক ধরনের আধিপত্যবাদী বেঁচে থাকার লড়াই—ভবিষ্যতের পৃথিবীতে কারা টিকে থাকবে, আর কারা বাদ পড়বে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার লড়াই। এই লড়াইয়ের অস্ত্র এমন সব প্রযুক্তি, যা একই সঙ্গে কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করতে এবং বাস্তব পৃথিবীকে ধ্বংস করতে সক্ষম। এই নতুন আন্দোলনের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। কিন্তু তাদের এক জায়গায় মিল রয়েছে। তারা বিশ্বাস করে, আমাদের পরিচিত পৃথিবীর অবসান আসন্ন। তাই নির্বাচিত কিছু মানুষকে মানবসভ্যতার পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা করতে হবে। এই নির্বাচিত মানুষদের পরিচয় নির্ধারিত হবে তাদের সম্পদ, ধর্মবিশ্বাস কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর তাদের বংশগত দাবির ভিত্তিতে। সোজা কথায়, আমরা ইতিহাসের পরিচিত কোনো অধ্যায়ে ফিরে যাচ্ছি না। আমরা প্রবেশ করছি এক সম্পূর্ণ নতুন অঞ্চলে, যার মানচিত্র এখনো আঁকা হয়নি। এই বই সেই নতুন বাস্তবতার মানচিত্র আঁকার চেষ্টা। আমরা এর নাম দিয়েছি অন্তিম সময়ের ফ্যাসিবাদ বা এন্ড টাইমস ফ্যাসিজম। আমরা এই ফ্যাসিবাদ দেখতে পাই ইতিহাসের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার দৌড়ে থাকা ব্যক্তির মধ্যে। সেই ব্যক্তির নেতৃত্বে দরিদ্র মানুষের জীবন রক্ষাকারী খাদ্য ও চিকিৎসাসহায়তা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অথচ তিনি অন্য গ্রহে উপনিবেশ স্থাপনের স্বপ্ন দেখছেন।
আমরা এটি দেখতে পাই যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে সশস্ত্র অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে মানুষের পরিচয় বাছাইয়ের মধ্যে। দেখতে পাই ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীদের তৎপরতায়। কে ভেতরে থাকবে, কে বাইরে যাবে, কে বাঁচার অধিকার পাবে, আর কে পাবে না—এই সিদ্ধান্ত ক্রমাগত নেওয়া হচ্ছে। এই বাছাইয়ের কাজ সহজ করছে উজ্জ্বল পর্দার প্রযুক্তি। মুখ শনাক্তকরণ, নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ, মানুষকে আটকে রাখা কিংবা প্রয়োজনে হত্যা করার প্রযুক্তি। আমরা এটি দেখতে পাই পৃথিবীর শেষ ফোঁটা তেল পর্যন্ত উত্তোলনের প্রতিযোগিতায়। ধনীদের প্রাসাদ রক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিগত অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীতে। আবার বন্যা ও দাবানল থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার সরকারি পরিষেবা ধ্বংস করে দেওয়ার মধ্যেও। আমরা এটি দেখতে পাই সেইসব রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে, যারা প্রকাশ্যে নিজেদের ঈশ্বরের মনোনীত প্রতিনিধি বলে দাবি করেন। মার্কিন সেনাবাহিনীর কিছু কমান্ডার তাদের সৈন্যদের বলছেন, ইরানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ নাকি যিশুর প্রত্যাবর্তনের পূর্বাভাস। দেখতে পাই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের মধ্যে, যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ঈশ্বরের মতো ক্ষমতা অর্জনের স্বপ্ন দেখছেন। আবার কোনো কোনো ধনকুবের বিনিয়োগকারী একজন তরুণ পরিবেশবাদীকে নিজেদের পথে বাধা মনে করে তাকে খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের ‘অ্যান্টিক্রাইস্ট’ বা শয়তানের প্রতিনিধি হিসেবে কল্পনা করছেন। আমরা দেখতে পাই ডেটা সেন্টার ও অভিবাসীদের আটকশিবিরের একই রকম প্রাণহীন স্থাপত্যে। দেখতে পাই আইসিইর মতো অভিবাসন সংস্থায় চাকরি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের এবং খাদ্যব্যাংক থেকে খাবার নেওয়ার জন্য তার চেয়েও দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করা দরিদ্রদের। আর আমরা অনুভব করি নিষ্ঠুরতার সেই বাতাস, যা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
স্টেডিয়ামে নাৎসি কায়দায় হাত তোলা। রাস্তায় একজন জনপ্রিয় নার্সের গুলিবিদ্ধ হওয়া। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারী ও কিশোরীদের আপত্তিকরভাবে উপস্থাপনের নতুন ব্যবস্থা। বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া স্কুলের পাশে ছোট ছোট কবর। আর এমন সব ঘটনা, যেগুলো ঘটানোর পরও অপরাধীদের মধ্যে অনুশোচনার সামান্য চিহ্ন পর্যন্ত দেখা যায় না। এই নিষ্ঠুর পৃথিবী নির্মাণের প্রতিটি ধাপেই মুনাফা রয়েছে। বোমা ও ড্রোন, মুখ শনাক্তকারী প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, বন্দিশিবির ও প্রহরী, এমনকি শিবিরকে ঘিরে তৈরি বাণিজ্যিক পণ্য এবং মানুষকে অমানবিক করে তোলার প্রচার—সবকিছুই এখন ব্যবসার অংশ। আর আছে গণকবরের ওপর নির্মিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ঝলমলে বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্র। আমাদের নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষগুলো পৃথিবীর শেষের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ সেই শেষকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারাই। পুরোনো নিয়মের এক অদ্ভুত উল্টো রূপ যেন আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। একসময় মানুষ মহাপ্লাবন থেকে বাঁচতে নৌকা তৈরি করেছিল। আজকের ধনকুবের শ্রেণি নিজেদের ঈশ্বরতুল্য ক্ষমতার অধিকারী মনে করে শুধু নৌকা বানিয়েই সন্তুষ্ট নয়। মনে হচ্ছে, তারা নিজেরাই মহাপ্লাবন ঘটানোর চেষ্টা করছে। অন্তিম সময়ের ফ্যাসিবাদ এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা বিশ্বাস করে পৃথিবীতে বিশাল কিছু একটা শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু এই অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি হয়ে তারা জবাব দিচ্ছে চরম নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে। মানুষের তৈরি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাগুলো যে সংকট সৃষ্টি করছে, সেগুলো বদলানোর বদলে তারা দাবি করছে, মানবসভ্যতার ইতিহাসেরই শেষ এসে গেছে। আসন্ন বিপর্যয় থেকে কেবল অল্প কয়েকজন যোগ্য মানুষ বেঁচে থাকবে। কেউ থাকবে আকাশচুম্বী সুরক্ষিত নগরীতে। কেউ করপোরেট মালিকানাধীন দুর্গে। কেউ জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের কাঁটাতারের আড়ালে। আর বাকিরা পড়ে থাকবে বন্যা, দাবানল ও ধ্বংসের পৃথিবীতে। এটাই সেই পুরোনো প্রলোভন— নির্বাচিত কয়েকজনের জন্য সুরক্ষিত স্বর্গ, আর বাকিদের জন্য অভিশপ্ত পৃথিবী।
