ক্লাসিক্যাল থিয়েটারের গভীরতা আর জনপ্রিয় বিনোদনের আকর্ষণ—দুইয়ের অসাধারণ সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন অভিনেতা প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। মঞ্চের অভিজ্ঞতা, ভাষার ওপর দখল এবং চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা দিয়ে তিনি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ও সুপারহিরো সিনেমাকেও দিয়েছেন নতুন মাত্রা। ক্যাপ্টেন জ্যাঁ-লুক পিকার্ড থেকে প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার—প্রতিটি চরিত্রেই তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন দৃঢ়তা, মানবিকতা ও গভীর আবেগ।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ৮৬ বছর বয়সে মারা যান প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। তার মৃত্যুতে অভিনয়জগতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও রেখে গেছেন সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। তিনি দেখিয়েছেন, শেকসপিয়ারের মঞ্চে অর্জিত অভিনয়দক্ষতা জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনকেও কতটা গভীর, মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগময় করে তুলতে পারে। একসময় যাকে বলা হয়েছিল ‘অপরিচিত ব্রিটিশ অভিনেতা’, তিনিই হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক কিংবদন্তি।
ক্যারিয়ারের প্রথম দুই দশকেরও বেশি সময় প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট কাটিয়েছেন মঞ্চে। রয়্যাল শেকসপিয়ার কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন টানা ১৬ বছর। কিংবদন্তি পরিচালক পিটার ব্রুকের নির্দেশনায় আ মিডসামার নাইটস ড্রিম নাটকের মাধ্যমে ব্রডওয়েতে অভিষেক হয় তার। কাজ করেছেন রয়্যাল ন্যাশনাল থিয়েটারেও।
এত সমৃদ্ধ মঞ্চজীবনের পরও ১৯৮৭ সালে ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’ সিরিজে অভিনয়ের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল ‘অপরিচিত ব্রিটিশ শেকসপিয়ারীয় অভিনেতা’ হিসেবে।

সেই সিরিজেই ক্যাপ্টেন জ্যাঁ-লুক পিকার্ড চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান স্টুয়ার্ট। ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের এই অধিনায়কের মধ্যে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন কঠোর নেতৃত্বের পাশাপাশি মমতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ। তার অভিনয়ের অন্যতম শক্তি ছিল কর্তৃত্ব বজায় রেখেও চরিত্রের মানবিক দিকটি প্রকাশ করা।
বন্ধু ও সহকর্মী ইয়ান ম্যাককেলেন তাকে শেকসপিয়ারের নাটকে অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু স্টুয়ার্ট বেছে নেন ‘স্টার ট্রেক’। ছয় বছরের চুক্তিতে রাজি হওয়ার সময় অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সিরিজটি হয়তো এক মৌসুমের বেশি চলবে না। বাস্তবে সাত মৌসুমে ১৭৮টি পর্ব প্রচারিত হয়। শেষ পর্বটি দেখেছিলেন তিন কোটির বেশি দর্শক। পরে এই সিরিজের চারটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। পাশাপাশি ‘স্টার ট্রেক: পিকার্ড’ সিরিজে তিন মৌসুমের জন্য আবারও একই চরিত্রে ফেরেন তিনি।
এই সাফল্য তাকে বিপুল সম্পদ ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। একই সঙ্গে মঞ্চের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও কঠোর পেশাদারত্ব দিয়ে সহশিল্পীদের কাজেও প্রভাব ফেলেন তিনি।
স্টুয়ার্টের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিচয় প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রে এই চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন তিনি। তার অভিনীত প্রফেসর একদিকে কঠোর, অন্যদিকে স্নেহশীল শিক্ষক। বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন তরুণদের জন্য আশ্রয় ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন তিনি। চরিত্রটির সততা ও মানবিকতার বিপরীতে ইয়ান ম্যাককেলেনের ম্যাগনেটো হয়ে ওঠে গল্পের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।
২০০০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে সাতটি ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন স্টুয়ার্ট। এসব চলচ্চিত্র বিশ্বজুড়ে আয় করে ৩৩০ কোটি ডলারের বেশি। মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের দুটি চলচ্চিত্রেও দেখা গেছে তাকে।
চার্লস জেভিয়ার চরিত্রে তার অন্যতম স্মরণীয় অভিনয় ২০১৭ সালের ‘লোগান’ চলচ্চিত্রে। জেমস ম্যানগোল্ড পরিচালিত ছবিতে হিউ জ্যাকম্যানের উলভারিনের বিপরীতে অসুস্থ ও স্মৃতিবিভ্রান্ত প্রফেসর এক্সের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। চরিত্রটির অসহায়ত্ব, অতীতের ভার এবং মানসিক যন্ত্রণা তার অভিনয়ে গভীর আবেগ তৈরি করে। ফলে সুপারহিরো ঘরানার গণ্ডি ছাড়িয়ে ছবিটি হয়ে ওঠে এক হৃদয়স্পর্শী মানবিক গল্প।

ব্রডওয়ের মঞ্চেও নিজের অভিনয়ক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন স্টুয়ার্ট। ২০০৮ সালে ‘ম্যাকবেথ’ নাটকে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। বয়সের কারণে নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ, ক্ষমতার লোভ এবং ক্রমশ ভেঙে পড়া মানসিক অবস্থাকে অসাধারণভাবে তুলে ধরেন। চরিত্রটিকে খলনায়ক হিসেবেই উপস্থাপন করলেও তার অভিনয়ে ফুটে ওঠে একসময়কার শক্তিশালী মানুষের করুণ পতন।
২০১৩ সালে ইয়ান ম্যাককেলেনের সঙ্গে আবারও ব্রডওয়েতে ফেরেন তিনি। হ্যারল্ড পিন্টারের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ এবং স্যামুয়েল বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গডো’ নাটকে তাদের যুগল অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। হাস্যরস, নিষ্ঠুরতা, অনিশ্চয়তা ও অস্তিত্বের সংকট—সবকিছুই উঠে আসে তাদের অভিনয়ে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









