ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মিসরীয় সংগীতশিল্পী তামের আবু গাজালেহ আরব বিশ্বের স্বাধীন সংগীত আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তিনি শুধু একজন গায়ক, সুরকার কিংবা বহু বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী সংগীতজ্ঞ নন; একই সঙ্গে সংগঠক, প্রযোজক এবং স্বাধীন সংগীতের জন্য বিকল্প পরিসর তৈরির একজন উদ্যোগী মানুষ। কায়রোর স্বাধীন সংগীতজগতকে এগিয়ে নিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘একা৩’ প্ল্যাটফর্ম এবং এর সহযোগী সংগীত লেবেল ‘মোস্তাকেল’ । তার নিজের সংগীত যেমন প্রচলিত ধারার বাইরে নতুন ভাষা খোঁজে, তেমনি তার প্রযোজনা ও সাংগঠনিক উদ্যোগও আরব সংগীতের প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে প্রশ্ন করে।
বার্লিনে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সংগীতদল আলিফের সফরের সময়। দলটির সদস্যরা এসেছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। তামেরের সঙ্গে রয়েছেন ইরাকি-ব্রিটিশ উদবাদক খাইয়াম আল্লামি, মিসরীয় ইলেকট্রনিক সংগীতশিল্পী মরিস লুকা, লেবানিজ পারকাশনবাদক খালেদ ইয়াসিন এবং বেজবাদক বাশার ফাররান। তাদের সংগীতের মধ্যে যেমন ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রমের চেষ্টা রয়েছে, তেমনি রয়েছে আরব বিশ্বের বিচিত্র সংগীত ঐতিহ্যকে সমকালীন ভাষায় প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা।
সাউন্ডচেকের আগে তামেরের সঙ্গে কথা বলেছিলেন সংগীত সাংবাদিক এরিক ম্যান্ডেল। আলোচনায় উঠে এসেছিল তার অ্যালবাম থুলথেইং, আলিফ, মোস্তাকেল, কায়রোর আন্ডারগ্রাউন্ড সংগীত, স্বাধীন সংগীত প্রযোজনার সংকট এবং দ্রুত বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন সংগীতশিল্পীর ভূমিকা।
এরিক ম্যান্ডেল: আলিফ কীভাবে তৈরি হলো?
তামের আবু গাজালেহ: ২০১২ সালে আমরা দলটি গঠন করি। আমাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব সংগীতচর্চা ও আলাদা প্রকল্প ছিল। একসময় মনে হলো, সবাই মিলে একসঙ্গে কিছু করার চেষ্টা করা যেতে পারে। কয়েকটি রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে একসঙ্গে কাজ করলাম। সেখানকার অভিজ্ঞতা ভালো লাগায় দল হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। গত বছর আমাদের অ্যালবাম ‘হোয়াটএভার ইট ফলস’প্রকাশিত হয়েছে।
এরিক ম্যান্ডেল: আলিফ কি মিসরীয় ব্যান্ড?
তামের আবু গাজালেহ: একেবারেই নয়। এটি গোটা অঞ্চল থেকে আসা সংগীতশিল্পীদের একটি দল। আমি ফিলিস্তিনি, মরিস মিসরীয়, বাশার ও খালেদ লেবানিজ, আর খাইয়াম ইরাকি-ব্রিটিশ। শুরু থেকেই আমাদের ভাবনাটা ছিল সীমান্তের ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা। কার সঙ্গে সংগীত করতে চাই, সেই সিদ্ধান্ত যেন কোনো দেশের সীমানা দিয়ে নির্ধারিত না হয়।এতে সুবিধা যেমন আছে, অসুবিধাও কম নয়। পছন্দের সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার স্বাধীনতা পাওয়া যায়, কিন্তু সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করা কঠিন। রিহার্সাল বা অনুষ্ঠান করতে গেলেও নানা ধরনের আয়োজন করতে হয়। এমনকি নিজেদের দেশেও একসঙ্গে বাজাতে গেলে কখনো বিমানে করে যাতায়াত করতে হয়। মিসরে অনুষ্ঠান করতে হলেও লেবানন থেকে কাউকে উড়ে আসতে হয়।
এরিক ম্যান্ডেল: মিসর ও লেবাননের সংগীতশিল্পীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান রয়েছে। এর পেছনে কারণ কী বলে মনে করেন?
