যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ‘লাকুনা ম্যাগাজিন’ একটি অনলাইন সাময়িকী। লাকুনা ম্যাগাজিনের জন্য নাভি পিল্লেইর সাক্ষাৎকারসহ লেখাটি লিখেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক রেবেকা ওমোনিরা-ওয়েকানমি। লেখাটি ১ নভেম্বর ২০১৬ সালে প্রকাশিত।
কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে কখনো পিছিয়ে যাননি নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লেই। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের দিনগুলো থেকে শুরু করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন—তার কর্মজীবনের কেন্দ্রে ছিল একটি প্রশ্ন—ক্ষমতাবানদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইন কতটা কার্যকর হতে পারে?
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে ছয় বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন দেশের সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি করার চেষ্টা করেছেন। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে ব্যর্থতার অভিযোগে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের সমালোচনা করেছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে শেষ হওয়া ওই গৃহযুদ্ধের আগে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে সংঘাত চলেছিল।
পিল্লেই সমালোচনার জবাবে শ্রীলঙ্কা সরকার বলেছিল, ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত হওয়ায় তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভারতে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার পর এক ভারতীয় কূটনীতিকও অভিযোগ করেছিলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন তিনি। সিরিয়ার এক রাষ্ট্রদূত তাকে ‘উন্মাদ’ বলেছিলেন।
মানবাধিকার রক্ষায় পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যর্থতা তুলে ধরলেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল পিল্লেইকে। যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ আপত্তি জানিয়েছিল তার বক্তব্যে। পিলে স্মরণ করেন, তাকে বলা হয়েছিল, হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে—এমন দূরবর্তী দেশগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত তার। কথাটির অর্থ ছিল, উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে তাকানো।
এসব অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে পিল্লেই হাসেন। তার কণ্ঠে অভিযোগের চেয়ে বিস্ময়ই বেশি।
‘আমাকে অনেক খারাপ নামে ডাকা হয়েছে, এটা সত্যি। একবার কেউ আমাকে গুগুলে নিজের ছবি দেখতে বলেছিলেন। সেখানে অনেক ছবিতে আমার মুখের ওপর ওসামা বিন লাদেনের মুখ বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মানবাধিকার সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা নেই।’
তার বিরুদ্ধে সমালোচনা নতুন কিছু নয়। জীবনের শুরুর দিকেই তিনি বুঝেছিলেন, সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে শুধু আইনের বই জানা নয়; এর অর্থ হলো সমাজের প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোকেও প্রশ্ন করা।

বৈষম্যের ভেতর বেড়ে ওঠা
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নাভি পিল্লেইর। তার দাদা ভারত থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় এসেছিলেন। দেশটির চিনিকল ও আখের খামারে প্রায় দাসত্বের মতো পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল তাকে।পিলে বেড়ে উঠেছেন এমন এক সমাজে, যেখানে তার পরিচয়ের একাধিক দিকই ছিল বৈষম্যের কারণ। তিনি নারী, ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান। বর্ণবৈষম্যের শাসনে এই পরিচয়গুলো তার সামনে একের পর এক বাধা তৈরি করেছিল। তার শৈশবের অনেক বান্ধবী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল। তাদের অনেককে পরিবারের সিদ্ধান্তে অল্প বয়সে বিয়ে করতে হয়েছিল। কিন্তু পিলের বাবা-মা চেয়েছিলেন, মেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাক।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়াও তখন সহজ ছিল না। পিলে বলেন, ক্লেয়ারউডের দরিদ্র সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে স্কুলের প্রধান শিক্ষক তার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মেয়েটির বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া উচিত। এরপর এলাকার মানুষ চাঁদা তুলে তার পড়াশোনার খরচ জোগাড় করে। এই সহযোগিতা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোই ছিল না শেষ বাধা। নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ক্লাসের সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো, যাতে আইনজীবীদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করা শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীদের সুবিধা হয়। ভোরে ও রাতে ক্লাস করতে হতো পিল্লেইকে। মাঝখানে বাসভাড়া না থাকায় বাড়ি ফিরতে পারতেন না তিনি। তখন গ্রন্থাগারে বসে পড়তেন, পড়তেন নুরেমবার্গ বিচারের নথিপত্র।
বর্ণবৈষম্যের অভিজ্ঞতা তার কাছে কেবল ব্যক্তিগত অপমান ছিল না। তা তাকে বুঝিয়েছিল, আইন ও সমাজের সম্পর্ক কত গভীর। যে আইন মানুষের অধিকার রক্ষা করার কথা, সেই আইনই কখনো কখনো বৈষম্যকে বৈধতা দিতে পারে ছোটবেলায় আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছার কথা এক শিক্ষককে জানিয়েছিলেন পিলে। তখন তার বয়স মাত্র ১০ বা ১১ বছর। শিক্ষক বলেছিলেন, আইন পড়তে হলে ধনী বাবা থাকতে হবে; এ পড়াশোনায় অনেক টাকা লাগে। তার বাবা ছিলেন বাসচালক।
শিশু পিল্লেইর কাছে কথাটি ছিল নির্মম। যেন সমাজের কাঠামো অপরিবর্তনীয়, আর মানুষের ভবিষ্যৎ আগে থেকেই নির্ধারিত। পিল্লেই পরে বলেছিলেন, সমাজের কাঠামো এবং বড়দের কথাবার্তা—সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এসব বাধা অতিক্রম করতে শিশুদের যে কতটা সংগ্রাম করতে হয়, তা সহজে বোঝা যায় না।

নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হয়েছে
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে চাকরি খুঁজতে গিয়ে পিলে আরও একবার বৈষম্যের মুখোমুখি হন। অধিকাংশ আইনজীবী প্রতিষ্ঠানই ছিল শ্বেতাঙ্গদের নিয়ন্ত্রণে। একটি প্রতিষ্ঠান তাকে জানিয়েছিল, তারা তাকে নিয়োগ দিতে পারবে না। কারণ, কোনো শ্বেতাঙ্গ সচিবকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির নির্দেশ মেনে কাজ করতে হবে—এমন পরিস্থিতি তারা চায় না।
কোথাও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, তিনি কী ধরনের মক্কেল আনতে পারবেন। তার বাবা ব্যবসায়ী কি না, তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে অপমানজনক প্রশ্নটি ছিল অন্য রকম। সদ্য বিয়ে করা পিলেকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়লে কী হবে? চাকরির দরজা বন্ধ থাকায় নিজের আইনজীবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পুরুষ সহকর্মীরা তার এই উদ্যোগকে ঔদ্ধত্য মনে করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, একজন নারী আইনজীবী হিসেবে নিজের প্রতিষ্ঠান চালাতে পারবেন না।
পিল্লেই বলেন, তার সামনে বিকল্প খুব বেশি ছিল না।
ধীরে ধীরে পারিবারিক সহিংসতার মামলায় দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের পক্ষেও দাঁড়ান। তার মক্কেলদের মধ্যে ছিলেন নিজের স্বামী গ্যাবি পিল্লেইও। রবেন দ্বীপের কারাগারে বন্দীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়েও তার ভূমিকা ছিল। বন্দীরা যাতে আইনজীবীর সহায়তা পান এবং কারাগারের বিধি ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হলে ন্যায়সংগত বিচারের সুযোগ পান, সে জন্য কাজ করেন তিনি।
এসব মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে পিলে উপলব্ধি করেন, একটি দেশের আইনব্যবস্থার ভেতরেই যখন অন্যায় গেঁথে থাকে, তখন নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বর্ণবৈষম্যের শাসনামলে নিজের গায়ের রঙের কারণে বিচারকের কক্ষে প্রবেশের অধিকারও ছিল না তার। পরে ১৯৯৫ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। বিচারকের কক্ষে তার প্রথম প্রবেশ ছিল নিজের কক্ষে প্রবেশ। দেশটির প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হয়ে ইতিহাস গড়েন পিল্লেই।
তিনি বলেন, জীবনে অনেক কিছুই প্রথমবারের মতো করতে হয়েছে তাকে। প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রে পরিবর্তন আনা কঠিন হতে পারে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনালগ্নে পরিবর্তনের সুযোগ ছিল।

