শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৬ চৈত্র ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

অরক্ষিত শৈলকুপার চড়িয়া লালন সাঁই প্রতিষ্ঠিত আখড়াবাড়ি

প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম

আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম

অরক্ষিত শৈলকুপার চড়িয়া লালন সাঁই প্রতিষ্ঠিত আখড়াবাড়ি

কুষ্টিয়ার কুমারখালির কালী নদীর পাড়ের ছেঁউড়িয়া নয়, কুমার নদবিধৌত ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার চড়িয়া, অধুনা চরচড়িয়া গ্রামে ফকির লালনের নিজ হাতে গড়া আখড়াবাড়ির অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে মাজারে শায়িত বাউল ফকিরদের কবরগুলো। লালন ফকিরের জীবদ্দশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আখড়াবাড়ি থাকলেও বেশিরভাগ আখড়ার কর্মকাণ্ড নানাবিধ বাধা-বিপত্তি ও সংকটে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অরক্ষিত ঝিনাইদহের শৈলকুপার চড়িয়া গ্রামের লালন আখড়াবাড়িতেও নেই অনুসারীদের আনাগোনা, গান-বাজনা ও স্মরণ আয়োজন।

ফকিরি গান আখড়ানির্ভর গান। এ গানগুলো আখড়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এসব বাউল ফকিরদের জন্য বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠে আখড়া বা গান-বাজনার আড্ডাখানা। লালনপন্থের সাধকরা কেবল ছেঁউড়িয়ার ভাণ্ডারা উপলক্ষে জমায়েত হতেন তা নয়; আশপাশের বিভিন্ন জেলা—রাজশাহী, পাবনা, ফরিদপুর, যশোর, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ—সর্বত্র তাদের আখড়া ছিল। সর্বত্র ভাণ্ডারা বা মহোৎসব হতো। সর্বত্র সাঁইজিকে দর্শন দিতে হতো, গান শোনাতে হতো।

লালন সাঁইয়ের অনেকগুলো আখড়াবাড়ি থাকলেও উল্লেখযোগ্য আখড়ার একটি ছিল ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানাধীন আলমডাঙ্গা বাজারের নিকট চড়িয়া গ্রামে। আখড়াটি ‘আলমডাঙ্গার আখড়া’ নামে সমধিক পরিচিত। ১৮৮১-১৮৮২ সালে মোট তিনটি কবুলিয়ত ও তিনটি পাট্টা সম্পাদিত হয়। তার প্রত্যেকটিতে ‘শ্রী লালন সাঁই’-এর স্বাক্ষর বিদ্যমান।

মাওলানাদের মধ্যে সুদূর কলকাতা থেকে একজন উচ্চশিক্ষিত মাওলানা শুকুর মোহাম্মদ সাহেবকে দাওয়াত করে আনা হয়। ধর্মসভা শেষে পরদিন জমায়েত কমিটির সদস্যরা তাঁকে ফকির লালন সাঁইয়ের খানকায় যেতে অনুরোধ করেন। উদ্দেশ্য ছিল—ফকির যে ধর্মমত প্রচার করছেন তা সঠিক কি না যাচাই করা; কারণ তিনি মসজিদেও যান না, মন্দিরেও নয়। মাওলানা প্রথমে রাজি হননি। পরে সকলের অনুরোধে তাঁকে যেতে হয় লালন সাঁইয়ের আখড়ায়।

ভোলাই শাহ আগত অতিথিদের বসতে দিয়ে সাঁইজিকে খবর দেন। কিছুক্ষণ পর সাঁইজি মুখে পান দিয়ে বেরিয়ে আসেন। তিনি প্রথমেই ফারসি ভাষায় সম্ভাষণ জানান এবং মাওলানার পরিচয় জানতে চান। মাওলানা সাহেবও ফারসি ভাষায় জবাব দেন। এভাবে প্রায় ২০-২৫ মিনিট তাঁদের মধ্যে কথোপকথন হয়। অতঃপর মৃদু হেসে করমর্দন করে মাওলানা বিদায় নেন। পথে সঙ্গীরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওনার পথে তিনি ঠিক আছেন, আপনারা আপনাদের পথে সঠিক থাকবেন।