তামের আবু গাজালেহ: ঐতিহাসিকভাবে গত ষাট বছরে আরব অঞ্চলের প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল কায়রো ও বৈরুত। শুধু সংগীত নয়, সাহিত্য, শিল্পকলা, গণমাধ্যম—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই দুই শহরের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। আঞ্চলিক অনেক টেলিভিশন চ্যানেলের কেন্দ্রও মিসর কিংবা লেবাননে। ফলে দুই দেশের শিল্পীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। জর্ডান, ফিলিস্তিন, তিউনিসিয়া ও মরক্কোর শিল্পীরাও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সক্রিয় হচ্ছেন। ইন্টারনেটের বিস্তারের ফলে কায়রোয় বসেই মরক্কোর কোনো সংগীতশিল্পীর কাজ শোনা যাচ্ছে, তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে। দশ বছর আগেও এই যোগাযোগ এত সহজ ছিল না। তখন আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের বড় অংশই মিসর ও লেবাননকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো।
এরিক ম্যান্ডেল: কায়রোর রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অস্থিরতা সেখানকার সংগীতজগৎকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
তামের আবু গাজালেহ: এটা নির্ভর করে আপনি কী ধরনের সংগীত করছেন, কী ধরনের শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত আছেন তার ওপর। মিসরে স্বাধীন সংগীতের জগৎ সব সময়ই উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে চলে। সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থায়নের অনিশ্চয়তা। বেসরকারি বিনিয়োগের বড় অংশ যায় বাণিজ্যিক সংগীত কিংবা প্রচলিত পপ ধারায়। সরকারি অর্থায়ন আবার নির্দিষ্ট কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে স্বাধীন সংগীতের জগৎকে প্রায় সম্পূর্ণ নিজের শক্তিতে টিকে থাকতে হয়।
অথচ শ্রোতার অভাব নেই। কায়রোয় যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করুন—এমনকি অত্যন্ত পরীক্ষামূলক সংগীতের অনুষ্ঠান হলেও কয়েক শ মানুষ হাজির হবে। মানুষ নতুন কিছু শুনতে চায়। কিন্তু শ্রোতা থাকলেই তো একটি সংগীতজগৎ গড়ে ওঠে না। অনুষ্ঠান করার জায়গা ভাড়া নিতে প্রচুর টাকা লাগে। স্বাধীন সংগীতের উপযোগী সস্তা ভেন্যু নেই, বাদ্যযন্ত্র ও সাউন্ড সরঞ্জাম ভাড়া করার সহজ ব্যবস্থাও নেই। অর্থাৎ শিল্পী ও শ্রোতা থাকলেও তাঁদের সংযুক্ত রাখার মতো অবকাঠামো তৈরি হয়নি।
এরিক ম্যান্ডেল: এই ঘাটতি থেকেই কি ‘একা৩’ প্রতিষ্ঠার ভাবনা এসেছিল?