ঘড়ির কাঁটা যখন মধ্যরাতের দিকে
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাভোসে যুদ্ধ ও শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঝড় তুলে যাওয়ার পাঁচ দিন পর ওয়াশিংটন ডিসিতে আরেকটি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ছিল না দাভোসের জৌলুশ, বিলাসিতা কিংবা ক্ষমতাবানদের প্রদর্শনী। এটি ছিল বিজ্ঞানীদের সংগঠন বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস-এর বার্ষিক অনুষ্ঠান। পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন এই সংগঠনের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন আটজন নোবেলজয়ীও। সংগঠনটির সভাপতি আলেকজান্দ্রা বেল প্রতীকী ঘড়ির কাঁটা চার সেকেন্ড এগিয়ে দিলেন। ঘোষণা করলেন, পৃথিবী এখন মধ্যরাত থেকে মাত্র ৮৫ সেকেন্ড দূরে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এর আগে পৃথিবী কখনো এতটা বিপজ্জনক অবস্থানে পৌঁছায়নি। ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলার পর এই সংগঠনের জন্ম। আলবার্ট আইনস্টাইন, জে. রবার্ট ওপেনহাইমার এবং ম্যানহাটন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য বিজ্ঞানী পারমাণবিক যুগের বিপদ নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির জন্য এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে তারা চালু করেন ‘ডুমসডে ক্লক’ বা মহাপ্রলয়ের ঘড়ি। এই ঘড়ির উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে একটি নতুন বাস্তবতা বোঝানো: মানুষ এখন এমন অস্ত্র তৈরি করেছে, যার সাহায্যে সমগ্র পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তোলা সম্ভব। এমনকি মানবসভ্যতার সম্পূর্ণ বিলুপ্তিও ঘটতে পারে। এরপর থেকে প্রতি বছর বিজ্ঞানীরা ঘড়িটির কাঁটা এগিয়ে বা পিছিয়ে দিয়ে জানান, আমরা সেই মধ্যরাতের কতটা কাছে রয়েছি। ২০২৬ সালের ঘোষণায় বিশেষজ্ঞরা জানালেন, পুরোনো ও নতুন—উভয় ধরনের অস্তিত্বসংকট দ্রুত বেড়ে চলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন সরকার পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত বাড়াতে ব্যয় করছে বিপুল অর্থ। ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে মহাকাশেও নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। রাশিয়া ও পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রকে শুধু প্রতিরক্ষার জন্য নয়, অন্য রাষ্ট্রকে চাপ দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে। পৃথিবীর জলবায়ুর তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। জীবাণু অস্ত্র ও সিন্থেটিক বায়োলজি নিয়ে চলছে বিপজ্জনক গবেষণা। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঢুকে পড়ছে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর সামরিক ব্যবস্থায়। সম্প্রতি নিউ সায়েন্টিস্ট জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত মডেলগুলোকে ভূরাজনৈতিক সংকটের অনুকরণমূলক পরিস্থিতিতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তারা মানুষের তুলনায় অনেক কম দ্বিধায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এসব ঝুঁকি একাই যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ। কিন্তু আরও বড় সমস্যা হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সরকার যেন প্রতিটি সংকটের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করছে: কীভাবে পরিস্থিতি আরও খারাপ করা যায়? যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সর্বশেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, অথচ নতুন চুক্তি করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার উদ্যোগগুলো দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী মহামারি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতিও কমে গেছে। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের অর্থায়ন কমানো হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে গেছে দেশটি। জনস্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে এমন ব্যক্তিদের, যাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে ভ্রান্ত ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচারের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আগের প্রশাসনের নেওয়া উদ্যোগ বাতিল করা হয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব এআই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরির ক্ষমতাও সীমিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, ঝুঁকি যত বাড়ছে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা তত দুর্বল হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে ২০২৬ সালের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ডুমসডে ক্লকের কাঁটা দ্রুত মধ্যরাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। প্রায় ত্রিশ বছর আগে ইতালীয় দার্শনিক ও চিন্তাবিদ উমবের্তো একো—যিনি মুসোলিনির শাসনামলে ইতালিতে বেড়ে উঠেছিলেন—ফ্যাসিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছিলেন। তার মতে, ফ্যাসিবাদের মধ্যে সব সময়ই এক ধরনের ‘আর্মাগেডন কমপ্লেক্স’ থাকে। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, ফ্যাসিবাদীরা বিশ্বাস করে, শত্রুদের পরাজিত করতেই হবে। আর সেই পরাজয়ের জন্য দরকার একটি চূড়ান্ত যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের পর আন্দোলনটি গোটা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নেবে। কিন্তু অতীতের ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদীরা পৃথিবীর প্রকৃত সমাপ্তি কল্পনা করত না। তারা চেয়েছিল পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে। তাদের স্বপ্ন ছিল যুদ্ধ শেষে একটি বিশুদ্ধ, সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল জাতির উত্থান। এই স্বপ্নের সুফল শুধু ধনীদের জন্য ছিল না। শ্রমজীবী মানুষের জন্যও কিছু বাস্তব সুবিধার প্রতিশ্রুতি ছিল। নাৎসিরা তাদের আর্য অনুসারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা স্লাভ জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে জমি এবং ইহুদিদের কাছ থেকে বাড়িঘর কেড়ে নিয়ে নিজেদের বসতি গড়বে। সেই বসতিগুলোকে যুক্ত করা হবে নতুন সড়ক, অবকাঠামো ও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে।
