অ্যান কারসনের কাছে অতীত কোনো মৃত সময় নয়—তা সব সময়ই তীব্রভাবে বর্তমান
অ্যান কারসন যখন বলেন, লেখালেখি তার কাছে “গন্ধ শুঁকে খনন করার মতো”, তখন মনে হয়—কবিতা কি তবে মাটির নিচে চাপা কোনো প্রাচীন শহর, আর লেখক তার গন্ধ অনুসরণ করে ধীরে ধীরে সেখানে পৌঁছান? মার্সেল প্রুস্তের কাছে স্মৃতির দরজা খুলেছিল স্বাদের মাধ্যমে—এক কামড় মাদেলেন কেক তাকে ফিরিয়ে নিয়েছিল হারিয়ে যাওয়া সময়ের দিকে। কারসনের ক্ষেত্রে হয়তো সেই দরজা গন্ধ। কিন্তু কারসনের নিজের কাছে পৌঁছানোর গন্ধটা কী?
টরন্টোতে তিনি এসেছেন অ্যাবেলার্ড স্কুলের জন্য অর্থ সংগ্রহের একটি পাঠ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। আমাদের দেখা হলো পুরোনো এক প্রাসাদসদৃশ ভবনে—ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো, তার নিজের পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়, থেকে সামান্য উত্তরে। কারসনকে দেখে মনে হলো, তিনি যেন বাতাসে ভাসা কোনো সংরক্ষিত চরিত্র। খুব শান্ত, খুব সংযত। কোনো সুগন্ধি নেই। তার নিজের যে কোনো গন্ধ থাকলেও তা এই পুরোনো ভবনের কাঠের পালিশের গন্ধে হারিয়ে গেছে।
কিন্তু হয়তো এটাই তার স্বভাব। হরিণশাবকের শরীর যেমন নিজেকে বাঁচাতে গন্ধহীন হয়ে থাকে, কারসনের মধ্যেও তেমন এক ধরনের অধরা থাকা আছে। তাকে পুরোপুরি ধরা যায় না।
পুরস্কার আর সম্মানের অভাব তার নেই। যুক্তরাষ্ট্রে পেয়েছেন ম্যাকআর্থার ‘জিনিয়াস’ গ্রান্ট, ল্যানান সাহিত্য পুরস্কার, গুগেনহাইম ফেলোশিপ। তার কাব্যগ্রন্থ ‘মেন ইন দি অফ আওয়ার্স’ ২০০০ সালে ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ডের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল। অথচ নিজের দেশ কানাডাতেই তিনি এখনো তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত। আর নিজের জীবন নিয়ে কথা বলার আগ্রহও তাঁর সামান্য।
আমরা জানি, ১৯৫০ সালে ব্যাংকার পরিবারে তার জন্ম। অন্টারিওর টিমিন্স থেকে পোর্ট হোপ—বিভিন্ন শহরে তার বেড়ে ওঠা। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। বিয়ে করেছিলেন, পরে বিচ্ছেদ হয়েছে। কোনো সন্তান নেই। এখন ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসিকস পড়ান।
এইটুকুই প্রায়। তারপর আছে তার লেখা।
শক্ত অথচ কোমল। গভীর জ্ঞানী, অথচ খেলাচ্ছলে লেখা। তার বই ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’—একটি ‘ফিকশনাল এসেই’—এ এক ধ্রুপদি শিক্ষায় শিক্ষিত স্ত্রী তার স্বামীকে অন্য নারীদের দিকে চলে যেতে দেখছে, আর সেই মুহূর্তে হোমারকে উদ্ধৃত করছে—“বারবার পেছন ফিরে তাকাতে তাকাতে।” বইটি কতটা আত্মজীবনীমূলক? কে জানে। কারসন নিজে বলবেন না। কিন্তু ভালোবাসার গভীরে যে দুঃখ লুকিয়ে থাকে, সেটিকে তার মতো সরাসরি আর কে প্রকাশ করতে পারে?