তামের আবু গাজালেহ: একা৩ শুরু হয়েছিল সংগীতভিত্তিক উদ্যোগগুলোর জন্য একটি ইনকিউবেটর হিসেবে। ২০০৭ সালে আমরা এটিকে সংগীত লেবেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি। কিন্তু খুব দ্রুত বুঝতে পারলাম, শুধু অ্যালবাম প্রকাশ করলেই স্বাধীন সংগীতের বিকাশ সম্ভব নয়। অ্যালবাম প্রকাশের পর সেটি বিতরণের ব্যবস্থা নেই। বিতরণ করতে পারলেও প্রচারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান নেই। প্রচার করতে গেলে আবার ট্যুর ম্যানেজার পাওয়া যায় না। অর্থাৎ একটি স্বাধীন সংগীত আন্দোলনের জন্য যা যা প্রয়োজন, তার প্রায় কিছুই ছিল না।
তখন আমরা বুঝতে পারলাম, শুধু গান প্রকাশ নয়, পুরো ব্যবস্থাটাই গড়ে তুলতে হবে। এমন কিছু ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করতে হবে, যেগুলো পরবর্তী সময়ে নিজেদের শক্তিতে টিকে থাকতে পারবে। শুনতে হয়তো বড় উদ্যোগ মনে হচ্ছে, কিন্তু সবকিছুই শুরু হয়েছিল খুব ছোট পরিসরে।
মোস্তাকেল সংগীত লেবেলটি তার একটি অংশ। পাশাপাশি রয়েছে আলমোহরেক নামে বুকিং এজেন্সি, আওয়াভ নামে প্রকাশনা সংস্থা এবং সংগীতবিষয়ক পর্যালোচনার ওয়েবসাইট Ma3azef.com। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীন সংগীতের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরিসর তৈরি করা।
এরিক ম্যান্ডেল: মরিয়ম সালেহের অ্যালবামের সূত্র ধরে মোস্তাকেলের সঙ্গে আমার পরিচয়। প্রথমে ভেবেছিলাম, লেবেলটি হয়তো ইলেকট্রনিক সংগীতের দিকে বেশি ঝুঁকবে। কিন্তু এর প্রকাশনাগুলোতে বরং গীতিকার-সুরকারদের উপস্থিতি বেশি। ভালো প্রযোজনা, নিজস্ব সংগীতভাষা এবং শক্তিশালী কণ্ঠ—সব মিলিয়ে বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি জগৎ।
তামের আবু গাজালেহ: মোস্তাকেল যখন শুরু হয়েছিল, প্রায় নয় বছর আগে, তখন আরব অঞ্চলের বিকল্প সংগীতের দৃশ্যপট ছিল বেশ শুষ্ক। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে সংগীত তৈরি করাটাই ছিল নতুন ব্যাপার। তাই আমরা শুরুতে যেকোনো ধরনের বিকল্প সংগীত প্রকাশের চেষ্টা করেছি। তখন খুব বেশি বাছবিচার করার সুযোগ ছিল না। কারণ প্রথমে প্রয়োজন ছিল একটি আন্দোলন তৈরি করা। আন্দোলনটি দাঁড়িয়ে গেলে পরে বেছে নেওয়ার সুযোগ আসবে। সময়ের সঙ্গে দেখা গেল, আমাদের প্রকাশনাগুলোর মধ্যে গীতিকার-সুরকারদের নিজস্ব সংগীতচর্চার একটি প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। যেমন মরিয়ম সালেহ ও জেইদ হামদানের সংগীতে ট্রিপ-হপ ও ইন্ডি পপের মিশ্রণ রয়েছে। আবার জর্ডানের এল মোরাব্বার সংগীতে সাইকেডেলিক রকের প্রভাব। সবকিছু একই ধারার নয়।
আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংগীতটি নতুন কিছু বলছে কি না। সেটি কোনো নির্দিষ্ট ঘরানার হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আরব অঞ্চলের শ্রোতা কিংবা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষ—যে-ই শুনুক, সংগীতের মধ্যে নতুন কোনো অভিজ্ঞতা খুঁজে পাওয়া উচিত।
এরিক ম্যান্ডেল: আপনার নিজের সংগীতজীবনের শুরুটা বেশ চমকপ্রদ। আপনার প্রথম অ্যালবামে পাঁচ থেকে পনেরো বছর বয়সের মধ্যে রেকর্ড করা গান রয়েছে।
তামের আবু গাজালেহ: (হেসে) হ্যাঁ। শুনেছি, আমার বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন থেকেই মায়ের প্রতিষ্ঠিত একটি গানের দলে গান গাইতাম। এরপর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা বাদ্যযন্ত্র হাতে তুলে নিয়েছি। বাজানোর চেষ্টা করেছি, নিজের মতো করে সুর তৈরি করেছি। সেগুলোই ছিল সুরকার হিসেবে আমার প্রথম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কয়েকটি গান তৈরি হলে তার মধ্যে একটি রেকর্ড করে রাখতাম। পনেরো বছর বয়সে সব রেকর্ডিং একত্র করে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করি। (হাসি) অ্যালবামটি শুনলে বোঝা যায়, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার কণ্ঠস্বর কীভাবে বদলেছে।
এরিক ম্যান্ডেল: পরে আপনি সংগীতের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে রামাল্লায় যান। সেখানে যাওয়ার সুযোগ কীভাবে হয়েছিল?