নারীদের কথা শুনে বদলে গেল দৃষ্টিভঙ্গি
পিল্লেইর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার। ১৯৯৪ সালে দেশটিতে সংঘটিত গণহত্যার সময় অসংখ্য নারী ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হন। তুতসি জাতিগোষ্ঠীর নারী এবং তুতসি পুরুষদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হুতু নারীরাও এসব অপরাধের শিকার হয়েছিলেন।
১৯৯৬ সালে আইনজীবী লিসা প্রুইট রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জন্য দুই মাস ধরে এসব ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ করেন। তিনি দেখেন, ধর্ষণের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্বে থাকা অনেক পুরুষ কর্মকর্তার এ ধরনের ঘটনা অনুসন্ধান ও নির্যাতনের শিকার নারীদের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছিল না।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনে একই ধরনের সমস্যার কথা উঠে আসে। সংস্থাটির নারী গবেষকদের কাছে অনেক ভুক্তভোগী জানিয়েছিলেন, পুরুষ কর্মকর্তাদের সামনে নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে তারা অস্বস্তি বোধ করেন। তখনও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় যৌন সহিংসতাকে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে প্রবল অনীহা ছিল। হত্যাকাণ্ডের তুলনায় ধর্ষণকে কম গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল অনেকের মধ্যে।
১৯৯৬ সালে পিল্লেই রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক নির্বাচিত হন। সেখানে তিনিই ছিলেন একমাত্র নারী বিচারক। সেই সময় ধর্ষণ যুদ্ধাপরাধ হিসেবে স্বীকৃত হলেও আন্তর্জাতিক সামরিক বিচারব্যবস্থায় এর বিচার হয়েছিল খুব সীমিত পরিসরে। রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারেও যৌন সহিংসতার বিষয়টি অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা সহজ ছিল না।
পিল্লেই মনে করেন, নির্যাতনের শিকার নারীদের সাক্ষ্য এবং গবেষকদের সংগৃহীত তথ্য এই বাধা অতিক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিচারকেরা যখন ঘটনাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান এবং নারীদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তখন যৌন সহিংসতার প্রকৃতি ও ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ জ্যঁ-পল আকায়েসুর মামলা। গণহত্যার সময় তিনি ছিলেন রুয়ান্ডার তাবু এলাকার একজন সাবেক মেয়র। তার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় তুতসি জনগোষ্ঠীর মানুষের ওপর হত্যা, নির্যাতন ও ব্যাপক যৌন সহিংসতা চালানো হয়েছিল। প্রাথমিক অভিযোগপত্রে ধর্ষণকে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পরে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও তদন্তের ভিত্তিতে অভিযোগ সংশোধন করা হয়। ১৯৯৮ সালে আকায়েসু গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের নয়টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। এর মধ্যে ধর্ষণের অভিযোগও ছিল।
পিল্লেই এই রায়কে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখেন। তার মতে, ধর্ষণকে গণহত্যার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়। সংঘাতের সময় যৌন সহিংসতা যে কোনো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে, এই উপলব্ধি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করতে চান না পিল্লেই। বরং তিনি কৃতিত্ব দেন সেই নারীদের, যারা নিজেদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে এগিয়ে এসেছিলেন।
‘জীবনের সব শিক্ষা আমি পেয়েছি অন্য নারীরা যখন আমার চোখ খুলে দিয়েছেন,’ বলেন তিনি।
ক্যারিয়ারের শুরুতে পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীরা তার কাছে আসতেন। তখন তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী, কখনো কখনো অতিরিক্ত কঠোরও। নারীরা কাঁদতে কাঁদতে তাদের নির্যাতনের কথা বললে তিনি প্রথমে অধৈর্য হয়ে পড়তেন। তার মনে হতো, এত প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি নিজেই যখন দাঁড়াতে পেরেছেন, অন্যরা কেন পারছেন না? কিন্তু নারীরা আসতে থাকেন। তাদের কথা শুনতে শুনতে পিলে বুঝতে পারেন, পারিবারিক সহিংসতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে সামাজিক রীতিনীতি, ক্ষমতার অসমতা এবং নারীর প্রতি দীর্ঘদিনের বৈষম্য।
