সন্ধ্যা নামতেই হাজারো প্রদীপের আলোয় ঝলমল করে উঠেছে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী আদি মহাশ্মশান। সারি সারি প্রদীপের আলোয় আলোকিত সমাধি, ফুলের সাজ, প্রার্থনা আর পূজা-অর্চনা। কেউ প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন, কেউ ফুল দিয়ে সাজাচ্ছেন প্রয়াত স্বজনের সমাধি। আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণ করছেন প্রিয়জনের। আলো আর আবেগের এমন মেলবন্ধনে বরিশালের মহাশ্মশানে উদ্যাপিত হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আয়োজন শ্মশান দীপাবলি।
প্রতি বছরের মতো এবারও এ আয়োজন ঘিরে বরিশালের আদি মহাশ্মশানে নেমেছে মানুষের ঢল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ করতে ছুটে এসেছেন পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন। তাদের পাশাপাশি উৎসবের আবহ দেখতে ভিড় করছেন নানা বয়সী দর্শনার্থী। হাজারো প্রদীপের আলোয় মহাশ্মশান পরিণত হয়েছে এক আবেগঘন মিলনস্থলে।

শ্মশান দীপাবলিতে স্বজনদের সমাধি ও স্মৃতিস্তম্ভ পরিষ্কার করে ফুলে সাজানো হয়। এরপর সেখানে জ্বালানো হয় প্রদীপ ও মোমবাতি। প্রার্থনা, পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় মন্ত্র পাঠের মধ্য দিয়ে প্রয়াতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন স্বজনেরা। কেউ কেউ প্রিয়জনের পছন্দের খাবারও নিবেদন করেন। এ যেন মৃত্যুর পরও প্রিয় মানুষকে ভুলে না যাওয়ার এক অনন্য আয়োজন।
দীপাবলি বা দীপালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান আলোর উৎসব। 'দীপ' অর্থ প্রদীপ আর ‘আবলি’ অর্থ সারি। অর্থাৎ প্রদীপের সারি থেকেই দীপাবলি নামের উৎপত্তি। অন্ধকারের ওপর আলোর, অশুভের ওপর শুভের এবং অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ উৎসব পালিত হয়। অঞ্চলভেদে এর ধর্মীয় আচার ও উদ্যাপনে রয়েছে ভিন্নতা। বাংলায় দীপাবলির সঙ্গে কালীপূজা ও ভূত চতুর্দশীর বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।
বরিশালের শ্মশান দীপাবলির ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। স্থানীয় ঐতিহ্য ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৮৫০ সাল থেকে নগরীর আদি শ্মশানঘাট ও কাউনিয়া মহাশ্মশানে এ আয়োজনের প্রচলন রয়েছে। দেড় শতাধিক বছরের এই ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছেন বরিশালের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রয়াত স্বজন ও পূর্বপুরুষদের স্মরণে শ্মশানে প্রদীপ জ্বালানোই এ আয়োজনের মূল বৈশিষ্ট্য।

শ্মশান দীপাবলি শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়, এটি স্মৃতি, ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনেরও এক অনন্য প্রকাশ। জীবনের নানা পর্যায়ে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মরণ করতে এদিন একত্র হন পরিবারের সদস্যরা। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও পারিবারিক ইতিহাস। ফলে এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে শ্রদ্ধাবোধ, মানবিকতা ও ঐতিহ্যের শিক্ষা।
প্রিয়জনের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে অনেকেই ফিরে যান অতীতের স্মৃতিতে। কারও চোখে অশ্রু, কারও মুখে প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো সময়ের গল্প। প্রদীপের আলোয় যেন আবারও জীবন্ত হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্মৃতি। এখানে আনন্দের উৎসবের পাশাপাশি রয়েছে বিচ্ছেদ, ভালোবাসা ও না-পাওয়ার এক গভীর অনুভূতি।
এদিকে, শ্মশান দীপাবলি উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রদীপের আলো, ফুলের সুবাস, ধর্মীয় প্রার্থনা আর স্বজনদের স্মৃতিচারণে বরিশালের আদি মহাশ্মশানে তৈরি হয়েছে এক ব্যতিক্রমী আবহ। হাজারো প্রদীপের প্রতিটি শিখা যেন বলে যায়—মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা ও স্মৃতির আলো কখনো নিভে যায় না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