তামের আবু গাজালেহ: বিষয়টি বেশ জটিল। মূলত আমার বাবা-মায়ের নির্বাসিত জীবনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। তারা ফিলিস্তিন থেকে নির্বাসিত হয়ে কায়রোয় বসবাস করছিলেন। এরপর অসলো চুক্তি হলো। আমার মা পিএলওর সাধারণ পরিষদের সদস্য। ফিলিস্তিনে পিএলওর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে তিনি সেখানে যাওয়ার সুযোগ পান। সেখানে পৌঁছে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থা করেন। এভাবেই আমাদের পুরো পরিবার রামাল্লায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়। সহজ ছিল না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়েছিল। রামাল্লায় আমি এডওয়ার্ড সাঈদ ন্যাশনাল কনজারভেটরিতে খালেদ জুবরানের কাছে সংগীত শিখেছি। তত্ত্ব, সুরারোপ, সংগীতের ইতিহাস—সবকিছুই পড়েছি।
এরিক ম্যান্ডেল: কোন কোন বাদ্যযন্ত্রে আপনি স্বচ্ছন্দ?
তামের আবু গাজালেহ: আমার প্রধান বাদ্যযন্ত্র উদ ও বুজুক। দুটির মধ্যে বাজানোর কিছু মিল আছে। আরও অনেক বাদ্যযন্ত্র বাজাতে ভালো লাগে, তবে সেগুলোতে নিজেকে দক্ষ বলে দাবি করব না। মূলত ভালোবাসা থেকেই বাজানোর চেষ্টা করি। কোনো বাদ্যযন্ত্রের জটিল অংশ থাকলে অবশ্যই এমন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া ভালো, যিনি সেটি সত্যিই ভালো জানেন।
এরিক ম্যান্ডেল: আপনার অ্যালবাম থুলথেইং-এ নানা ধরনের সংগীতের মিশ্রণ রয়েছে। কোথাও কোথাও এমন সব সংগীতধারার ছাপ পাওয়া যায়, যেগুলো একে অন্যের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রচলিত লোকগানের মতো গানগুলো সরলরৈখিক নয়। কাজ শুরু করেন কীভাবে?
তামের আবু গাজালেহ: অ্যালবামটির গানগুলো প্রায় নয় বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে তৈরি হয়েছে। ফলে এর মধ্যে কয়েকটি আলাদা পর্যায় রয়েছে। প্রথম দিকে গানের কাঠামো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতি আমার আগ্রহ বেশি ছিল। কুইনের ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’ আমাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। গান মানেই যে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করতে হবে, এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছিল গানটি। আমি ভাবতাম, দ্বিতীয় অন্তরায় পৌঁছে যদি মনে হয় সম্পূর্ণ অন্য কোথাও চলে যাওয়া দরকার, তাহলে সেখানেই চলে যাই না কেন? দেখি কী ঘটে। পরবর্তী সময়ে আমার সুরারোপের ধরন কিছুটা বদলেছে। গানের প্রবাহে একটা সামগ্রিক সংহতি এসেছে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ হয়নি। কখনো শব্দ নিয়ে, কখনো গানের কাঠামো নিয়ে, আবার কখনো সুরের ভেতরেই নতুন কিছু খুঁজেছি। প্রতিটি কয়েকটি গানের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করার পদ্ধতিও আলাদা ছিল।
এরিক ম্যান্ডেল: গানগুলো কি রেকর্ডিংয়ের সময় তৈরি ও বিকশিত হয়? নাকি আপনি উদ হাতে নিয়ে বসে কাগজে সুর লিখে ফেলেন?