এটি ছিল জঘন্য, রক্তাক্ত এবং বর্ণবাদী স্বপ্ন। কিন্তু ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর ভেতরের মানুষের কাছে এর কিছু বাস্তব সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ কট্টর ডানপন্থী নেতারা এখানেই অতীতের ফ্যাসিবাদীদের থেকে আলাদা।নির্বাচনের সময় তারা এখনো এক সোনালি অতীতের প্রতিশ্রুতি দেন। পঞ্চাশের দশকের মতো শিল্পকারখানার চাকরি ফিরিয়ে আনা, ঐতিহ্যবাহী পরিবারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্ন দেখান। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা এই নেতারা এতটাই দুর্নীতিগ্রস্ত এবং নিজেদের শ্রেণিগত সম্পদ কুক্ষিগত করতে ব্যস্ত যে সাধারণ মানুষের জন্য উন্নত ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কোনো আগ্রহ তাদের নেই। ফলে আর্মাগেডনের ধারণা ফ্যাসিবাদের একটি বৈশিষ্ট্য থেকে এর কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দর্শনে পরিণত হয়েছে। অন্তিম সময়ের ফ্যাসিবাদ মানুষকে সহিংসতা ও অস্থিরতার অবসানের প্রতিশ্রুতি দেয় না। বরং পৃথিবী ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে কে কোন সুরক্ষিত আশ্রয়ে বেঁচে থাকতে পারবে, সেই স্বপ্ন দেখায়।
এই পরিবর্তন আকস্মিক নয়। মুসোলিনি ও হিটলারের মৃত্যু হয়েছিল ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে। তার চার মাস পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথম পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। অর্থাৎ, তারা এমন পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন না, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র মুহূর্তের মধ্যে মানবসভ্যতা ধ্বংস করতে পারে। তারা এমন পৃথিবীও দেখেননি, যেখানে পুঁজিবাদী উৎপাদন ও ভোগের কারণে জলবায়ু ক্রমাগত বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তির অস্তিত্বও তখন ছিল না। তাদের সময়ে মানবসভ্যতার হাতে পৃথিবী ধ্বংস করার এতগুলো উপায় ছিল না। আজ আমরা মানবপ্রজাতির ইতিহাসে প্রথম এমন এক প্রজন্ম, যাদের সামনে একসঙ্গে এতগুলো বৈশ্বিক অস্তিত্বসংকট উপস্থিত। এই জ্ঞান আমাদের প্রত্যেককে বদলে দিয়েছে। সচেতনভাবে কিংবা অচেতনভাবে। আমাদের শিল্প, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, কল্পনা, এমনকি স্বপ্নেও ঢুকে পড়েছে পৃথিবীর শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। আর এই বাস্তবতাই বদলে দিয়েছে আজকের ফ্যাসিবাদের চরিত্র। ট্রাম্প, নেতানিয়াহু কিংবা পুতিন হিটলার, মুসোলিনি বা ফ্রাঙ্কোর চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর কিংবা বিপজ্জনক—আমরা এমন দাবি করছি না। আমরা বলছি, তাদের সময়ের পৃথিবীর তুলনায় আজকের পৃথিবী অনেক বেশি বিপজ্জনক। আমাদের অস্ত্র আরও প্রাণঘাতী, প্রযুক্তি আরও শক্তিশালী, সংবাদমাধ্যম আরও সংযুক্ত, জলবায়ু আরও অস্থিতিশীল এবং সম্পদ আরও বেশি মানুষের হাত থেকে অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত। পঞ্চাশের দশকে জার্মান-ইহুদি দার্শনিক গুন্থার আন্ডার্স পারমাণবিক বোমার আবির্ভাব নিয়ে লিখেছিলেন। নাৎসিদের হাত থেকে পালিয়ে আসা এই দার্শনিক বুঝতে পেরেছিলেন, পারমাণবিক যুগ মানবসভ্যতার সামনে এক অভূতপূর্ব অস্তিত্বসংকট তৈরি করেছে। আগের সব ধরনের আধিপত্য কেবল নির্দিষ্ট কিছু মানুষ, শহর, রাজ্য কিংবা সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে পারত। কিন্তু মানবজাতি হিসেবে আমরা বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পেতাম।
এখন সেই নিশ্চয়তা আর নেই। আন্ডার্সের কথার মর্ম ছিল, আমরা প্রথম মানুষ, যাদের হাতে নিজেরাই মহাপ্রলয় ঘটানোর ক্ষমতা রয়েছে। আর তাই আমরাই প্রথম মানুষ, যাদের প্রতিদিন সেই মহাপ্রলয়ের আশঙ্কার মধ্যে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। এটাই আমাদের বর্তমান পৃথিবী। এই বাস্তবতার মধ্যে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির প্রধান মতাদর্শ হয়ে উঠেছে এক ধরনের নিষ্ঠুর, আধিপত্যবাদী বেঁচে থাকার দর্শন। অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন মিহেন্তের সহপ্রতিষ্ঠাতা মারিসা ফ্রাঙ্কো আজকের ফ্যাসিবাদীদের একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘তারা হাল ছেড়ে দেওয়া মানুষ।’ কথাটি যথার্থ। নিজেদের নানা ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দিয়ে তারা এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কিংবা বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন নিয়ে আর কোনো দায়িত্ব অনুভব করে না।
খারাপ কল্পকাহিনির ফাঁদ
নগরবিষয়ক চিন্তাবিদ মাইক ডেভিস এই বিপদের কথা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। ২০২২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি লিখেছিলেন, আমরা এমন এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে বাস করছি, যেখানে ইতিহাস তৈরি করছেন কয়েকজন ‘মহান নেতা’। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—মন্ত্রিসভা, সংসদ, সামরিক নেতৃত্ব কিংবা দলীয় কাঠামো—সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর নেতাদের উন্মত্ত সিদ্ধান্তের ওপর কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারত। কিন্তু আজ সেই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল। অর্থনৈতিক, সংবাদমাধ্যম এবং সামরিক ক্ষমতা ইতিহাসে আগে কখনো এতটা অল্প কয়েকজন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়নি। এই ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি আমাদের বোঝাতে পারে যে মহাপ্রলয়ের দিকে যাত্রা আর থামানো সম্ভব নয়। এমনকি আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করতে পারি যে অন্তিম সময়ের ফ্যাসিবাদীরা হয়তো ঠিকই বলছে। মানবসভ্যতার প্রকল্প সত্যিই শেষ হয়ে আসছে। বামপন্থীদের মধ্যেও কেউ কেউ এমন কথা বলছেন যে মানবসভ্যতার এই সমাপ্তিকে স্বাগত জানানো উচিত, কারণ তাতে পৃথিবী হয়তো মানুষের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু এই ধারণার একটি বড় সমস্যা আছে। পৃথিবীর ধ্বংসের কল্পনা আমাদের সংস্কৃতিতে এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে আমরা যেন আগেই সেই ধ্বংসের অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছি। পারমাণবিক যুদ্ধের পরের পৃথিবী, বিকিরণে বিধ্বস্ত শহর, ধ্বংসপ্রাপ্ত সভ্যতা, গোপন ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র, প্রযুক্তিধনীদের পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে পালিয়ে যাওয়া—এসব দৃশ্য সিনেমা, টেলিভিশন ও ভিডিও গেমে এতবার দেখানো হয়েছে যে বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার পার্থক্য অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যায়। প্রযুক্তির কোটিপতিরা জীবন্ত পৃথিবী ধ্বংস করে একটি ডিজিটাল ঈশ্বর তৈরি করতে চান—এমন ভবিষ্যৎও আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয় না। পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেলে মানবপ্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মহাকাশে কয়েকজন মানুষকে পাঠানোর পরিকল্পনাও যেন পরিচিত কাহিনির অংশ। আমরা এই কল্পকাহিনির সঙ্গে এতটাই অভ্যস্ত যে বাস্তব বিপদের মুখেও অনেক সময় গুরুত্ব দিই না। এই অনুভূতির বিপদ আমরা আগেও দেখেছি। বিশ বছর আগে কেউ যদি বলতেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবেন, তাহলে হয়তো অনেকেই হেসে উড়িয়ে দিতেন। কারণ, ব্যাপারটি এতটাই অবিশ্বাস্য মনে হতো যে তাঁকে রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে গুরুত্ব দিতে আমরা দেরি করতাম। এখন আমরা আবার সেই একই ভুল করতে পারি।
তবে আশার জায়গাও আছে। টেলিভিশন সিরিজ অ্যান্ডর-এর একটি সংলাপ ধার করে বলা যায়, ‘আমাদের বন্ধু সর্বত্র রয়েছে।’ এমনকি যেসব জায়গায় আমরা তাদের উপস্থিতি আশা করি না, সেখানেও। ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা নিজেদের বিপুলসংখ্যক ভোটারের স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে প্রযুক্তি ধনকুবের এবং ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন। এই সিদ্ধান্ত তাঁদের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক দুর্বলতা তৈরি করেছে। কারণ, অন্তিম সময়ের ফ্যাসিবাদীরা যত ক্ষমতাবানই হোক, তারা এখনো সংখ্যালঘু। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরেও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। ট্রাম্প অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রতিশোধের হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে রাখতে পেরেছেন। কিন্তু পুরো করপোরেট শ্রেণি তাঁর পক্ষে নেই। অনেক ধর্মপ্রাণ ও রক্ষণশীল খ্রিষ্টানও খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদের সেই প্রকল্পে অস্বস্তি বোধ করেন, যেখানে জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের বিশুদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়। একইভাবে, ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষ পৃথিবীর শেষ ত্বরান্বিত করার জন্য তাকে ভোট দেননি। তাদের অনেকেই চেয়েছিলেন পুরোনো ব্যর্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলে যাক। তারা বিশ্বাস করেছিলেন, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, খাদ্যের দাম কমবে, সীমান্ত আরও নিরাপদ হবে এবং তাঁদের জীবন উন্নত হবে। কিন্তু এখন তারা দেখছেন, নিষ্ঠুরতার নিরবচ্ছিন্ন প্রদর্শনী সত্ত্বেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমছে না। নতুন চাকরির একটি অংশ তৈরি হচ্ছে প্রতিবেশীদের দিকে বন্দুক তাক করার কাজে কিংবা বিশাল ডেটা সেন্টার নির্মাণে। অথচ সেই ডেটা সেন্টারগুলোর মালিকেরাই বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিগগিরই অসংখ্য পেশা বিলুপ্ত করে দেবে। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে দুর্যোগ মোকাবিলার সরকারি ব্যবস্থাগুলো দুর্বল করে দেওয়ার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে থাকুন কিংবা না-ই থাকুন। অবিরাম যুদ্ধের হুমকি ও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির কারণে ট্রাম্প এবং তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জনসাধারণের আস্থাও হারিয়েছেন। শান্তির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ট্রাম্প একবিংশ শতাব্দীর অন্য যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুলনায় বেশি সামরিক হামলার অনুমোদন দিয়েছেন এবং বেশি বিদেশি দেশকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন। ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর প্রশাসনের কর্মকর্তারা যুক্তি দেখিয়েছেন, দেশটি ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত বলেই তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ন্যায়সংগত। এই যুক্তির মধ্যে পুরোনো একটি প্রবণতা ফিরে এসেছে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময় থেকে ইসলামকে প্রায়ই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন গোটা ধর্মীয় ঐতিহ্যই সহিংসতা ও মহাপ্রলয়ের ধারণায় আচ্ছন্ন।
ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কিছু শিয়া ধর্মীয় নেতা যে বিপজ্জনক মহাপ্রলয়বাদী ধারণায় বিশ্বাস করেন, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এই বইয়ের মূল আলোচনার বিষয় হলো আমাদের নিজেদের সমাজে বেড়ে ওঠা মহাপ্রলয়বাদী রাজনীতি, যেদিকে মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের মনোযোগ তুলনামূলকভাবে কম। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এক মাস পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দেশটির ‘ইসলামপন্থী মতাদর্শ’কে সহিংস ও মহাপ্রলয়বাদী বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অথচ পেন্টাগনে তিনি নিজেই যে ধরনের খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের প্রভাব বিস্তার করছেন, তার মধ্যেও একই ধরনের মহাপ্রলয়ের বিশ্বাস রয়েছে। একইভাবে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যখন বলেছিলেন, ইরানের নেতারা বিশ্বাস করেন পৃথিবীর শেষ ঘটানোই তাদের জীবনের লক্ষ্য, তখন অনেকেই লক্ষ করেছিলেন যে তার নিজের প্রশাসনের ক্ষেত্রেও কথাটি প্রযোজ্য হতে পারে। গাজার মতো ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের পরিণতিও ক্রমশ মহাপ্রলয়ের চেহারা ধারণ করছিল। তেহরানের আকাশ বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছিল। বিশ্ববাজারে জ্বালানি, সার ও খাদ্যের সরবরাহে তৈরি হচ্ছিল বড় ধরনের অস্থিরতা। ট্রাম্প যখন ইরানকে এমনভাবে বোমা হামলার হুমকি দেন যে দেশটির মানুষকে নরকে বসবাস করতে হবে, কিংবা পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলা হবে, তখন তার কট্টর সমর্থকদের কেউ কেউ উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি ঘোষণা করেন, ‘আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতার মৃত্যু ঘটবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’ কিন্তু রিপাবলিকান দলের অনেক নেতা ও সাধারণ ভোটার এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হন। তারা এই ধরনের ধ্বংসাত্মক হুমকিকে ঘৃণা করেন। কারণ, ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় বিদেশে নতুন যুদ্ধে জড়ানোর বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ এখন তাঁরাই এমন এক যুদ্ধে জড়িয়েছেন, যার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে এবং যার সাফল্য নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, দেশের ভেতরে এত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কেন বিপুল অর্থ বিদেশের যুদ্ধে ব্যয় করা হচ্ছে? যুদ্ধের মাধ্যমে জাতিকে কোনো সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার বদলে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। অ্যালেক্স জোন্স ও ক্যান্ডেস ওয়েনসের মতো জনপ্রিয় ডানপন্থী প্রচারকেরাও ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরানোর দাবি তোলেন। টাকার কার্লসন ইঙ্গিত দেন, ট্রাম্প হয়তো অ্যান্টিক্রাইস্টের উদ্দেশ্য পূরণ করছেন—নিজের হাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে এবং পবিত্র ভূমির ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। তবে এসব মতপার্থক্য দেখে এখনই মাগা আন্দোলনের মৃত্যু ঘোষণা করা যাবে না। ট্রাম্প চিরকাল এই আন্দোলনের নেতা থাকবেন না। তার পরবর্তী নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিরা আসতে পারেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সহিংস ও প্রকাশ্য আধিপত্যবাদী পথে নিয়ে যাবেন। গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসী, ব্যাপক অভিবাসনবিরোধী কিংবা নারী-পুরুষের মৌলিক সমতার বিরোধী ব্যক্তিদের মিত্র ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু মাগা জোটের ভেতরের বিভাজন নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা তৈরি করছে। এমন এক রাজনীতি, যা সাধারণ মানুষের বাস্তব চাহিদাগুলোকে গুরুত্ব দেবে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং কোনো বৃহত্তর মানবিক সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দেবে। মানুষ যখন বুঝতে পারছে যে আজকের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতি আসলে এক ধরনের মহাপ্রলয়বাদী প্রকল্প, তখন পুরোনো রাজনৈতিক বিভাজন পেরিয়ে নতুন সংহতি গড়ে উঠছে। নতুন জোট তৈরি হচ্ছে। মানুষ পরস্পরের পাশে দাঁড়ানোর নতুন উপায় খুঁজে পাচ্ছে। সংক্ষেপে, অন্তিম সময়ের ফ্যাসিবাদ এখনো সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠেনি। তাই একে পরাজিত করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু যদি আমরা অপেক্ষা করি, যতক্ষণ না এই সহিংস ও নৈরাজ্যবাদী প্রকল্প ডানপন্থী রাজনীতির প্রতিটি অংশ দখল করে নেয়, তাহলে হয়তো তখন আর কিছু করার থাকবে না।
তিনটি দুর্গ, অথচ পৃথিবী একটাই
ফ্যাসিবাদ নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদেরা প্রায়ই মনে করিয়ে দেন, ফ্যাসিবাদ শব্দটির উৎস লাতিন ফ্যাসিস। এর অর্থ একগুচ্ছ কাঠি কিংবা একত্রে বাঁধা কিছু বস্তু। এই শব্দের মধ্যে ফ্যাসিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে আছে। এটি পরস্পরবিরোধী নানা শক্তিকে এক জায়গায় বাঁধতে পারে। রবার্ট প্যাক্সটনের ভাষায়, ক্ষমতায় থাকা ফ্যাসিবাদ হলো বিভিন্ন ধরনের রক্ষণশীল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক ও কট্টর ডানপন্থী শক্তির এক শক্তিশালী মিশ্রণ। সাধারণ শত্রু ও সাধারণ আবেগ তাদের একত্রে বেঁধে রাখে। অন্তিম সময়ের ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। এটি কোনো একক মতাদর্শ নয়। বরং ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর একটি রাজনৈতিক জোট। প্রত্যেকের মহাপ্রলয় সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা আছে, কিন্তু তারা সবাই নিজেদের মতো করে সেই বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই বইয়ে আমরা এই জোটের তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমত, ধর্মীয় মহাপ্রলয়বাদীরা। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক মহাপ্রলয়বাদীরা। তৃতীয়ত, জাতিগত ও উগ্র জাতীয়তাবাদী মহাপ্রলয়বাদীরা। এরপর আমরা দেখব, কীভাবে এই শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠছে। এই জোটের ভেতরে অবশ্য প্রচুর মতপার্থক্য রয়েছে। তাদের মধ্যে বিতর্ক আছে, জাতিরাষ্ট্রই কি মানবসভ্যতার সর্বোচ্চ অর্জন, নাকি দেশগুলো এখন অপ্রয়োজনীয় এবং প্রযুক্তির হাতে পুরোনো হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি শয়তানের হাতিয়ার, নাকি নতুন কোনো দেবতার আবির্ভাবের মাধ্যম? যিশুর প্রত্যাবর্তনের পথ কি বৃহত্তর ইসরায়েলের মধ্য দিয়ে তৈরি হবে, নাকি সেই ঐতিহাসিক ভূমিকা এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে গেছে? প্রযুক্তি ধনকুবেরেরা কি খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করছেন, নাকি ইহুদিরাই সেই কাজের পেছনে রয়েছেন—এ নিয়েও তাদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক আছে। স্টিভ ব্যাননের মতো ব্যক্তিরা সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি অভিজাতদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই আক্রমণ চালান। আবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ঈশ্বরের মনোনীত প্রতিনিধি, নাকি ‘এপস্টেইন শ্রেণি’র প্রতারণার হাতিয়ার—এ নিয়েও মতভেদ রয়েছে। কিছু মতপার্থক্য এতটাই গভীর যে পুরো জোট ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবু একটি বিশ্বাস তাদের সবাইকে একত্রে বেঁধে রেখেছে: আমাদের পরিচিত পৃথিবীর শেষ আসন্ন।
কারও কাছে এই মহাপ্রলয় বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী পূরণের ঘটনা। কারও কাছে পারমাণবিক যুদ্ধ, জলবায়ু বিপর্যয় ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকির সম্মিলিত ফল। আবার কারও কাছে অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনই জাতির অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। কারণ যাই হোক, তারা সবাই নিজেদের নির্বাচিত অল্পসংখ্যক মানুষের অংশ হিসেবে কল্পনা করে। তারা চায়, আসন্ন বিপর্যয় থেকে বেঁচে থাকার জন্য তাদের নিজস্ব দুর্গ থাকুক। কেউ সোনালি প্রাসাদঘেরা সুরক্ষিত নগরীতে আশ্রয় নেবে। কেউ জাতীয় সীমান্তকে দুর্গে পরিণত করবে। কেউ পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে পালাবে। কারও বিশ্বাস, তাদের আত্মা স্বর্গে উঠে যাবে। কারও স্বপ্ন, মস্তিষ্কের তথ্য ক্লাউডে স্থানান্তরিত করে অমর হওয়া সম্ভব। এই তিনটি দুর্গের স্বপ্নই বইটির মূল আলোচনার বিষয়।
প্রথম ভাগ: মেসিয়ানিক স্বপ্ন
প্রথম ভাগে আমরা যাব এই সব মহাপ্রলয়বাদী কাহিনির ধর্মীয় উৎসের কাছে। পরিচিত হব ধর্মীয় মহাপ্রলয়বাদীদের সঙ্গে।বিশ্বের প্রায় সব দেশেই তাদের উপস্থিতি রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও লাতিন আমেরিকায় তাদের প্রভাব বিশেষভাবে শক্তিশালী। তারা বিশ্বাস করে, পৃথিবী ইতিমধ্যেই বাইবেলে বর্ণিত শেষ সময়ে প্রবেশ করেছে। বাস্তব পৃথিবীর প্রতিটি যুদ্ধ, দুর্যোগ ও বিপর্যয় তাদের কাছে আনন্দের সংবাদ। কারণ, এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে তাদের বহু প্রতীক্ষিত মুক্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে। একদিন ঈশ্বর তাঁদের রক্ষা করবেন এবং পৃথিবীর সমস্ত দুঃখের অবসান ঘটবে। ট্রাম্পের প্রথম শাসনামল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনীতিতে ইহুদি ও খ্রিষ্টীয় আধিপত্যবাদীদের একটি শক্তিশালী জোট গড়ে উঠেছে। একসময় যারা রাজনৈতিক প্রান্তে ছিল, তারা এখন ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তাদের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো বর্তমান জেরুজালেমে বাইবেলে ভবিষ্যদ্বাণীকৃত তৃতীয় মন্দির নির্মাণ। তারা বিশ্বাস করে, এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হলেই মসিহের যুগ শুরু হবে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তারা এমনকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনাকেও স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। ২০২৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় ভাগ: ক্লাউডে পালিয়ে যাওয়া
দ্বিতীয় ভাগে আমরা যাব প্রযুক্তি দুনিয়ার শীর্ষ ধনকুবেরদের কাছে। দেখব, কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা এক ধরনের নতুন ধর্মীয় বিশ্বাসে পরিণত হচ্ছে। আর কীভাবে প্রযুক্তির কিছু উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী এই বিশ্বাসের সবচেয়ে উৎসাহী প্রচারক হয়ে উঠেছেন। ২০১৩ সালে স্যাম অল্টম্যান বলেছিলেন, সফল উদ্যোক্তারা শুধু কোম্পানি তৈরি করতে চান না। তাঁরা এমন কিছু গড়ে তুলতে চান, যা অনেকটা ধর্মের মতো। আর একসময় কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করাই সেই কাজের সবচেয়ে সহজ উপায় হয়ে ওঠে। এর দুই বছর পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ওপেনএআই। আমরা দেখব, বৃহৎ পরিসরের জেনারেটিভ এআই সিলিকন ভ্যালির আগের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, ব্যবসায়িক বুদ্বুদ কিংবা বাজারের উত্থান-পতনের মতো সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এটি শুধু মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা, বাড়িতে বসে কাজ করা কিংবা কথা না বলেই খাবার অর্ডার করার প্রযুক্তি নয়। এই প্রযুক্তি পুরো শিল্পব্যবস্থা, মানুষের জীবনযাপন এবং এমনকি আমরা জীবন বলতে যা বুঝি, তার ধারণাকেও বদলে দিতে পারে। ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা যেমন পরবর্তী পৃথিবীর আগমনের জন্য বর্তমান পৃথিবীকে জ্বলতে দিতে প্রস্তুত, তেমনি প্রযুক্তি দুনিয়ার শীর্ষ ধনকুবেরেরাও নিজেদের যন্ত্রের জন্য সীমাহীন জ্বালানি, পানি ও খনিজসম্পদ নিশ্চিত করতে পৃথিবীর বাসযোগ্যতা বিসর্জন দিতে দ্বিধা করছেন না। তারা বিশ্বাস করেন, এমন এক ডিজিটাল অতিবুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব আসন্ন, যা শেষ পর্যন্ত রক্তমাংসের মানুষকে অতিক্রম করবে। তারা জানেন, এই প্রতিযোগিতা পৃথিবীতে কতটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। কিন্তু তাঁদের বিশ্বাস, নিজেদের বিপুল সম্পদ এবং সেই সম্পদ দিয়ে কেনা সুরক্ষিত আশ্রয়কেন্দ্র তাঁদের বাঁচিয়ে রাখবে। এই বিশ্বাসই ব্যাখ্যা করে, কেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতার সঙ্গে জোট বেঁধেছেন। সিলিকন ভ্যালি ও ফ্যাসিবাদের সম্পর্ক শুধু সুবিধাবাদী কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা নয়। এটি এক গভীর ও প্রয়োজননির্ভর জোট।

তৃতীয় ভাগ: প্রস্তুত জাতিরাষ্ট্র
