চিলির অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা সেবাস্তিয়ান লেলিও মারা গেছেন। শুক্রবার ৫২ বছর বয়সে সান্তিয়াগোর নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান জীবনসঙ্গী আমালিয়া কাসাই। তবে মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি।
২০১৭ সালে নির্মিত ‘এ ফ্যান্টাস্টিক ওম্যান’ চলচ্চিত্রের জন্য ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জেতেন লেলিও। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘গ্লোরিয়া’, ‘গ্লোরিয়া বেল’, ‘ডিসওবিডিয়েন্স’ ও ‘দ্য ওয়ান্ডার’। তার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন জুলিয়ান মুর, র্যাচেল ওয়েইজ ও ফ্লোরেন্স পিউয়ের মতো তারকারা। মৃত্যুর আগে তিনি ‘পোয়েতা চিলেনো’ নামে নতুন একটি চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করেছিলেন।

চিলির চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে গত দুই দশকে সৃজনশীলতার এক বিস্ময়কর বিকাশ ঘটেছে। সেই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম পাবলো লারাইন, পাত্রিসিও গুজমান ও সেবাস্তিয়ান সিলভা। তাদের চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে অগাস্তো পিনোশের শাসনামলে চিলির মানুষের জীবন, স্বৈরশাসনের ক্ষত এবং সেই সময়ের চাপা পড়ে থাকা অপরাধবোধ ও মানসিক যন্ত্রণা। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট পিনোশে শাসন কমিউনিজমের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও দেশটির মানুষের জীবনে রেখে গেছে গভীর ক্ষত। পরবর্তী সময়ে চিলি গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে এগোলেও অতীতের সেই ট্রমা মানুষের সামষ্টিক স্মৃতিতে রয়ে গেছে।
তবে একুশ শতকের চিলির জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সেবাস্তিয়ান লেলিওর মতো করে পর্দায় তুলে ধরতে পেরেছেন খুব কম নির্মাতাই। তার কিছু চলচ্চিত্র সরাসরি রাজনৈতিক, কিছু আবার আপাতদৃষ্টিতে রাজনীতির বাইরে। কিন্তু সব কাজেই রয়েছে তীব্র আবেগ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং জীবনের প্রতি এক ধরনের প্রতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। সাধারণ মানুষের আনন্দ, ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে যারা সীমাবদ্ধ করতে চায়, লেলিওর চলচ্চিত্র যেন তাদের বিরুদ্ধেই এক নীরব প্রতিবাদ।

২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া তার চলচ্চিত্র ‘গ্লোরিয়া’ এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। চিলির পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী পাউলিনা গার্সিয়া অভিনীত ছবিটি ২০১৮ সালে ইংরেজি ভাষায় ‘গ্লোরিয়া বেল’ নামে পুনর্নির্মাণ করেন তিনি। নতুন সংস্করণে অভিনয় করেন জুলিয়ান মুর।
‘গ্লোরিয়া’ মূলত একজন স্বাধীনচেতা বিবাহবিচ্ছিন্ন নারীর গল্প। বয়স বাড়লেও জীবনকে উপভোগ করার ইচ্ছা তার কমেনি। সঙ্গী খুঁজতে তিনি ঘুরে বেড়ান বিভিন্ন বার ও আড্ডার জায়গায়। তার চাওয়া আনন্দ, শারীরিক ঘনিষ্ঠতা, ভালোবাসা এবং জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া। একপর্যায়ে বয়সে বড়, আকর্ষণীয় এক পুরুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। দুজনের সম্পর্কও এগোতে থাকে। কিন্তু তাদের প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের কারণে সেই সম্পর্ক নানা বাধার মুখে পড়ে।
প্রথম দেখায় সিনেমাটিকে চিলির রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। এমনকি গল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্মাণ করতেও নির্মাতাকে খুব একটা অসুবিধায় পড়তে হয়নি। কিন্তু লেলিও এখানে এমন এক প্রজন্মের নারীর গল্প বলেছেন, যার তারুণ্য কেটেছে পিনোশের স্বৈরশাসনের ছায়ায়। ফলে ছবিটি শুধু মধ্যবয়সী একজন নারীর ভালোবাসা খোঁজার গল্প হয়ে থাকে না। এর ভেতরে রয়েছে স্বাধীনতার স্বাদ, হারিয়ে যাওয়া আনন্দ এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। পশ্চিমা বিশ্বের অন্য অনেক মানুষ যে স্বাধীনতাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে, চিলির সেই প্রজন্মের কাছে তা কি সত্যিই সহজলভ্য ছিল? বয়স বাড়ার পরও কি নতুন করে আনন্দ, ভালোবাসা ও শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সন্ধান সম্ভব? লেলিও ছবিতে এমন প্রশ্নই সামনে এনেছেন।

