বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে ঘিরে দেশজুড়ে চলছে প্রস্তুতির শেষ মুহূর্ত। গোপালগঞ্জেও বসতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। আর এই মেলাকে সামনে রেখে জেলার বিভিন্ন কুমারপাড়ায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। বছরের বেশিরভাগ সময় লোকসানের মুখে থাকলেও, বৈশাখ এলেই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন তারা।
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার হিরণ এলাকার কুমারপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে মাটির কাজ। কেউ মাটি কাদায় মিশিয়ে তৈরি করছেন হাঁড়ি-পাতিল, কেউবা রং-তুলির আঁচড়ে সাজাচ্ছেন পুতুল, ব্যাংক, ফুলদানি ও বিভিন্ন খেলনা। বৈশাখী মেলায় পসরা সাজাতে এখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা।
পাল সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ মিলে একযোগে কাজ করছেন। সংসারের কাজ সামলে নারীরাও সমানতালে যুক্ত হয়েছেন এই শিল্পে। শিশুদেরও দেখা যায় পরিবারের সঙ্গে কাজ করতে।
স্থানীয় মৃৎশিল্পী শিবু পাল বলেন, “সারা বছর তেমন বিক্রি থাকে না। কিন্তু বৈশাখ এলেই আমরা নতুন করে আশা পাই। এই সময়টাতে যা বিক্রি হয়, তা দিয়েই সারা বছর চলে।”
আরেক নারী কারিগর মালতি রানী পাল বলেন, “সকালে ঘরের কাজ শেষ করে আমরা কাজে বসি। দিন-রাত পরিশ্রম করি। বৈশাখের আগে ঘুমানোর সময়ও পাই না। কিন্তু এই কষ্টটাই আমাদের বাঁচার ভরসা।”
তরুণ কারিগর রবিন পাল জানান, “আমরা পড়ালেখার পাশাপাশি বাবা-মায়ের সঙ্গে এই কাজ করছি। হাঁড়ি, পাতিল, ফুলদানি, ঘোড়াসহ মাটি দিয়ে বিভিন্ন খেলনা তৈরি করছি। বৈশাখী মেলায় এগুলো নিয়ে বিক্রি করব।”
প্রবীণ মৃৎশিল্পী নিতাই পাল বলেন, “আগে মাটির জিনিসের অনেক কদর ছিল। এখন প্লাস্টিকের কারণে চাহিদা কমে গেছে। তবুও আমরা চেষ্টা করছি নতুন ডিজাইন এনে মানুষকে আকৃষ্ট করতে।”
একই কথা বলেন অভিজ্ঞ কারিগর সুধাংশু পাল, “আমাদের পূর্বপুরুষের পেশা এটি। অনেকেই এখন এই কাজ ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমরা চাই এই ঐতিহ্য টিকে থাকুক।”
স্থানীয় আরেক নারী মৃৎশিল্পী রিনা পাল বলেন, “আমরা চাই সরকার আমাদের একটু সহযোগিতা করুক। সহজ ঋণ আর প্রশিক্ষণ পেলে আমরা আরও ভালো কিছু করতে পারতাম।”
মৃৎশিল্পীদের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলে যাওয়ায় এবং প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের সহজলভ্যতার কারণে মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে লাভ কমে যাওয়ায় অনেকেই বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
তবে যারা এখনো টিকে আছেন, তারা শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দাবি, এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), গোপালগঞ্জের সহকারী মহাব্যবস্থাপক একেএম কামরুজ্জামান বলেন, “মৃৎশিল্পীদের জন্য আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নিচ্ছি। পাশাপাশি স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগও রয়েছে, যাতে তারা ন্যায্য মূল্য পান।”
কুমারপাড়ার এই কর্মচাঞ্চল্য শুধু ব্যবসার গল্প নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার এক নীরব সংগ্রাম। প্রযুক্তির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকলেও, পহেলা বৈশাখ এলেই নতুন করে স্বপ্ন দেখেন গোপালগঞ্জের মৃৎশিল্পীরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