তৃতীয় ভাগে আমরা দেখব ফ্যাসিবাদী জোটের সেই অংশকে, যারা বিশ্বাস করে জাতিরাষ্ট্রকেই একটি বিশুদ্ধ দুর্গে পরিণত করা সম্ভব। তাদের মতে, এই দুর্গ রক্ষা করতে হলে বিপুলসংখ্যক মানুষকে দেশ থেকে বের করে দিতে হবে, অনেককে কারাগারে আটকে রাখতে হবে এবং অনেককে নাগরিক জীবনের বাইরে ঠেলে দিতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সোনা, অস্ত্র ও অন্যান্য সম্পদ জমিয়ে আসন্ন বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এটাই খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদীদের সহিংস রাজনৈতিক প্রকল্প, যার প্রভাব এখন যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। অতীতে ফ্যাসিবাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজেদের দেশের ভেতরের শত্রু—ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ, অন্য ধর্মাবলম্বী, ভিন্ন বর্ণের মানুষ কিংবা ভিন্ন যৌন পরিচয়ের নাগরিক। পাশাপাশি বিদেশি রাষ্ট্রকেও শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। আজও এসব ঘৃণা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানের আন্তর্জাতিক কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকে সবচেয়ে বেশি একত্র করেছে অভিবাসীবিদ্বেষ। নরওয়ে থেকে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা থেকে চিলি—প্রায় সর্বত্র অভিবাসীকে বহিরাগত আক্রমণকারী হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে একটি বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ নিজেদের বাসস্থান ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছে। আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। কিন্তু অভিবাসীবিরোধী রাজনীতির নেতারা এসব সংকটের কথা স্বীকার করতে চান না। বরং তারা অভিবাসীদেরই সমস্যার কারণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এ কারণেই এই রাজনীতিকে সব সময় মহাপ্রলয়ের আবহে থাকতে হয়। জাতিকে এমনভাবে কল্পনা করা হয়, যেন ভেতর ও বাইরে থেকে এক বিশাল আক্রমণ আসন্ন। এই রাজনৈতিক প্রকল্পের তিনটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, জাতিগতভাবে নির্ধারিত শত্রুদের দেশ থেকে সরিয়ে দিয়ে জাতিকে তথাকথিত বিশুদ্ধ করা। দ্বিতীয়ত, আসন্ন বিপর্যয়ে টিকে থাকার জন্য অন্য দেশ থেকে সম্পদ দখল করে মজুত করা। তৃতীয়ত, কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামি বর্ণের মানুষের সম্ভাব্য অভিবাসন ঠেকাতে সীমান্তকে দুর্গে পরিণত করা। এটি আসলে এক বিশাল প্রস্তুতিবাদী রাজনীতি, যেখানে গোটা জাতিরাষ্ট্রকেই একটি ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করা হচ্ছে। কিন্তু এই আন্দোলনের একটি বড় বিরোধাভাস রয়েছে। যারা জাতিকে বিশুদ্ধ ও নিরাপদ করার কথা বলছেন, তারা নিজেরাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রতিযোগিতামূলক প্রচারব্যবস্থা এবং সংঘাত থেকে মুনাফা অর্জনের দৌড়ে এতটাই ব্যস্ত যে শেষ পর্যন্ত কাদের এই জাতীয় দুর্গের ভেতরে থাকতে দেওয়া হবে, তা নিয়েও একমত হতে পারছেন না। এই তিনটি দুর্গের স্বপ্নে অনেক বিরোধ ও অসংগতি রয়েছে। কিন্তু তাদের এক জায়গায় মিল আছে। তারা সবাই একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে পরিত্যাগ করেছে। এই একটি বিষয় বুঝতে পারলে তাদের অন্যান্য কর্মকাণ্ডও অনেক সহজে বোঝা যায়। তারা কেন মানুষের মৌলিক সমতা ও সর্বজনীন অধিকারের বিরোধিতা করে? কেন সহমর্মিতাকেও দুর্বলতা মনে করে? কারণ, তারা যে পৃথিবী গড়তে চায়, সেখানে টিকে থাকার অধিকার সবার জন্য সমান হতে পারে না।
তাদের পৃথিবী সামাজিক ডারউইনবাদের ওপর দাঁড়ানো। সেখানে শক্তিশালী ও যোগ্য বলে বিবেচিত অল্প কয়েকজনই বেঁচে থাকার অধিকার পাবে। এই কারণেই তারা নারীকে পণ্য হিসেবে দেখার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। এআই ব্যবহার করে নারীর আপত্তিকর ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করার প্রবণতা বাড়ছে। ইউজেনিকস বা বংশগত বিশুদ্ধতার তত্ত্বকে নতুন করে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা চলছে। বর্ণবাদী বিজ্ঞানকে আবারও স্বাভাবিক জ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। এমনকি হিটলারকে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে নতুন করে আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টাও চলছে। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ, যেখানে কিছু মানুষকে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণ করা জরুরি। এই জোটের তিনটি অংশের আরেকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো গণতন্ত্রের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবজ্ঞা। ধর্মীয় মহাপ্রলয়বাদীদের কাছে ঈশ্বরের আদেশের চেয়ে পৃথিবীর কোনো আইন গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রযুক্তি মহাপ্রলয়বাদীদের কাছে সাধারণ মানুষের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। আর জাতীয়তাবাদী প্রস্তুতিবাদীদের কাছে মাতৃভূমিকে আসন্ন ধ্বংস থেকে রক্ষা করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই। তাদের মতে, কেবল ঐতিহ্যগতভাবে স্বীকৃত নাগরিকদের মতামতই গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। এই যুক্তিগুলোই তাদের সব ধরনের নিষ্ঠুরতা ও অপরাধের ন্যায্যতা দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এমনকি নির্বাচনকে প্রভাবিত করা কিংবা নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দেওয়ার চেষ্টাকেও তারা নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বৈধ বলে মনে করতে পারে। আইনের ঊর্ধ্বে থাকার এই মানসিকতা এখন সর্বত্র দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে আইসিইর অভিযান থেকে শুরু করে এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিতে প্রকাশিত ক্ষমতাবানদের আচরণ এবং জাতিসংঘের বিরুদ্ধে বহুমুখী আক্রমণ—সবখানেই এর উপস্থিতি রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বে এই মানসিকতার একটি স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায়। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে হামলার পর তিনি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাকে বাধা দেওয়ার মতো একমাত্র বিষয় হলো তার নিজের নৈতিকতা, নিজের মন। আর কিছুই তাকে থামাতে পারে না।