লালন শাহ এই আখড়ায় বসেই নানা তত্ত্বগান রচনা করেছেন এবং শিষ্যদের তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে শিক্ষা দিয়েছেন। মাওলানাদের সঙ্গে একবার এখানেই বাহাস হয়েছিল বলে জানা যায়। তিনি আখড়ার দায়িত্ব দেন তাঁর ঘনিষ্ঠ শিষ্য শাকের সাঁই, ওরফে শুকুর শাহকে। শুকুর শাহের কৌলিক উপাধি ছিল মোল্লা (পরে শাহ)। তাঁর পিতার নাম নযীবুল্লাহ মোল্লা। প্রথম জীবনে তিনি কুলবাড়িয়া গ্রামের সাবান আলী নামক এক পীরের মুরিদ হন। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, তিনি প্রবেশিকা পাস করে কলকাতায় একটি মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে লালন শাহের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন।

তৎকালীন কলকাতা থেকে আগত মাওলানা শুকুর মোহাম্মদ আলোচনায় মুগ্ধ হয়ে ফকির লালন সাঁইজির হাতে বায়াত নেন। শৈলকুপা থানাধীন চরচড়িয়া গ্রামে সাঁইজির বহু ভক্ত ছিল। তিনি সেখানে দ্বিতীয় আখড়াবাড়ি নির্মাণ করে শুকুর মোহাম্মদকে ‘সাকের শাহ’ নাম দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং নিজেও মাঝে মাঝে ঘোড়ায় চড়ে সেখানে যাতায়াত করতেন।

ঝিনাইদহের শৈলকুপার আলমডাঙ্গা বাজারের নিকটে এই আখড়া থাকার কারণে এ অঞ্চলে লালনের শুধু আসা-যাওয়া নয়, নানা বাহাসেও তিনি অংশ নিয়েছেন। লালনের এই আখড়ার প্রমাণ মেলে ১৮৭৬ সালে রচিত ‘জালালাতো ফোকরা’ গ্রন্থে।

জনশ্রুতি আছে, এখানে লালন ফকির ঘোড়ায় চড়ে আসতেন। চড়িয়া আখড়ায় বসত সাধুসঙ্গ ও লালন ভাবধারায় ধর্মোপাসনা অনুষ্ঠিত হতো। অনুসন্ধানে দেখা যায়, জমি রয়েছে লালন ফকিরের নামে, শুধু হারিয়ে গেছে আখড়া।

একশতক জমিতে বর্তমানে কলাগাছ লাগানো হয়েছে। দূর থেকে দেখে মনে হবে এটি কোনো চাষাবাদের মাঠ। অথচ এই স্থানেই একসময় ছিল বাউল সম্রাট লালন ফকিরের আখড়া। সংরক্ষণের অভাবে অযত্নে-অনাদরে আখড়াটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবশিষ্ট আছে শুধু তাঁর শিষ্যদের কবর।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে নিয়মিত গান-বাজনা হতো এবং বিভিন্ন স্থান থেকে লালন ভক্তরা আসতেন। কিন্তু শুকুর শাহের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

বর্তমানে আখড়ার তদারকির দায়িত্বে আছেন শুকুর শাহের বংশধরেরা। তাদের দাবি, একসময় লালন ফকিরের নামে প্রায় ১০০ বিঘা জমি ছিল, যা এখন বেদখল হয়ে গেছে। সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।

লালন ফকিরের এই আখড়াটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ সংরক্ষণ না হলে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের এই স্মৃতি এবং বাউল সাধনার ইতিহাস একসময় হারিয়ে যাবে।

টিআর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.