তামের আবু গাজালেহ: গানভেদে পদ্ধতি বদলে যায়। আগে বসে পুরো স্কোর লিখতাম। থুলথেইং-এর ক্ষেত্রে দুটো পদ্ধতির মিশ্রণ ঘটেছে। কখনো সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথার মধ্যে একটি সুর শুনতে পাই। উদ হাতে নিয়ে সেটি বাজাই, তারপর অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র কিংবা সুরের সঙ্গে যুক্ত করি। দুদিন পর হয়তো সেই সুরের ধারাবাহিকতায় নতুন কিছু যোগ করি।
আবার কখনো অন্য কোনো কবি বা লেখকের লেখা এমন কিছু পঙ্ক্তি খুঁজে পাই, যা মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। কয়েক দিন পর দেখি, সেই কথাগুলো নিজের অজান্তেই একটি সুরের সঙ্গে গাইছি। আসলে কোন দিন কীভাবে গান তৈরি হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে সেদিনের মেজাজের ওপর।
এরিক ম্যান্ডেল: থুলথেইং-এ আপনি ধ্রুপদি আরবি কবিতাও ব্যবহার করেছেন।
তামের আবু গাজালেহ: হ্যাঁ। যেমন কায়স ইবন আল-মুলাওয়াহর প্রাচীন আরবি কবিতা ‘হোভ’। আরবি ভাষার শিক্ষার্থীরা স্কুলেই এ ধরনের কবিতা পড়ে। ঐতিহ্যগতভাবে এগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম হিসেবে দেখা হয়। কবিতাটিকে সংগীতে রূপ দেওয়ার সময় আমি এর প্রচলিত ছন্দ ভেঙে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করেছি। কবিতার ছন্দকে আলাদা করে বিশ্লেষণ করে সংগীতের ছন্দের সঙ্গে মেলাতে চেয়েছি। যারা ঐতিহ্যবাহী কবিতার ভাষা ও ছন্দের প্রতি খুব অনুগত, তাঁদের অনেকেই এই গানটি একেবারেই পছন্দ করেননি।
এরিক ম্যান্ডেল: মরিয়ম সালেহের ‘মেশ বাঘান্নি’ অ্যালবামেও আপনার কাজের পদ্ধতিতে কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তবে সেখানে সবকিছু আবর্তিত হয়েছে তার কণ্ঠ, ব্যক্তিত্ব ও গানের কথাকে কেন্দ্র করে।
তামের আবু গাজালেহ: আমি এমন কাজ করতে ভালোবাসি, যেগুলোতে আমি খুব বেশি দক্ষ নই। কারণ, নতুন কিছু চেষ্টা করলে শেখার সুযোগ তৈরি হয়। এখন যদি কোনো প্রকৃত রক অ্যালবাম প্রযোজনা করি, তাহলে হয়তো অন্যভাবে করব। কিন্তু তখন আমরা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম, রকের শব্দের সঙ্গে মিসরীয় লোকসংগীতের নানা উপাদান মিশিয়ে কী তৈরি করা যায়। মরিয়মের কণ্ঠে একধরনের খুব মিসরীয়, প্রায় চিৎকারের মতো তীব্রতা রয়েছে। সেই কণ্ঠকে কেন্দ্র করে আমরা নতুন কিছু তৈরি করতে চেয়েছিলাম। এটিও ছিল একধরনের পরীক্ষা।
এরিক ম্যান্ডেল: আমি মরিয়মের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম র্যাপ ও হিপ-হপের সূত্র ধরে। বার্লিনের মতো কায়রোতেও কি একটি মাত্র সংগীতজগৎ নেই, বরং পাশাপাশি অনেকগুলো ভিন্ন দৃশ্যপট রয়েছে? হিপ-হপের জনপ্রিয়তাও তো কম নয়।