চতুর্থ ভাগ: আমরা থাকব
শেষ ভাগে আমরা আলোচনা করব সেইসব আন্দোলন নিয়ে, যারা শুধু অন্তিম সময়ের ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করছে না, বরং রাজনীতি করার নতুন পথও তৈরি করছে। আমরা পরিচিত হব সেই মানুষদের সঙ্গে, যারা কাঁদানে গ্যাস ও সশস্ত্র ব্যক্তিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের স্কুল, রাস্তা ও পাড়াকে আইসিইর অভিযান থেকে রক্ষা করছেন। আমরা দেখব, ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে কীভাবে বিশ্বজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে। এই আন্দোলন ইতিমধ্যে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। অনিয়ন্ত্রিত এআই ব্যবহারের প্রশ্নও এখন নির্বাচনী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।আমরা ভেনিসের সেই বাসিন্দাদের কথাও শুনব, যারা জেফ বেজোসের বিয়ের আয়োজনকে কেন্দ্র করে নিজেদের শহরের ওপর অধিকার ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম করেছেন। আরও দেখব নিউইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির বিজয়ের পেছনের রাজনৈতিক কৌশল। কীভাবে তিনি ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া সাধারণ মানুষের একটি অংশকেও বিনামূল্যে গণপরিবহন ও সর্বজনীন শিশুযত্নের মতো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সমর্থকে পরিণত করেছিলেন। এই নতুন রাজনীতির ভিত্তি হলো মানুষের প্রতি এক বিস্তৃত, উদার ও সীমান্ত অতিক্রমী ভালোবাসা। এখানে প্রতিবেশী মানে শুধু একই ধর্ম, বর্ণ কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ নয়। প্রতিবেশী মানে এমন একজন মানুষ, যার জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে আমার নিজের জীবন ও নিরাপত্তা জড়িয়ে আছে। এই রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো নিজের বসবাসের জায়গার প্রতি গভীর ভালোবাসা। আমাদের বৈচিত্র্যময়, প্রাণবন্ত শহরগুলোর প্রতি ভালোবাসা। বিপন্ন নদী, বন ও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা। এটি এমন এক রাজনীতি, যেখানে পৃথিবী ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নেই। নিজের শরীর ও জীবন্ত পৃথিবীকে অতিক্রম করে অন্য কোনো কৃত্রিম জগতে আশ্রয় নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাও নেই। বরং আছে এই পৃথিবীতেই থেকে যাওয়ার এবং যা কিছু সুন্দর, জীবন্ত ও অপরিবর্তনীয়, সেগুলোকে রক্ষা করার গভীর ইচ্ছা। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইহুদি শ্রমিকদের ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগঠন বান্ডের রাজনৈতিক ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা এই রাজনীতির নাম দিয়েছি—হিয়ারনেস বা এখানেই থাকার রাজনীতি। পাড়া-মহল্লায়, বাড়ির পর বাড়িতে, ছোট ছোট যোগাযোগগোষ্ঠীতে প্রতিবেশীরা যে মানবিক নেটওয়ার্ক তৈরি করছেন, তা শুধু প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধের জন্য নয়। ক্রমাগত সংকট ও বিপর্যয়ের এই সময়ে এসব নেটওয়ার্ক এক নতুন ধরনের বেঁচে থাকার ভিত্তিও তৈরি করছে। ফ্যাসিবাদীরা যেমন অল্প কয়েকজনের জন্য দুর্গ তৈরি করছে, তেমনি এই মানুষগুলো এমন এক সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলছেন, যার মূলনীতি হলো—কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই প্রত্যেক মানুষের বেঁচে থাকা ও ভালোভাবে জীবনযাপন করার অধিকার রয়েছে।তাদের কাছে ভবিষ্যতের বিপর্যয়ের সময় একে অপরকে নিরাপদ রাখা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এক পবিত্র কর্তব্য। অন্তিম সময়ের ফ্যাসিবাদের কেন্দ্রে রয়েছে লাগামহীন ক্ষমতা ও সম্পদের কেন্দ্রীভবন থেকে জন্ম নেওয়া এক গভীর সংকট।অর্থ, তথ্যপ্রযুক্তি ও অস্ত্রশক্তির বিপুল অংশ অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা তাদের এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে তারা নিজেদের সিদ্ধান্তের পরিণতি নিয়ে আর ভাবতে বাধ্য বোধ করে না।তারা এমন ঝুঁকি নিচ্ছে, যা গোটা সমাজ এবং অসংখ্য প্রাণীপ্রজাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে আমাদের বুঝতে হবে, সমস্যার মূল কারণ সাধারণ মানুষ নয়। সমস্যা হলো সেই ব্যবস্থা, যা এত বিপুল ক্ষমতা ও সম্পদ অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছে। এই কারণেই বইয়ের শেষ অংশে আমরা একটি নতুন ধরনের নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলনের ধারণা তুলে ধরব।
এটি শুধু পারমাণবিক অস্ত্র কমানোর আন্দোলন নয়। এর লক্ষ্য হবে সমাজে কেন্দ্রীভূত বিপজ্জনক ক্ষমতার উৎসগুলোকে ভেঙে দেওয়া এবং ক্ষমতা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ আবার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। ডুমসডে ক্লকের কাঁটা উল্টো দিকে ঘোরানোর আর কোনো পথ নেই। আমরা জানি, এই কাজ সহজ হবে না। আমাদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতায় রয়েছে কয়েক দশকের সামাজিক আন্দোলন। আমরা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনে অংশ নিয়েছি, ডেট কালেকটিভ প্রতিষ্ঠা করেছি এবং গ্রিন নিউ ডিলের দাবিতে সংগঠিত হয়েছি। গণতন্ত্র ও তার শত্রুদের নিয়ে বই লিখেছি, ফ্যাসিবাদের ইতিহাস পড়িয়েছি। গণআন্দোলন গড়ে তোলার কঠিন বাস্তবতা আমাদের অজানা নয়। কিন্তু আমরা এটাও জানি, গণআন্দোলন স্বৈরশাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ব্রাজিল—সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে জনগণের আন্দোলন সম্ভাব্য ফ্যাসিবাদী শাসকদের ক্ষমতায় আসার পথ রুদ্ধ করেছে। ইতিহাসের এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হলে প্রথমে জানতে হবে, ফ্যাসিবাদের জন্ম কোথা থেকে। আমাদের যাত্রা শুরু হবে সেখান থেকেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