ক্লাসিকস তার জীবনের প্রথম পছন্দ ছিল না।
১৯৬৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। পরের বছর মত বদলালেন। চাকরি নিলেন। তারপর গ্রাফিক আর্টস পড়তে গেলেন টরন্টোর হাম্বার কলেজে। মজা করে বলেন, তখন তিনি “সিরিয়ালের বাক্সের নকশা বানাতেন।” শেষ পর্যন্ত গ্রিক কবিতার কাছে ফিরে এলেন। সেখান থেকেই ক্লাসিকস। ব্যাচেলর, মাস্টার্স, শেষে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি।
“ক্লাসিকস অনেকটা একটা কাল্টের মতো,” বলেন কারসন।
হয়তো কথাটা তিনি মজা করেই বলেন। কিন্তু তার চোখের রহস্যময় হাসি দেখে মনে হয়, তিনি যেন সেই গোপন সম্প্রদায়ের একজন দীক্ষিত সদস্য।
ক্লাসিকস পড়তে গেলে মানুষ নিজেকেই একটু আলাদা করে নেয়। এখানে মানুষ পৃথিবী বদলানোর জন্য শেখে না; বরং পৃথিবী যা ভুলে যেতে বসেছে, তা ধরে রাখার জন্য শেখে। সমকালীন ফ্যাশনের কথাবার্তা ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। সামনে এসে দাঁড়ায় বহু পুরোনো কণ্ঠ—গ্রিকদের, রোমানদের, কবিদের, দার্শনিকদের। মৃতরা কথা বলতে থাকে। আর আশ্চর্য, তাদের কথাগুলো আজও জীবন্ত। এ এক এমন জগৎ, যেখানে গভীর জ্ঞানকে ভালোবাসা হয়। যেখানে এমন অধ্যাপক আছেন, যাঁরা অপেরা ভালোবাসেন, পুরাণ মুখস্থ বলেন। যেমন এমেট রবিনস। “প্রথম বর্ষেই এমেটের সঙ্গে আমার দেখা,” বলেন কারসন। “আমার দেখা সবচেয়ে সভ্য মানুষ তিনি।”
রবিনস ছিলেন তার শিক্ষক, পরামর্শদাতা, পরে বন্ধু। আর এখন অ্যাবেলার্ড স্কুলের বোর্ডের প্রধান। তাই তার জন্যই কারসনের এই অর্থসংগ্রহের পাঠ। আরও কিছু শিক্ষককে তিনি মনে রেখেছেন। যেমন ফাদার জেমস শেরিডান—যার শরীরে লেগে থাকত আইরিশ পাইপ তামাকের গন্ধ।“যতদূর মনে পড়ে, ফাদার শেরিডান আমাদের প্লেটোর ‘অ্যাপলজি’ পড়াতেন হাঁটতে হাঁটতে। আর আমাদের আয়ারল্যান্ডের গল্প শোনাতেন।”
তারপর কারসন এমন একটি কথা বলেন, যা তার নিজের কবিতাকেও যেন ব্যাখ্যা করে—
“ফাদার শেরিডানের মধ্যে এক ধরনের অস্তিত্বের ঘনত্ব ছিল। তার গাউনের ভাঁজ থেকে যেন জ্ঞান ঝরে পড়ত।”
সত্তরের দশকের গোড়ায় ল্যাটিন আর গ্রিক পড়া প্রায় বিপ্লববিরোধী কাজের মতো মনে হতো। ওহাইওর কেন্ট স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলিবর্ষণ হয়েছে। মন্ট্রিয়েলের স্যার জর্জ উইলিয়ামস বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার-বিদ্রোহ। ক্যাম্পাস উত্তাল। আর এই সময় কেউ বসে গ্রিক-ল্যাটিন পড়ছে! কারসনের প্রথম উপন্যাস ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: আ নভেল ইন ভার্স’-এর নায়ক গেরিয়নের মতো ক্লাসিকসের ছাত্ররাও তখন খানিকটা অদ্ভুত প্রাণী। গেরিয়ন লাল, ডানাওয়ালা, সমকামী। ক্যাম্পাসের চোখে ক্লাসিকসের ছাত্ররাও যেন তেমনই অন্য জগতের।