২০১৭ সালে মুক্তি পায় লেলিওর ইংরেজি ভাষার প্রথম চলচ্চিত্র ‘ডিসওবিডিয়েন্স’। র্যাচেল ওয়েইজ ও র্যাচেল ম্যাকঅ্যাডামস অভিনীত ছবিটির গল্প লন্ডনের একটি রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায়কে ঘিরে। এতে রনিট নামের এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন ওয়েইজ। তিনি একজন রাব্বির মেয়ে। বাবার মৃত্যুর পর এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যেখানে তার দীর্ঘদিনের গোপন সমকামী পরিচয় ও ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। লাতিন আমেরিকার বাইরের এক ভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে নির্মিত হলেও ছবিটিতে লেলিওর নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষা স্পষ্ট। ধূসর ব্রিটিশ আবহ, ধর্মীয় অনুশাসন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সংঘাতের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক বাধার গল্প বলেছেন। পরিচিত ভূগোলের বাইরে গিয়েও মানুষের আবেগকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা যায়, ছবিটি তারই উদাহরণ।
২০২২ সালে মুক্তি পায় তার আরেক ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র ‘দ্য ওয়ান্ডার’। এমা ডোনাহিউর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটিতে অভিনয় করেন ফ্লোরেন্স পিউ। ১৮৬২ সালের আয়ারল্যান্ডের গ্রামীণ এক জনপদ এর গল্পের পটভূমি। সেখানে এক কিশোরী মেয়ে খাবার না খেয়েও দিব্যি সুস্থ আছে বলে দাবি করা হয়। ঘটনাটিকে অলৌকিক বলে মনে করতে শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিষয়টির সত্যতা অনুসন্ধানে সেখানে ডেকে আনা হয় ইংরেজ নার্সকে। কিশোরীর এই না খেয়ে বেঁচে থাকাকে কি সত্যিই ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলা যায়? নাকি অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস করতে মরিয়া প্রাপ্তবয়স্কদের দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছে মেয়েটি? এমন প্রশ্নের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় ছবির গল্প। সাহিত্যনির্ভর এই চলচ্চিত্রে লেলিও দেখিয়েছেন তার নির্মাণদক্ষতা ও গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতা।
তবে লেলিওর সেরা কাজ কোনটি—এমন প্রশ্নে আমার পছন্দ ২০১৭ সালের ‘উনা মুজের ফানতাস্তিকা’, ইংরেজি নাম ‘এ ফ্যান্টাস্টিক ওম্যান’। ছবিটি ২০১৮ সালে সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জেতে। এতে স্পষ্টভাবে দেখা যায় স্প্যানিশ নির্মাতা পেদ্রো আলমোদোভার-প্রভাবিত চলচ্চিত্রভাষার ছাপ।

ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্র মারিনা। অভিনয় করেছেন ট্রান্সজেন্ডার শিল্পী দানিয়েলা ভেগা। মারিনা একজন ট্রান্স নারী। বয়সে বড়, বিবাহবিচ্ছিন্ন এক পুরুষের সঙ্গে তার গোপন সম্পর্ক রয়েছে। মানুষটির প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেও আছে। তাদের সম্পর্কটি নিখুঁত না হলেও দুজনের মধ্যে রয়েছে ভালোবাসা ও সুখের একান্ত জগৎ। কিন্তু হঠাৎ সেই পুরুষের মৃত্যু হলে মারিনার জীবনে নেমে আসে নির্মম বাস্তবতা। প্রিয় মানুষটির মৃত্যুতে শোক প্রকাশের অধিকারটুকুও যেন তার নেই। মৃত ব্যক্তির সঙ্গী হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে গেলেও বাধার মুখে পড়তে হয় তাকে। ট্রান্সবিদ্বেষী সমাজ তাকে এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করতে থাকে, যেন তার কোনো অস্তিত্বই নেই। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে মারিনা ক্রমে নিজেকে গুটিয়ে নেয় এক স্বপ্নময়, বিভ্রমে ভরা জগতে। শোক, অপমান, একাকিত্ব এবং নীরব প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় তার জীবন। লেলিও এখানে শোককে কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি হিসেবে দেখেননি; দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজের বৈষম্য একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা ও ভালোবাসার অধিকার কেড়ে নিতে পারে।
সিনেমাটির বেদনা অনেকটা মঞ্চনাটকের মতো তীব্র, আবার কোথাও যেন মেলোড্রামার আবহ তৈরি করে। কিন্তু সেই আবেগ কখনো কৃত্রিম মনে হয় না। মারিনার নিঃসঙ্গতা ও প্রতিবাদ দর্শককে গভীরভাবে স্পর্শ করে। ‘গ্লোরিয়া’ ও ‘গ্লোরিয়া বেল’-এর সঙ্গে এই ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। তিনটি ছবিতেই লেলিও এমন মানুষের গল্প বলেছেন, যারা সমাজের প্রচলিত ধারণা ও প্রত্যাশার বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মতো করে ভালোবাসতে এবং বাঁচতে চায়।
সেবাস্তিয়ান লেলিও ছিলেন অসাধারণ মানবতাবাদী এক চলচ্চিত্র নির্মাতা। সাধারণ মানুষের জীবনের ছোট ছোট আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, বেদনা, স্বাধীনতা ও প্রতিবাদকে তিনি পর্দায় তুলে ধরেছেন গভীর আবেগ ও কাব্যিক সৌন্দর্যে। তার চলচ্চিত্রে ব্যক্তিগত জীবনের গল্প কখনো রাজনীতির বাইরে থাকে না; বরং মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্য দিয়েই উঠে আসে বৃহত্তর সমাজের ছবি। এই কারণেই লেলিও শুধু একজন দক্ষ গল্পকার নন, তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের এক অসাধারণ চলচ্চিত্র-কবি।

পরিচিতি
সেবাস্তিয়ান লেলিও চিলির খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক। ১৯৭৪ সালের ৮ মার্চ আর্জেন্টিনার মেন্দোসায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দুই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে চিলিতে চলে যান। চিলির চলচ্চিত্র বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়। ২০০৫ সালে ‘লা সাগ্রাদা ফামিলিয়া’ দিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। ‘গ্লোরিয়া’ (২০১৩) তাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। ২০১৭ সালে নির্মিত ‘এ ফ্যান্টাস্টিক ওম্যান’ চলচ্চিত্রের জন্য ২০১৮ সালে অস্কার জেতেন তিনি। ‘ডিসওবিডিয়েন্স’, ‘গ্লোরিয়া বেল’ ও ‘দ্য ওয়ান্ডার’ তার উল্লেখযোগ্য কাজ। ২০২৬ সালের ৬ নভেম্বর ৫২ বছর বয়সে মারা যান এই নির্মাতা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