তামের আবু গাজালেহ: আসলে মিসরের সবচেয়ে বড় সংগীতধারা হলো শাবি এবং মাহরাগানাত। প্রকৃত অর্থে এগুলোই মিসরের আন্ডারগ্রাউন্ড সংগীতজগৎ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি হয়েছে। তাদের নিজস্ব সংগীত, নিজস্ব অনুষ্ঠান আয়োজনের ধরন, নিজস্ব শ্রোতা রয়েছে। বাইরের কোনো সংগঠক সেখানে গিয়ে সহজে অনুষ্ঠান আয়োজন বা প্রচার করতে পারবেন না। প্রতিটি পরিসরের নিজস্ব নিয়ম ও সংস্কৃতি আছে।
হিপ-হপেরও বড় একটি দৃশ্যপট রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এর অনেকটাই এখনো ইন্টারনেটকেন্দ্রিক। কয়েকজন শিল্পী সরাসরি অনুষ্ঠান করেন এবং তাঁদের বড় শ্রোতাগোষ্ঠীও আছে। তবে মিসরের ভেতরে হিপ-হপ এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী লাইভ সংগীত আন্দোলনে পরিণত হতে পারেনি।
এরিক ম্যান্ডেল: ইউরোপের ডিজেরা শাবি সংগীতের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। আমার মনে হয়, লোকসংগীতের শিকড় থাকার কারণে এর শব্দে একটি স্বতন্ত্র আরব পরিচয় পাওয়া যায়। অথচ কায়রোর কিছু টেকনো প্রযোজককে বলতে শুনেছি, তাঁরা তাঁদের সংগীতে কোনো আরবীয় উপাদান রাখতে চান না।
তামের আবু গাজালেহ: আমার মনে হয়, এর সঙ্গে মিসরের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সম্পর্ক রয়েছে। এখানে অনেকগুলো সংস্কৃতি ও উপসংস্কৃতি পাশাপাশি বাস করে। টেকনো সংগীতের প্রযোজকেরা হয়তো তাঁদের সংগীতকে দেশের ঐতিহ্যবাহী কোনো ধারার ওপর নির্ভরশীল করতে চান না। সেটাই তাঁদের নিজস্ব পথ। তাঁরা শাবি সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত নন। এখন যদি হঠাৎ তাঁরা আরবি সংগীতের উপাদান ব্যবহার করতে শুরু করেন, তাহলে সেটি তাঁদের কাছে কৃত্রিম বা মৌলিকতাহীন মনে হতে পারে।
এরিক ম্যান্ডেল: নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বার্লিনসহ পশ্চিমা বিশ্বে টেকনো জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সময় এর সঙ্গে ভবিষ্যতবাদের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। টেকনো যেন ছিল আগামীর পৃথিবীর শব্দ। কায়রো কিংবা বৈরুতের সংগীতশিল্পীদের দিকে তাকালে আপনার কি মনে হয়, তাঁদের সংগীতেও ভবিষ্যৎকে কল্পনা করার কোনো প্রয়াস রয়েছে? নতুন কিছু আবিষ্কার করা, পুরোনো কিছু ভেঙে ফেলা, কিংবা একটি ইউটোপীয় বা ডিস্টোপীয় ভবিষ্যৎ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা? একে কি মিসরীয় ভবিষ্যতবাদ বলা যায়?
