একটি সিনেমা শেষ হলো। পর্দা অন্ধকার হয়ে গেল। তারপরও মানুষ উঠল না। কেউ কথা বলল না। শুধু করতালি। একটানা ২৫ মিনিট ধরে হলে শুধু করতালি শোনা গেল।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে এমনই এক দৃশ্যের জন্ম হলো। গাজায় ইসরায়েলের এআই-নির্ভর হত্যাযজ্ঞ নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘নাজা’-র প্রদর্শনী শেষে দর্শকের এই দীর্ঘ করতালি উৎসবটির ইতিহাসে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে গাজা নিয়ে নির্মিত আরেকটি চলচ্চিত্র ২৩ মিনিটের করতালি পেয়েছিল।
‘নাজা’ নির্মাণ করেছেন অস্কারজয়ী ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সজোর। প্রায় তিন বছর ধরে তাঁরা তথ্যচিত্রটির জন্য অনুসন্ধান করেছেন। কথা বলেছেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জন সাবেক কর্মকর্তা ও হুইসেলব্লোয়ারের সঙ্গে। তাঁদের পরিচয় গোপন রাখতে কণ্ঠ ও চেহারায় ডিজিটাল পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আব্রাহামের কথায়, তারা খুব সহজ একটি কাজ করতে চেয়েছিলেন—গাজায় হত্যার যন্ত্রগুলো কীভাবে কাজ করে, তা যতটা সম্ভব বিস্তারিতভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা।
৮০ মিনিটের ছবিটি দেখার পর অনেক দর্শকই যেন কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। কারণ ছবির গল্প কল্পিত নয়। কথা বলেছেন সেই মানুষগুলো, যারা কোনো না কোনোভাবে ওই ব্যবস্থার ভেতরে ছিলেন।

যেন একটি কারখানা
‘নাজা’ নামটিও এসেছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি শব্দ থেকে। কোনো বিমান হামলায় কতজন বেসামরিক মানুষ মারা যেতে পারেন—তার একটি আনুমানিক হিসাব বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়। তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে ‘লেভেন্ডার’ নামে পরিচিত একটি এআই-নির্ভর ব্যবস্থা। অভিযোগ অনুযায়ী, গাজায় নজরদারি থেকে পাওয়া বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে এই ব্যবস্থা হত্যার জন্য সম্ভাব্য লক্ষ্য চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে।
গাজার ফোনকল, চলাফেরা, যোগাযোগ—মানুষের জীবনের অসংখ্য ছোট ছোট তথ্য সেখানে জমা হয়। তারপর সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় লক্ষ্যবস্তুর তালিকা। একজন সাবেক কর্মী বলেছেন, কাজটি এত বড় পরিসরে করা হয়েছিল যে তাঁর কাছে পুরো বিষয়টিকে একটি ‘কারখানা’র মতো মনে হতো।
আরেকজন বলেছেন, দূর থেকে সবকিছু করা হয় বলে পুরো ব্যাপারটি অনেকটা ভিডিও গেমের মতো মনে হতো। এমনকি কেউ কেউ সেই অভিজ্ঞতাকে ‘ভয়ংকরভাবে আনন্দদায়ক’ বলেও বর্ণনা করেছেন। শুনতে অদ্ভুত লাগে। কিন্তু যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হয়তো এখানেই—দূরত্ব বাড়লে মানুষের মৃত্যু কখনো কখনো কেবল একটি সংখ্যা হয়ে যায়।
গাজার আরেকটি গল্প
ইসরায়েলের গাজা অভিযান নিয়ে তথ্যচিত্রটি তৈরি হলেও এর গল্প শুধু যুদ্ধের নয়। এতে উঠে এসেছে বেসামরিক মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস, যুদ্ধ ও মানবিক আইনের প্রতি অবহেলা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি ঘৃণার একটি বিস্তৃত পরিবেশের অভিযোগ।
গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে।
তথ্যচিত্রটির নির্মাতারা আশা করছেন, ছবিটি পশ্চিমা দেশগুলোর দর্শকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রতি রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের বিষয়ে। আব্রাহামের ভাষায়, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের ভেতরে যারা পরিবর্তনের জন্য কাজ করছেন, তাদের বাইরের বিশ্বের সহযোগিতা প্রয়োজন। নিষ্ক্রিয়তা তাদের আরও দুর্বল করে দেয়।
ইসরায়েল অবশ্য গাজায় ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, হামাস ঘনবসতিপূর্ণ এই ভূখণ্ডের সাধারণ মানুষের মধ্যে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে।

ভেনিসে গাজার উপস্থিতি
এবারের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে ‘নাজা’ একমাত্র তথ্যচিত্র। উৎসব শেষ হবে শনিবার। তথ্যচিত্রটির নির্মাতা আব্রাহাম ও সজোর এর আগে ফিলিস্তিনি নির্মাতা বাসেল আদরা ও হামদান বাল্লালের সঙ্গে ‘নো আদার ল্যান্ড’ ছবির জন্য ২০২৫ সালে অস্কার জিতেছিলেন। ছবিটিতে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার গল্প তুলে ধরা হয়েছিল।
‘নাজা’ প্রযোজনা করেছেন ব্রিটিশ প্রযোজক জিম উইলসন। ছবির সঙ্গে যুক্ত আছেন অস্কারজয়ী ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস’-এর নির্মাণ দলের সদস্য জোনাথন গ্লেজার এবং ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য গার্ডিয়ান’। ২০২৫ সালেও ভেনিসে গাজার গল্প দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজবকে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে হত্যার ঘটনা নিয়ে নির্মিত ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’ প্রিমিয়ারের পর ২৩ মিনিটের দাঁড়িয়ে করতালি পেয়েছিল এবং উৎসবে দ্বিতীয় পুরস্কার অর্জন করেছিল।
করতালি অবশ্য কখনো কোনো ছবির গুণমান মাপার নিখুঁত মানদণ্ড নয়। তবু ২৫ মিনিটের সেই শব্দের মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল—গাজার গল্প দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। আর হয়তো সেই কারণেই সিনেমা হল থেকে বের হওয়ার পরও করতালির শব্দটা অনেকক্ষণ থেকে যায়। পর্দা নেমে যায়, আলো জ্বলে ওঠে। কিন্তু কিছু গল্প তখন আর পর্দায় থাকে না। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে বাইরে চলে আসে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









