আকাশে মেঘ আছে, কিন্তু বৃষ্টি নেই। মাটিতে পানির সংকট বাড়ছে। এই দুইয়ের মাঝখানে এখন ঢুকে পড়েছে ড্রোন। মেঘের ভেতর ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে রুপার একটি যৌগ, যাতে বরফের কণা তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা বৃষ্টি বা তুষার হয়ে মাটিতে নামে। মানুষের পুরোনো স্বপ্ন—আকাশকে একটু বৃষ্টি নামাতে রাজি করানো—এবার নতুন প্রযুক্তির হাত ধরে আবার আলোচনায়।
২৩ আগস্ট আলাস্কার হোমারের বাসিন্দা কুপার ফ্রিম্যান জানতেনই না, তার মাথার ওপরের মেঘে বৃষ্টি নামানোর উদ্দেশ্যে রুপার যৌগ ছড়ানো হচ্ছে। পরে তিনি জানতে পারেন, রেইনমেকার নামের একটি স্টার্টআপ সেখানে মেঘে বীজ ছড়ানোর বা ‘ক্লাউড সিডিং’-এর পরীক্ষা চালিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার এল সেগুন্দোয় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির দাবি, মাত্র তিন ঘণ্টায় তারা আকাশে ১ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন গ্যালন পানির সৃষ্টি করেছে।
তবে এই দাবির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব জুড়ে আছে। ১ কোটি ৯০ লাখ গ্যালন শুনতে বিপুল মনে হলেও ১০০ বর্গমাইল এলাকায় তা ছড়িয়ে দিলে বৃষ্টির পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র প্রায় ০.০১ ইঞ্চি। অর্থাৎ প্রযুক্তিটি আকাশ থেকে নতুন কোনো জলভাণ্ডার তৈরি করছে না। বরং প্রকৃতিতে যে প্রক্রিয়ায় মেঘ থেকে বৃষ্টি নামে, সেটিকে কিছুটা ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করছে।
মেঘকে বৃষ্টি নামাতে ‘উসকানি’
ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তির বয়স ৮০ বছরের বেশি। সাধারণত উড়োজাহাজ বা ড্রোন দিয়ে মেঘের মধ্যে সিলভার আয়োডাইডের মতো যৌগ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ঠান্ডা মেঘে এই কণাগুলোকে কেন্দ্র করে বরফের স্ফটিক তৈরি হতে থাকে। স্ফটিকগুলো বড় হয়ে গেলে মাধ্যাকর্ষণের টানে নিচে নেমে আসে—তাপমাত্রা অনুযায়ী বৃষ্টি কিংবা তুষার হিসেবে।
অর্থাৎ প্রযুক্তিটি শূন্য থেকে পানি বানায় না। মেঘে আগে থেকেই থাকা জলীয়বাষ্পকে ঘনীভূত হওয়ার জন্য একটি কেন্দ্র দেয়। প্রকৃতির কাজটিকে মানুষের প্রযুক্তি একটু ত্বরান্বিত করে।

তবে এর জন্য মেঘ চাই। মেঘ না থাকলে বৃষ্টিও তৈরি করা যাবে না। রেইনমেকারের প্রধান নির্বাহী অগাস্টাস ডোরিকো তাই বলেন, মেঘ ছাড়া তাঁদের করার কিছুই নেই। ফলে খরা মোকাবিলার এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাও এখানেই—যেখানে মেঘ নেই, সেখানে ড্রোন পাঠিয়ে বৃষ্টি নামানো সম্ভব নয়।
এই কারণেই আলাস্কার মতো ঠান্ডা বা পাহাড়ি অঞ্চলে প্রযুক্তিটি তুলনামূলকভাবে কার্যকর হওয়ার সুযোগ বেশি।
প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা নিয়ে
প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি প্রশ্নও বাড়ছে। হোমারের বাসিন্দাদের বড় অংশকে পরীক্ষার বিষয়ে আগেই জানানো হয়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে। ফ্রিম্যানের উদ্বেগ আরও গভীর। তিনি জানতে চাইছেন, মেঘে যে সিলভার আয়োডাইড ছড়ানো হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত পরিবেশে কী প্রভাব ফেলেছে।
ফ্রিম্যান বলেন, মাটিতে বা নিচের পরিবেশে এই যৌগের প্রভাব যাচাই করতে কোনো কার্যকর পর্যবেক্ষণ হয়েছে বলে মনে হয় না। তার মতে, একটি কোম্পানি এসে মেঘে বীজ ছড়ালেই পানির সংকটের সমাধান হবে না; বরং এতে পানি সংরক্ষণের জরুরি সমস্যাগুলো থেকে মানুষের মনোযোগ সরে যেতে পারে।
এই উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বিশ্বজুড়ে পানির সংকট দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জুলাইয়ে সতর্ক করে বলেছেন, পৃথিবী যত দ্রুত মিঠা পানি ব্যবহার করছে, প্রকৃতি তত দ্রুত তা পুনরায় পূরণ করতে পারছে না। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্যও বলছে, গত পাঁচ বছর ছিল তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে বৈশ্বিক নদীগুলোর সবচেয়ে শুষ্ক সময়গুলোর একটি।
এই বাস্তবতায় আকাশ থেকে সামান্য অতিরিক্ত পানি পাওয়ার প্রযুক্তিও সরকারের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। বিশ্বে ৫০টির বেশি দেশ ইতিমধ্যে আবহাওয়া পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি চালাচ্ছে।