এই উপলব্ধি তার কাজের ধরন বদলে দেয়। তিনি শুধু আদালতে মামলা লড়েননি; জনসমক্ষে পারিবারিক সহিংসতার ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। একবার তার এক মক্কেল স্বামীর কাছ থেকে সন্তানের ভরণপোষণ না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে তার কাছে এসেছিলেন। ওই নারীর মুখে ছিল গভীর ক্ষত। স্বামী ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করেছিলেন। ছয় বছরের মেয়ে মায়ের মুখের রক্ত মুছতে টিস্যু নিয়ে এগিয়ে এলে বাবা তাকে মাকে ছেড়ে দিতে বলেছিলেন—যেন নারীটি মরে গেলেও তার কিছু যায় আসে না। এ ঘটনা প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিলেন পিলে। এমন এক সময়ে তিনি পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে কথা বলেছিলেন, যখন বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করাকে ভালো চোখে দেখা হতো না।
নারীদের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছিল, আইনের পরিবর্তন জরুরি হলেও তা যথেষ্ট নয়। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে আইনের সুরক্ষা সবার কাছে পৌঁছায় না। ১৯৮৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের সহায়তায় কাজ করা প্রথম দিককার বেসরকারি সংগঠনগুলোর একটির সহপ্রতিষ্ঠাতা হন তিনি। পরে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সংগঠন ইকুয়ালিটি নাউ গঠনেও যুক্ত হন। দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের আলোচনার সময় নারী অধিকার ও লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও অংশ নেন তিনি।
মানবাধিকার সবার দায়িত্ব
বিচারকের দায়িত্ব পালনের পর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে কাজ শুরু করা পিল্লেইর জন্য ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। আদালতে বিচারক আইন ব্যাখ্যা করেন এবং রায় দেন। কিন্তু মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে তাকে বিভিন্ন দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে। অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সামনে আনতে হয়েছে, আবার পরিবর্তনের জন্য সমর্থনও গড়ে তুলতে হয়েছে।
পিল্লেই বলেন, এই নতুন দায়িত্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার প্রায় দুই বছর লেগেছিল। প্রথমে তিনি নিজের দায়িত্বের পরিধি বুঝতে চেষ্টা করেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব হলো পৃথিবীর সব মানুষের সব অধিকার রক্ষা ও প্রতিষ্ঠায় কাজ করা। এই দায়িত্বের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন তিনি।
ছয় বছরের দায়িত্বকালে গাজা, শ্রীলঙ্কা ও সিরিয়ার মতো জায়গায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ নিয়ে সরব হন পিলে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকা জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরেন। লিঙ্গসমতা এবং রূপান্তরকামী ও অন্যান্য লিঙ্গপরিচয়ের মানুষের অধিকার নিয়েও কাজ করেন। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারকে গুরুত্ব দেন। তবে তিনি দ্রুত বুঝতে পারেন, মানবাধিকার রক্ষার জন্য শুধু নির্দিষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বললেই হবে না। যে আন্তর্জাতিক কাঠামোর মাধ্যমে এসব অধিকার পর্যবেক্ষণ ও সুরক্ষিত হওয়ার কথা, সেই কাঠামোর ভেতরেও পরিবর্তন প্রয়োজন।
জাতিসংঘের বিভিন্ন বিভাগ নিজেদের কাজকে আলাদা করে দেখত। মানবাধিকারবিষয়ক প্রশ্নকে অনেকেই কেবল একটি নির্দিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব মনে করতেন। পিল্লেই চেয়েছিলেন, উন্নয়ন, রাজনৈতিক কার্যক্রম ও নিরাপত্তাসহ জাতিসংঘের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানবাধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পাক। তিনি জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে মানবাধিকারবিষয়ক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নেন। তার লক্ষ্য ছিল, মানবাধিকারকে শুধু একটি দপ্তরের কাজ হিসেবে না দেখে পুরো সংস্থার দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
