কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের আস্তানা ও বন্দিশালা গুড়িয়ে দিতে আবারও সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে যৌথবাহিনী। শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা-নয়াপাড়া পাহাড়ি এলাকায় এ অভিযান শুরু হয়। দীর্ঘ তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই অভিযানে পাহাড়ি আস্তানা থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।
সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই সমন্বিত অভিযানে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাব এবং পুলিশের শতাধিক সদস্য অংশ নেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে একই পাহাড়ে যৌথবাহিনীর অভিযানে একটি সুড়ঙ্গ ও বন্দিশালা থেকে ৫৬ জন জিম্মিকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। তবে অভিযান চলাকালে পাচারকারী চক্রের সদস্যদের অতর্কিত গুলিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক মোহাম্মদ তিতাস শেখ (২৭) বীরত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে নিহত হন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফরিদপুরের নগরকান্দায় তাঁর নিজ গ্রামে তাঁকে দাফন করা হয়।
এদিকে গত শুক্রবার টেকনাফ মডেল থানা প্রাঙ্গণে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জন ভুক্তভোগীকে তাঁদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ছয়জন রোহিঙ্গা ও ৫০ জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন।
পাহাড়ে নতুন করে একাধিক মরদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় এলাকাবাসী ও ক্যাম্পের মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম জানান, গত কয়েকদিনের দুই পক্ষের গোলাগুলির ঘটনায় কয়েকজন হতাহত হয়ে থাকতে পারেন। তবে নিহত ব্যক্তিরা মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য, নাকি বন্দিশালা থেকে পালানোর সময় শিকার হওয়া কোনো ভুক্তভোগী, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। বন্দিশালার কাছাকাছি এলাকায় তিনটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
উদ্ধার হওয়া অন্য এক ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান মানবপাচার চক্রের লোমহর্ষক প্রতারণা ও বন্দিদশার বর্ণনা দিয়ে জানান, ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে কক্সবাজারে ডেকে নেওয়া হয়। এরপর কৌশলে পাহাড়ের গোপন আস্তানায় জিম্মি করে রাখা হয়। সেখানে একটানা আট দিন বন্দি ছিলেন তিনি। ওই আস্তানায় ৫০ জনেরও বেশি মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল এবং তাঁদের সাগরপথে অবৈধভাবে বিদেশে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। অস্ত্রধারী পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা সার্বক্ষণিক আস্তানাটি পাহারা দিত এবং বন্দিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাত।
অন্যদিকে, পাহাড়ে একের পর এক সামরিক অভিযান, গোলাগুলি ও সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় পাহাড়ঘেঁষা লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যাম্পটির একটি বড় অংশ পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে প্রায় তিন থেকে চার হাজার মানুষ বসবাস করেন। আকস্মিক এসব ঘটনায় তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি নবী হোসেন বলেন, পাহাড়ের খুব কাছেই আমাদের হাজার হাজার মানুষের বসতি। গত কয়েক দিন ধরে চলা যৌথবাহিনীর অভিযান ও গোলাগুলির বিকট শব্দে সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্ক ও ভীতিতে দিন কাটাচ্ছেন। ক্যাম্পের বাসিন্দা মরিয়ম খাতুন (৫০) জানান, সকাল থেকেই পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা ও চলাচল লক্ষ্য করা গেছে।
এ বিষয়ে টেকনাফ পরিদর্শনকালে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, "যত দিন পর্যন্ত সাগরপথে মানবপাচার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলবে, তত দিন আমাদের এই কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাহাড়ে মরদেহ উদ্ধারের খবর আমরা শুনেছি; তবে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহগুলো পুরোপুরি উদ্ধার না করা পর্যন্ত এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা যাচ্ছে না।"


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