পুরোনো প্রযুক্তিতে নতুন ডানা
ক্লাউড সিডিংয়ের শুরু ১৯৪৬ সালে। জেনারেল ইলেকট্রিকের গবেষকেরা তখন শুকনো বরফ ব্যবহার করে মেঘে বীজ ছড়ানোর পরীক্ষা করেন। এক বছর পর দেখা যায়, সিলভার আয়োডাইড এ কাজে আরও কার্যকর। শুকনো বরফ দ্রুত গ্যাসে পরিণত হয়ে যায়; সিলভার আয়োডাইড তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকরভাবে বরফের স্ফটিক তৈরিতে সহায়তা করে।
কিন্তু কয়েক দশকের গবেষণার পরও এই প্রযুক্তি বৃষ্টির পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বাড়াতে পারেনি। উটাহ ক্লাইমেট সেন্টারের সহকারী রাজ্য জলবায়ুবিদ জন মেয়ার বলেন, অনুকূল পরিস্থিতিতে ক্লাউড সিডিং অতিরিক্ত প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে।
এটা কোনো আবহাওয়ার বিপ্লব নয়। বরং এমন এক প্রযুক্তি, যার সাফল্য নির্ভর করে খুব নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ওপর।
তবু গত কয়েক বছরে গবেষকেরা নতুন আশার কারণ পেয়েছেন। ২০১৭ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় প্রথমবারের মতো রাডার ও বৃষ্টিপাত মাপার যন্ত্র ব্যবহার করে মেঘে সিলভার আয়োডাইডের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যৌগটি প্রত্যাশিতভাবেই কাজ করতে পারে। এখন সেই পুরোনো প্রযুক্তিকে নতুন করে বদলে দিচ্ছে ড্রোন। রেইনমেকারের ড্রোন মেঘের কাছাকাছি গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় বীজ ছড়াতে পারে। মেয়ার মনে করেন, এতে ক্লাউড সিডিং আরও লক্ষ্যভিত্তিক হতে পারে—বিশেষ করে যেসব মেঘ বৃষ্টির জন্য উপযুক্ত, সেগুলো বেছে নেওয়া সম্ভব হবে।
রেইনমেকার যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো, উটাহ ও কলোরাডোর পাশাপাশি জর্ডানের মতো পানিসংকটে থাকা অঞ্চলগুলোতেও কাজ করছে। ডোরিকোর মতে, জর্ডানের অনেক মানুষ সপ্তাহে মাত্র কয়েক ঘণ্টা পানি পান। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে এই প্রযুক্তি প্রয়োগের সুযোগ পাওয়া তাঁদের জন্য বড় দায়িত্ব ও সৌভাগ্যের বিষয়।
রুপার বিকল্প খুঁজছে বিজ্ঞান
তবে পরিবর্তন শুধু ড্রোনে নয়, মেঘে কী ছড়ানো হবে, সেটিতেও আসতে পারে।
সান ফ্রান্সিসকোর রিকাস্ট সিস্টেমস এমন একটি নতুন উপাদান নিয়ে পরীক্ষা করছে, যা মাটিতে থাকা অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে তৈরি এক ধরনের প্রোটিন। টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ে এর পরীক্ষা চলছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী অলিভিয়া লির দাবি, উপাদানটি নিরাপদ, জৈবভাবে অবক্ষয়যোগ্য এবং সিলভার আয়োডাইডের চেয়ে বেশি দক্ষতার সঙ্গে বরফের স্ফটিক তৈরি করতে পারে।
অবশ্য প্রযুক্তিটি এখনো পরীক্ষামূলক। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সিলভার আয়োডাইড ব্যবহার করেই ক্লাউড সিডিং করছে।
রেইনমেকারও সিলভার আয়োডাইড ব্যবহারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছে। ডোরিকোর ভাষ্য, প্রতিটি ফ্লাইটে তারা ২০ গ্রাম সিলভার যৌগ ছড়ায় এবং তা হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মাটিতে এর ঘনত্ব অত্যন্ত সামান্য—কোয়াড্রিলিয়নের এক ভাগের মাত্র কয়েক অংশ—যা যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের নির্ধারিত সীমার অনেক নিচে বলে তাঁর দাবি।
কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি থেকে যায়—‘কতটা বৃষ্টি পাওয়া গেল, তার পাশাপাশি জানতে হবে—কী ছড়ানো হলো, কোথায় গেল এবং দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য কত?’
পানির সংকট যত বাড়বে, আকাশের দিকে তাকানোর এই প্রবণতাও তত বাড়বে। ক্লাউড সিডিং হয়তো খরার বিরুদ্ধে বড় কোনো অস্ত্র নয়। কিন্তু পানি যখন ক্রমেই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে, তখন অতিরিক্ত ৫ বা ১০ শতাংশ বৃষ্টিও অনেক অঞ্চলের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
তবে মেঘের সঙ্গে মানুষের এই নতুন দর-কষাকষিতে একটি শর্ত ভুলে গেলে চলবে না— ‘বৃষ্টি নামানোর প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোয়, তার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের কাজকেও তত দ্রুত এগোতে হবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