পিল্লেইর বক্তব্য ছিল, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের পাশাপাশি মানবাধিকারও জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কোনো সংকট দেখা দিলে সেখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব সরে পড়াই দায়িত্ব হতে পারে না। বরং সংকটের মধ্যে থেকে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে। এই ধারণার মধ্যেই তার কাজের মূল দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে: মানবাধিকার কোনো দূরের দেশের সমস্যা নয়, কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত অধিকারও নয়। এটি সবার বিষয়।

আইন একা পৃথিবী বদলাতে পারে না
পিল্লেইর অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন শুরু হয় মানুষের কাছ থেকে—সামাজিক আন্দোলন, নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ এবং নির্যাতনের শিকার মানুষের কথা শোনার মধ্য দিয়ে। আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি সেই পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। কিন্তু অধিকার কাগজে লেখা থাকলেই তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয় না।
আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও কখনো কখনো নিজেদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হয়। বিচারকের কাজ আইন ব্যাখ্যা করা, কিন্তু সেই আইনই যদি অন্যায়কে বৈধতা দেয়, তখন সমস্যাটি আরও গভীর হয়। পিল্লেইর গবেষণার একটি বিষয় ছিল, বর্ণবৈষম্যকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘোষণা করা হলেও দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারকেরা কীভাবে সেই ব্যবস্থার আইন প্রয়োগ করে গেছেন। তার মতে, আইন ও ন্যায়বিচারের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে বিচারকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
আন্তর্জাতিক চুক্তি, বিশেষজ্ঞদের গবেষণা, নাগরিক সমাজের কাজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা—সবকিছুই বিচারকদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। আদালতের প্রতিটি বিচারক হয়তো পরিবর্তনের পক্ষে থাকেন না, কিন্তু এক বা দুজনও যদি অন্যভাবে ভাবতে প্রস্তুত থাকেন, তাদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। রুয়ান্ডার গণহত্যার মামলায় যৌন সহিংসতার বিচার নিশ্চিত করার অভিজ্ঞতাও তাকে এই শিক্ষা দিয়েছে। নির্যাতনের শিকার নারীদের বক্তব্য শোনা, গবেষকদের তথ্য কাজে লাগানো এবং আইনের ব্যাখ্যায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনার মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছিল।
পিল্লেই বলেন, এ ক্ষেত্রে শিক্ষাবিদদের সহায়তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নারী ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিচার নিয়ে নতুন আইনি দৃষ্টান্ত গড়ে তুলতে তাদের গবেষণা কাজে লেগেছে।
তার কাছে বিচার মানে শুধু আইনের বিধান প্রয়োগ করা নয়; অভিযোগকারীর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা। একজন নারী যখন ভয়াবহ ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে আসেন, তখন আদালতের দায়িত্ব সেই অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা। কারণ, বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
নাভি পিলের দীর্ঘ কর্মজীবন তাই শুধু একজন আইনজীবী বা বিচারকের সাফল্যের গল্প নয়। এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি নিজের জীবনে বৈষম্য দেখেছেন, অন্যায়ের মুখোমুখি হয়েছেন এবং ধীরে ধীরে বুঝেছেন—ন্যায়বিচারের জন্য মানুষের কথা শোনা অপরিহার্য। আইন গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে মানুষ কতটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রস্তুত, কতটা মনোযোগ দিয়ে অন্যের অভিজ্ঞতা শুনতে পারে এবং কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে সবার মর্যাদা রক্ষায় কাজ করে।
ন্যায়বিচার কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি শুরু হয় সেই মুহূর্তে, যখন কারও কষ্টকে আর উপেক্ষা করা হয় না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