তামের আবু গাজালেহ: (হেসে) প্রশ্নটা খুব কঠিন। সত্যি বলতে, আমি নিশ্চিত নই। আর সেটাই হয়তো সমস্যার জায়গা।
আমার মনে হয়, মূল সমস্যা হলো আরবি সংগীতশিল্পের সামগ্রিক কাঠামো এখনো অনেকটাই ঐতিহ্যনির্ভর। পপ সংগীত কিংবা আরবি সংগীতের প্রচলিত ধারার বাইরে নতুন কিছু করার সুযোগ এখানে সীমিত। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আরব অঞ্চলের সংগীতজগৎ বিশ্বের অন্যান্য সংগীতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। বিদেশে কী ধরনের সংগীত তৈরি হচ্ছে, কী নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, সেসব সম্পর্কে জানার সুযোগও ছিল কম। অনেক সময় কোনো অ্যালবাম প্রকাশের বহু বছর পর আমরা তার কথা জানতে পারতাম। ইন্টারনেট আসার পর পরিস্থিতি বদলেছে। বিশেষ করে গত দশ বছরে মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একই সময়ে কী ঘটছে, তা জানতে পারছে। নতুন সংগীত শুনছে, নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। আমার মনে হয়, এর ফলে সংগীতের মধ্যে ভবিষ্যৎমুখী চিন্তার একটি প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এখনই তাকে নির্দিষ্ট কোনো নামে চিহ্নিত করা কঠিন। সময়টা এখনো খুব প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
এরিক ম্যান্ডেল: অর্থাৎ মিসরীয় ভবিষ্যতবাদ এখনো তৈরি হচ্ছে?
তামের আবু গাজালেহ: সম্ভবত। তবে সেটি ঠিক কী রূপ নেবে, তা এখনই বলা যায় না। আমাদের সংগীতশিল্পীরা নানা দিক থেকে পরীক্ষা করছেন। কেউ ঐতিহ্যের ভেতর থেকে নতুন ভাষা খুঁজছেন, কেউ সম্পূর্ণ নতুন শব্দ তৈরি করছেন, কেউ আবার বাইরের সংগীতধারার সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখছেন। এই প্রক্রিয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা হয়তো এখনো আমাদের জানা নেই। কিন্তু সেই ভবিষ্যতের সংগীত তৈরি করার চেষ্টা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

পরিচিতি
তামের আবু গাজালেহ সমকালীন আরব সংগীতের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। কায়রোয় জন্ম নেওয়া এই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত সংগীতশিল্পী তার সুরে মিলিয়েছেন আরব ঐতিহ্য, পরীক্ষামূলক সংগীত, ইলেকট্রনিক শব্দ এবং আধুনিক শহুরে জীবনের অস্থিরতা। তার হাতে উডের প্রাচীন তার কখনো হয়ে ওঠে স্মৃতির ভাষা, কখনো আবার ভেঙে দেয় পরিচিত সংগীতের সীমানা।
২০১২ সালে গঠিত সংগীতদল আলিফের মাধ্যমে তিনি কায়রো, বৈরুত ও বৃহত্তর আরব অঞ্চলের বিকল্প সংগীতচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। তার কাজ কেবল গান তৈরি নয়; স্বাধীন সংগীতের জন্য একটি পরিসর গড়ে তোলারও প্রয়াস। ইকা৩-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি নতুন শিল্পীদের জন্য তৈরি করেছেন সহযোগিতা ও প্রকাশনার সুযোগ।
তামেরের সংগীতে ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ পাশাপাশি হাঁটে। সেখানে নির্বাসনের স্মৃতি, নগরজীবনের কোলাহল, কবিতার বিষণ্নতা আর নতুন কিছুর আকাঙ্ক্ষা মিশে যায়। তার সুর যেন পরিচিত পৃথিবীর ভেতরেই আরেকটি অচেনা পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