কারসন তার থিসিস-পরামর্শক লিওনার্ড উডবারির কথা মনে করেন। তিনি শুধু ওয়েস্টকোট আর টাই পরে ক্লাসে এলেই ছাত্রদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হতো—যেন ষাঁড়ের সামনে লাল কাপড়। তার ওপর উডবারির কঠোর মানদণ্ড, পুরোনো ধাঁচের উৎকর্ষের দাবি—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন আরও বিরক্তিকর। কিন্তু ক্যাম্পাসের অধিকাংশ বিষয় কারসনের কাছে হয়তো অর্থহীন ছিল। অন্য কিছু তাকে ভিতর থেকে জাগিয়ে তুলেছিল। সম্ভবত তার মাদেলেন কেক ছিল সেন্ট মাইকেলস লাইব্রেরির সেই পুরোনো গ্রিক অভিধান। প্রতিদিন রাতে তিনি সেখানে পড়তে যেতেন। অভিধানটির গন্ধ ছিল—তিনি বলেন—“প্রাচীন সেলারির মতো।”
কী অদ্ভুত স্মৃতি।
একটি অভিধান। কিছু পুরোনো পৃষ্ঠা। সেলারির গন্ধ। আর হঠাৎ হাজার বছর আগের পৃথিবী এসে বসে বর্তমানের পাশে।কারসন তার মাস্টার্সের কিছু সময় স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছেন। আশির দশকে ছয় বছর প্রিন্সটনে পড়িয়েছেন। তবু তাঁর বিশ্বাস, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসিকস বিভাগ এখনো বিশ্বের সেরাদের একটি।
“ক্লাসিকস আপনাকে জটিলতা শেখায়,” বলেন তিনি। “গ্রিক আর রোমানরা এত অসাধারণ, আবার এতটাই গোলমেলে!”

তিনি তাদের নিয়ে এমনভাবে কথা বলেন, যেন তারা তার পুরোনো পরিচিত। বিশেষ করে স্যাফো এবং স্টেসিকোরাস। লেসবসের কবি স্যাফো। আর স্টেসিকোরাস, যার খণ্ডিত রচনায় হেরাক্লিস ও গেরিয়নের গল্প কারসনকে অনুপ্রাণিত করেছিল ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ লিখতে।
“আমার গ্রিকদের নিয়ে আমি অন্ধকারের মধ্যে লড়াই করি,” বলেন তিনি। “এটা একটা কুস্তির ম্যাচ।”
গ্রিকরা অবশ্য তার মনের একমাত্র বাসিন্দা নয়।
‘মেন ইন দি অফ আওয়ার্স’-এ স্যাফোর সঙ্গে জায়গা করে নেয় লিও টলস্টয় ও এমিলি ডিকিনসন। ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’—যাকে তিনি বলেছেন “২৯টি ট্যাঙ্গোর একটি উপন্যাস”—সেখানে জন কিটসের কবিতা, জাপানের সম্রাট হিরোহিতোর প্রথম বেতার ভাষণের বিবরণ, আর ১৬৮১ সালে নাহাম টেটের নতুন করে লেখা ‘কিং লিয়ার’—সব পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়।
কারসন যা-ই করুন, অতীত তার সঙ্গে থাকে।
তিনি ক্লাসিকসের অধ্যাপক। কবি। ঔপন্যাসিক। কিন্তু তার কাছে অতীত কোনো জাদুঘরের মৃত বস্তু নয়। বরং হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পায়ের নিচে তার শব্দ শোনা যায়।
পুরোনো টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাঁটার সময় তিনি বলেছিলেন:
“এই রাস্তাগুলোয় এত মানুষের পায়ের ছাপ আছে যে অবাক লাগে—ছাপগুলো সত্যিই যেন এখনো সেখানে নেই কেন।”
হয়তো সেখানেই অ্যান কারসনের কবিতা শুরু হয়। যেখানে অতীত মুছে যায় না। যেখানে মৃতেরা চলে যায় না। তারা শুধু একটু গন্ধ রেখে যায়—পুরোনো অভিধানের পাতায়, কাঠের মেঝেতে, কোনো শিক্ষকের গাউনের ভাঁজে, কিংবা হাজার বছর আগের একটি অসম্পূর্ণ গ্রিক কবিতার মধ্যে।
আর কারসন সেই গন্ধ শুঁকে শুঁকে খনন করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









